Advertisement

লিভারপুলের নতুন কোচ আন্দোনি ইরাওলা

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
লিভারপুলের নতুন কোচ আন্দোনি ইরাওলা
আন্দোনি ইরাওলা। ছবি: সংগৃহীত

আর্নে স্লটকে বরখাস্ত করার পর নতুন কোচ নিয়োগে বেশি সময় নিল না লিভারপুল। বোর্নমাউথে নজরকাড়া সাফল্যের পর আন্দোনি ইরাওলাকে দুই বছরের চুক্তিতে প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে অ্যানফিল্ডের ক্লাবটি।

এক বছর আগেই লিভারপুলকে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এনে দিয়েছিলেন স্লট। কিন্তু পরের মৌসুমে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ক্লাব। শনিবার স্লটের বিদায় নিশ্চিত করার পর দ্রুতই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ইরাওলার নাম ঘোষণা করে লিভারপুল।

৪৩ বছর বয়সী স্প্যানিশ কোচ ইরাওলা বোর্নমাউথকে ক্লাব ইতিহাসের সেরা শীর্ষ-ফ্লাইট (টপ-ফ্লাইট) মৌসুম উপহার দিয়েছেন। তাঁর অধীনে বোর্নমাউথ প্রিমিয়ার লিগে ষষ্ঠ হয়ে মৌসুম শেষ করে, যা তাদের ইউরোপা লিগের টিকিট এনে দেয়। লিভারপুলের চেয়ে মাত্র এক ধাপ ও তিন পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল তারা।

লিভারপুল অবশ্য আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলবে। তবে প্রিমিয়ার লিগে ৬০ পয়েন্ট নিয়ে মৌসুম শেষ করা ক্লাবটির জন্য ছিল হতাশাজনক। ২০১৫-১৬ মৌসুমের পর এটি লিগে তাদের সর্বনিম্ন পয়েন্ট। চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালের চেয়ে ২৫ পয়েন্ট পিছিয়ে থাকা লিভারপুল বুঝেছিল, নতুন দিকনির্দেশনা দরকার।

নতুন দায়িত্ব নিয়ে উচ্ছ্বাস লুকাননি ইরাওলা। লিভারপুলকে বিশ্বের অন্যতম বড় ক্লাব উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এই ক্লাবের আকর্ষণ ব্যাখ্যা করতে বেশি কিছু লাগে না। তাঁর কথায়, ‘লিভারপুলই লিভারপুল।’

ইরাওলা আরও জানিয়েছেন, লিভারপুল তাঁকে শীর্ষ মানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। আর বড় খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করতে পারলে শিরোপার জন্য লড়াই করার সুযোগও তৈরি হয়। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায় না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। ইরাওলার বক্তব্য, তিনি জানেন কোথায় এসেছেন এবং তাঁর কাছে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সেই চ্যালেঞ্জের জন্য তিনি প্রস্তুত।

লিভারপুলের ফুটবল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মাইকেল এডওয়ার্ডস এবং স্পোর্টিং ডিরেক্টর রিচার্ড হিউজ মিলে স্লটকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের মূল্যায়ন ছিল, দলকে আরও আক্রমণাত্মক, গতিময় ও আগ্রাসী ফুটবল খেলাতে হবে। এই জায়গাতেই ইরাওলাকে উপযুক্ত মনে করেছে ক্লাব।

ইরাওলার সঙ্গে রিচার্ড হিউজের সম্পর্কও পুরোনো। হিউজ যখন বোর্নমাউথের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ছিলেন, তখনই ইরাওলাকে ক্লাবটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেই পরিচিতি ও কাজের ধারাবাহিকতাও লিভারপুলের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বোর্নমাউথে ইরাওলার সাফল্য কাকতালীয় ছিল না। ছোট ক্লাব নিয়ে বড় দলকে অস্বস্তিতে ফেলাই যেন তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। বোর্নমাউথে তিনি লিভারপুল, টটেনহাম, আর্সেনাল, নিউক্যাসল ও এভারটনের মতো দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছেন। তাঁর দলের ফুটবল ছিল গতিময়, সাহসী ও আক্রমণাত্মক। জানুয়ারিতে তারকা খেলোয়াড় অঁতোয়ান সেমেনিও বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরও দলটির ছন্দ ভাঙেনি।

গত মৌসুমে বোর্নমাউথ ১৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকার নজিরও গড়েছিল। এমন পারফরম্যান্সের পর ইরাওলার নাম বড় ক্লাবগুলোর আলোচনায় আসা স্বাভাবিকই ছিল। ক্রিস্টাল প্যালেস ও এসি মিলানের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গন্তব্য হলো অ্যানফিল্ড।

ইরাওলার ফুটবল দীক্ষা এসেছে বাস্ক অঞ্চলের শক্ত শিকড় থেকে। ছোটবেলায় মিকেল আরতেতা ও জাবি আলোনসোর সঙ্গে ফুটবল খেলেছেন তিনি। তিনজনই এখন প্রিমিয়ার লিগের কোচিং মানচিত্রে বড় নাম। ইরাওলা খেলোয়াড়ি জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ে। ক্লাবটির হয়ে পাঁচ শতাধিক ম্যাচ খেলেছেন, অধিনায়কত্ব করেছেন এবং স্পেন জাতীয় দলের হয়েও সাতটি ম্যাচ খেলেছেন।

অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ে মার্সেলো বিয়েলসা ও এরনেস্তো ভালভের্দের মতো কোচের অধীনে কাজ করেছেন ইরাওলা। খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ দিকে নিউইয়র্ক সিটিতে গিয়ে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, আন্দ্রেয়া পিরলো ও দাভিদ ভিয়ার মতো তারকার সঙ্গে খেলেছেন। সেখানে প্যাট্রিক ভিয়েরার অধীনে পজিশনাল প্লে নিয়েও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পান তিনি।

কোচিং ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ইরাওলা নিজেকে প্রমাণ করেছেন সীমিত সম্পদের ক্লাবে। সাইপ্রাসের এইকে লারনেসাকে ইউরোপা লিগের গ্রুপ পর্বে তুলেছিলেন। স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ছোট ক্লাব সিডি মিরান্দেসকে অবনমন-শঙ্কা থেকে মাঝামাঝি অবস্থানে নিয়ে যান; সঙ্গে কোপা দেল রের সেমিফাইনালে তোলেন সেল্তা ভিগো, সেভিয়া ও ভিয়ারিয়ালের মতো দলকে হারিয়ে।

রায়ো ভায়েকানোতে তাঁর সাফল্য আরও বড় ছিল। দলটিকে প্লে-অফ জিতিয়ে লা লিগায় তুলেছিলেন তিনি। এরপর ইংল্যান্ডে এসে বোর্নমাউথকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া তাঁর কোচিং পরিচয়কে আরও শক্ত করেছে।

লিভারপুলের দায়িত্ব অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। এখানে প্রত্যাশা শুধু ভালো ফুটবল নয়, শিরোপা। গত গ্রীষ্মে দলবদল বাজারে ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছে লিভারপুল, যা কোনো ব্রিটিশ ক্লাবের এক উইন্ডোর সর্বোচ্চ ব্যয়। নিউক্যাসল থেকে আলেকজান্ডার ইসাককে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে এনে ব্রিটিশ ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙেছে তারা। বায়ার লেভারকুসেন থেকে ফ্লোরিয়ান ভির্টজকে আনা হয়েছে ১১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে।

এমন স্কোয়াড নিয়ে ইরাওলার ওপর চাপ থাকবে দ্রুত ফল দেখানোর। তিনি টমি এলফিক ও শন কুপারকে বোর্নমাউথ থেকে নিজের কোচিং স্টাফে আনতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। নতুন পরিবেশে পরিচিত সহকারীদের উপস্থিতি তাঁর কাজকে সহজ করতে পারে।