লজ্জার ইতিহাস পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে ফিরতে চায় কঙ্গো

অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ বিশ্বকাপে ফেরার হাতছানি সাব সাহারান দেশ কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সামনে। তবে সর্বশেষ ১৯৭৪ সালে তারা ‘কঙ্গো’ নামে নয়, ‘জাইর’ হিসেবে খেলেছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে। নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে এবার সেই মঞ্চে ফেরার দ্বারপ্রান্তে আফ্রিকার দেশটি।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) প্লে-অফে জ্যামাইকার মুখোমুখি হবে কঙ্গো। এই ম্যাচে জয় মানেই প্রথমবারের মতো বর্তমান নাম ও পতাকায় বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা। তাই কিনশাসা থেকে শুরু করে পুরো দেশের নজর এখন এই এক ম্যাচে। তবে বিশ্বকাপে কঙ্গোর ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং চমকপ্রদ।
জাইর থেকে কঙ্গো—এক ইতিহাসের পথচলা
কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাস শুরু ১৯৭৪ সালে, যখন দেশটির নাম ছিল জাইর। শাসক মোবুতু সেসে সেকো ফুটবলকে ব্যবহার করেছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের শাসনের প্রচারে।
সেই দল সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপে খেলা প্রথম প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর একটি হয়ে ইতিহাস গড়েছিল। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্স সেই গৌরব ধরে রাখতে পারেনি।
স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হারের পর যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ৯-০ গোলের লজ্জাজনক পরাজয় বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আজও সেটি বিশ্বকাপের অন্যতম বড় ব্যবধানের হার হিসেবে স্মরণীয়।
ভয়, চাপ আর এক ভুল বোঝা মুহূর্ত
তবে সেই বিশ্বকাপের গল্প শুধু পরাজয়ের নয়, রয়েছে এক বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিন ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা একটি মুহূর্তও।
ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ। স্কোরলাইন তখন ২-০। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পেয়েছে ব্রাজিল। রিভেলিনো শট নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রেফারির বাঁশি বাজতেই হঠাৎই ডিফেন্স থেকে দৌড়ে এসে বল জোরে দূরে সরিয়ে দেন জাইরের ডিফেন্ডার মুইপু ইলুঙ্গা।

মুহূর্তেই বিস্মিত হয়ে যায় পুরো স্টেডিয়াম। রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখান, দর্শকরা হাসাহাসি শুরু করে, আর বিশ্বমিডিয়া ঘটনাটিকে ‘অজ্ঞতা’ বা নিয়ম না বোঝার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি অন্ধকার।
এর আগে যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯-০ গোলের লজ্জাজনক হারের পর দলের ওপর নেমে আসে শাসক মোবুতুর সরাসরি হুমকি। খেলোয়াড়দের জানিয়ে দেওয়া হয়, ব্রাজিলের বিপক্ষে তিন গোলের বেশি ব্যবধানে হারলে দেশে ফিরে ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে হবে।
সেই আতঙ্ক নিয়েই মাঠে নামে জাইরের ফুটবলাররা। ইলুঙ্গার সেই আচরণ ছিল সময় নষ্ট করা এবং যে কোনোভাবে গোল ঠেকানোর এক মরিয়া চেষ্টা—নিজেদের রক্ষা করার জন্য।
পরবর্তীতে নিজেই স্বীকার করেছিলেন, সেটি কোনো ভুল নয়, বরং পরিস্থিতির চাপে নেওয়া সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল।
ব্যর্থতার আড়ালের গল্প
বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। বরং কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলায় দলের ভেতর ভাঙন তৈরি হয়।
এক পর্যায়ে খেলোয়াড়রা ম্যাচ খেলতেই অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। এর প্রভাব পড়ে মাঠের পারফরম্যান্সে, যার ফল সেই বিব্রতকর পরাজয়গুলো।

এরপর দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপ থেকে দূরে থাকে কঙ্গো। দেশের নাম বদলেছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে কিন্তু বিশ্বকাপে ফেরার আকাঙ্ক্ষা রয়ে গেছে একইভাবে।
নতুন প্রজন্ম, নতুন লক্ষ্য
এবার সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ইউরোপভিত্তিক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে তরুণদের সমন্বয়ে গড়া দলটি আত্মবিশ্বাসী।
জ্যামাইকার বিপক্ষে এই প্লে-অফ তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়। এটি অতীতের দাগ মুছে নতুন পরিচয়ে বিশ্বমঞ্চে ফেরার সুযোগ।
ইতিহাসের সামনে কঙ্গো
১৯৭৪ সালের সেই দল পথ দেখিয়েছিল, যদিও তাদের গল্পে ছিল বেদনা। ৫২ বছর পর নতুন কঙ্গো চাইছে সেই অসমাপ্ত গল্প নতুনভাবে লিখতে।
এই ম্যাচ শুধু জয়-পরাজয়ের নয়—এটি ইতিহাস, আত্মমর্যাদা আর পুনরাগমনের লড়াই।