logo

‘টাইব্রেকারে গেলে আমরাই বিশ্বকাপ জিততাম’, স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল নিয়ে দিবু

‘টাইব্রেকারে গেলে আমরাই বিশ্বকাপ জিততাম’, স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল নিয়ে দিবু
ফাইনালে অবিশ্বাস্য খেলেও দলকে জেতাতে পারেননি এমি। ছবি: গেটি ইমেজ

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন ভেঙেছিল আর্জেন্টিনার। তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই হারের আক্ষেপ এখনো ভুলতে পারেননি এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ। তবে পরাজয়ের হতাশার মধ্যেও একটি বিশ্বাস এখনো অটুট আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকের। তার ধারণা, ফাইনাল টাইব্রেকারে গড়ালে স্পেন নয়, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতো আর্জেন্টিনাই। শুধু তা-ই নয়, স্পেনের গোলরক্ষকরাও নাকি টাইব্রেকারে যেতে চাননি। বিশ্বকাপ ফাইনালের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এমনই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন দিবু।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) আর্জেন্টাইন সাংবাদিক গাস্তন এদুলের ইউটিউব অনুষ্ঠান ‘লস এদুল’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মার্তিনেস। সেখানে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল, ভাঙা আঙুল নিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা, কোচ লিওনেল স্কালোনির সমর্থন এবং নিজের চোটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন চেলসির এই গোলরক্ষক।

গত ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে শিরোপা নিশ্চিত করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। ম্যাচজুড়ে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে আর্জেন্টিনাকে লড়াইয়ে রেখেছিলেন মার্তিনেজ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।

সেই ফাইনাল নিয়ে দিবু জানান, ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ালে আর্জেন্টিনাই জিতত বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। শুধু নিজের পারফরম্যান্স নয়, প্রতিপক্ষের মনোভাবও নাকি সেই আত্মবিশ্বাসের কারণ হয়ে উঠেছিল।

মার্তিনেজের ভাষায়, ‘ওরাও বিষয়টা ভাবছিল। আমি শুনেছিলাম, ওরা বলছিল ম্যাচটা এখানেই জিততে হবে, টাইব্রেকারে যাওয়া যাবে না।’

নিজের আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়ে দিবু বলেন, ‘আমার পুরো বিশ্বাস ছিল, দিনটা আমারই হতে যাচ্ছে। কখনো কখনো মনে হয়, আজ কোনোভাবেই গোল খাব না। আমার সেদিন ঠিক সেই অনুভূতিটাই হচ্ছিল।’

স্পেনের এক গোলরক্ষকও পরে তাকে জানিয়েছিলেন, ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জিততে পারায় তারা স্বস্তি পেয়েছেন। দিবুর দাবি, প্রতিপক্ষও বুঝতে পারছিল টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনাকে হারানো সহজ হবে না।

এমন আত্মবিশ্বাসের পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে রান্দাল কোলো মুয়ানির নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছিলেন মার্তিনেজ। পরে টাইব্রেকারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করেন তিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপেও মার্তিনেজের লড়াইটা শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে ছিল না। নিজের শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও দীর্ঘদিন লড়তে হয়েছে তাকে। সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ডান হাতের অনামিকায় গুরুতর চোট নিয়েই পুরো বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি।

বিশ্বকাপের আগে অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ইউরোপা লিগের ফাইনালের প্রস্তুতির সময় আঙুলে চোট পান মার্তিনেস। ম্যাচ শেষে বার্মিংহামে ফিরে হাসপাতালে পরীক্ষা করালে জানা যায়, আঙুলের হাড় ভেঙে গেছে। সেই মুহূর্তে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক।

চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্রোপচার করালে অন্তত ছয় সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হতো তাকে। ফলে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হারানোর আশঙ্কা ছিল। তাই জাতীয় দলের চিকিৎসক ও গোলরক্ষক কোচ মার্তিন তোকাল্লির সঙ্গে আলোচনা করে অস্ত্রোপচার না করানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

কঠিন সেই সময়ে কোচ লিওনেল স্কালোনির সমর্থন পেয়েছিলেন মার্তিনেস। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চোটের খবর জানার পর স্কালোনি বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারুন বা না পারুন, কোচ তার পাশে থাকবেন।

বিশ্বকাপের প্রস্তুতি তাই স্বাভাবিক ছিল না দিবুর। শুরুতে ডান হাত পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারতেন না। বিশেষ সুরক্ষা ও ব্যান্ডেজের সাহায্যে অনুশীলন করতে হয়েছে তাকে। এমনকি তার জন্য বিশেষ গ্লাভসও তৈরি করে দিয়েছিল ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস।

মার্তিনেস জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের প্রথম দিকে আঙুলে আবার আঘাত লাগলে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই সতর্কতার সঙ্গে অনুশীলন করেছেন তিনি। অনেক সময় সাধারণ ফুটবলের পরিবর্তে ভলিবল ও টেনিস বল ব্যবহার করেও প্রস্তুতি নিতে হয়েছে।

তার সেই কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন জাতীয় দলের অন্য দুই গোলরক্ষক হেরোনিমো রুলি ও হুয়ান মুসো। নিয়মিত দলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন করতে না পারলেও আলাদাভাবে গোলরক্ষক কোচদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যান মার্তিনেস।

বিশ্বকাপের আগে সেই চোটের কারণে রাতের পর রাত ব্যথায় কেঁদেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। এমনকি আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের আগের দিন পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে অনুশীলন করতে পারছিলেন না। তবুও দেশের হয়ে খেলার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি।

তবে সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। ডান হাতের অনামিকা এখনো পুরোপুরি ভাঁজ করতে পারেন না মার্তিনেস। তার আশঙ্কা, আঙুলটি আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না।

শুধু শারীরিক সমস্যাই নয়, চোটের কারণে ক্লাব ক্যারিয়ারেও বড় মূল্য দিতে হয়েছে তাকে। বিশ্বকাপ শেষে ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আঙুলের অবস্থা নিয়ে শঙ্কার কারণে সেই দলবদল ভেস্তে যায় বলে দাবি করেছেন দিবু। শেষ পর্যন্ত অ্যাস্টন ভিলা ছেড়ে চেলসিতে যোগ দেন তিনি।

মার্তিনেস জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ব্যথা কমানোর জন্য আঙুলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। যদিও তাতে আঙুলটি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরবে না বলেই তার ধারণা।

এর মধ্যেই নতুন করে বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। গত ১৭ অক্টোবর প্রিমিয়ার লিগে এভারটনের বিপক্ষে চেলসির হয়ে খেলার সময় প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার জ্যারাড ব্রান্থওয়েটের সঙ্গে মাথায় সংঘর্ষ হয় তার। মাঠে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা দেওয়ার পর স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে।

পরে পরীক্ষা করে চোয়ালের হাড়ে ফাটল ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারও করাতে হয় চেলসির এই গোলরক্ষককে। ১৮ অক্টোবর এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার কথা নিশ্চিত করে লন্ডনের ক্লাবটি।

বর্তমানে সেই চোট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন মার্তিনেজ। অস্ত্রোপচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মাঠে ফেরার আশাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তবে ঠিক কবে আবার প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।