logo

তিন ফাইনালের কান্না থেকে বিশ্বকাপ: যেভাবে বদলে গেল মেসি-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক

তিন ফাইনালের কান্না থেকে বিশ্বকাপ: যেভাবে বদলে গেল মেসি-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক
তিনটি টানা বড় ফাইনালের হতাশা পেরিয়ে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ হাতে তুলেছিলেন মেসি। ছবি: গেটি ইমেজ

লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কটা কখনোই প্রথম দর্শনের প্রেম ছিল না। বরং এই গল্পে ভালোবাসার আগে এসেছে সংশয়, অভিমান আর নির্মম সমালোচনা। যে ছেলেটি স্পেনে বড় হয়েছেন, তাকে একসময় আর্জেন্টাইনরা নিজেদের ঠিক ‘আপন’ ভাবতে পারেনি। বার্সেলোনার হয়ে অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলা মেসিকে জাতীয় দলের জার্সিতে না পেলেই উঠত প্রশ্ন; দেশের হয়ে খেলার আবেগটা কি তার একই রকম?

তারপর একে একে তিনটি ফাইনাল হার। ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকা। শেষটির পর এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে বলে দিয়েছিলেন, জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা শেষ।

অথচ সেই মেসিকেই আজ বিদায় জানাতে প্রস্তুত পুরো আর্জেন্টিনা। মাঝের দশ বছরে বদলে গেছে প্রায় সবকিছু। যে সম্পর্ক একসময় ছিল অবিশ্বাসে ভরা, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে নিঃশর্ত ভালোবাসায়। আর সেই বদলের কেন্দ্রে আছে একটি বিশ্বকাপ।

বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে মেসির গোল ১২৫টি, গোলে সহায়তা ৬৬টি। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও সর্বোচ্চ গোলের দুই রেকর্ডই তার। কিন্তু মেসির আর্জেন্টিনা-গল্পকে শুধু সংখ্যা দিয়ে বোঝা কঠিন। কারণ এই গল্পে তার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ট্রফির পাশাপাশি নিজের দেশকেই জয় করা।

শুরুতেই কান্না

২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে মেসির আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিটের। বদলি হিসেবে নেমে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ভিলমোস ভানচাকের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পর লাল কার্ড দেখেন ১৮ বছরের তরুণ। চোখের পানি নিয়েই মাঠ ছাড়েন।

এক বছর পর জার্মানি বিশ্বকাপে প্রথমবার বড় মঞ্চে দেখা গেল তাকে। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয়ে গোলও করেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হারের ম্যাচে অতিরিক্ত সময়েও তাকে নামাননি হোসে পেকারম্যান।

২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলের হার ছিল মেসির প্রথম বড় ফাইনালের ক্ষত। তখনো দলের মূল নেতা ছিলেন হুয়ান রোমান রিকেলমে। কিন্তু মেসিকে ঘিরে প্রত্যাশা যে দ্রুত অন্য উচ্চতায় উঠছিল, সেটিও তখন পরিষ্কার।

বার্সার মেসি, আর্জেন্টিনার মেসি

২০১০ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা মেসিকেই দলের আক্রমণের কেন্দ্র বানিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ ম্যাচে গোল করতে পারেননি তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর শুরু হয় পরিচিত সেই তুলনা

বার্সেলোনায় এত দুর্দান্ত, আর্জেন্টিনায় কেন নয়?

২০১০ বিশ্বকাপে ব্যর্থ হন মেসি।
২০১০ বিশ্বকাপে ব্যর্থ হন মেসি।

এক বছর পর নিজেদের মাটিতে কোপা আমেরিকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর তার দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। কেউ কেউ তাকে ‘নিরাবেগ’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন। ম্যারাডোনাকে যে দেশ প্রায় শুরু থেকেই আপন করে নিয়েছিল, মেসিকে সেই জায়গা পেতে অনেক বেশি লড়াই করতে হয়েছে।

তিন বছরে তিন ফাইনালের কান্না

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে মনে হয়েছিল, সব প্রশ্নের উত্তর বুঝি এবার মিলবে।

মেসির নেতৃত্বে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। সামনে আবার জার্মানি। মারাকানায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১১৩ মিনিটে মারিও গোটশের গোল শেষ করে দেয় আর্জেন্টিনার স্বপ্ন।

বিশ্বকাপে মেসির সেই শূন্য দৃষ্টি।
বিশ্বকাপে মেসির সেই শূন্য দৃষ্টি।

সেদিন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল হাতে পেয়েছিলেন মেসি। কিন্তু ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তার শূন্য দৃষ্টিই যেন বেশি মনে রেখেছে ফুটবলবিশ্ব।

এক বছর পর চিলিতে কোপা আমেরিকার ফাইনাল। আবার হার, এবার স্বাগতিক চিলির কাছে টাইব্রেকারে।

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কোপা আমেরিকা শতবর্ষী আসর। আবার ফাইনাল। আবার চিলি। আবার টাইব্রেকার।

চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর মেসি।
চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর মেসি।

এবার নিজের শটই উড়িয়ে দেন মেসি।

তিন বছরে তিনটি বড় ফাইনাল হারার পর আর নিতে পারেননি তিনি। ম্যাচ শেষে ঘোষণা করেন, জাতীয় দলের সঙ্গে তার সময় শেষ।

মাত্র ২৯ বছর বয়সেই যেন শেষ হয়ে যাচ্ছিল মেসির আর্জেন্টিনা গল্প।

কিন্তু গল্পটা তখনো বাকি

মেসির অবসর মেনে নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাকে ফিরে আসার আহ্বান ওঠে। সিদ্ধান্ত বদলে আবার নীল-সাদা জার্সি গায়ে তোলেন তিনি।

ফিরলেও সাফল্য সঙ্গে সঙ্গে আসেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হার। ২০১৯ কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে বিদায়।

তখন মেসির বয়স ৩২। জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা নেই। সময়ও ক্রমেই কমছিল।

ঠিক সেখানেই শুরু হয় লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা।

স্কালোনি মেসিকে ঘিরে শুধু একটি দল বানাননি; এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে সবকিছুর ভার একা মেসিকেও বইতে হতো না। পাশে এলেন রদ্রিগো দি পল, লাউতারো মার্তিনেজ, এমিলিয়ানো মার্তিনেজদের নতুন প্রজন্ম।

আর সেই দলই বদলে দিল পুরো গল্প।

মারাকানায় ভাঙল অভিশাপ

২০২১ সালের ১০ জুলাই। মারাকানা। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল।

আর্জেন্টিনার সঙ্গে মেসির সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাতগুলোর একটি।

আনহেল দি মারিয়ার গোলে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জিতল আর্জেন্টিনা। সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় শিরোপা।

শেষ বাঁশির পর সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরেছিলেন। একটু পর তাঁকে ছুড়ে দিচ্ছিলেন আকাশে। যে মানুষটিকে বছরের পর বছর ব্যর্থতার মুখ হিসেবে দেখা হয়েছিল, এবার তাকেই ঘিরে আর্জেন্টিনার উৎসব।

সেখান থেকেই যেন সম্পর্কটার ভাষা বদলে যায়।

২০২২ সালে ওয়েম্বলিতে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা। তারপর কাতার।

যে বিশ্বকাপ সব বদলে দিল

সৌদি আরবের কাছে হেরে শুরু হয়েছিল ২০২২ বিশ্বকাপ। তারপর একে একে মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া।

আর শেষে ফ্রান্স।

বিশ্বকাপ হাতে মেসি। ছবি: গেটি ইমেজ
বিশ্বকাপ হাতে মেসি। ছবি: গেটি ইমেজ

লুসাইলের সেই ফাইনালে যেন মেসির পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গল্পটাই ছিল। আনন্দ, বিপর্যয়, আবার ঘুরে দাঁড়ানো, তারপর শেষ হাসি।

টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারানোর পর বিশ্বকাপ হাতে তুললেন মেসি।

সেই একটি ছবিই বদলে দিল বহু বছরের বিতর্ক। ম্যারাডোনার মতো বিশ্বকাপ নেই এই শেষ যুক্তিটুকুও আর রইল না।

কাতারের পর আর্জেন্টিনার কাছে মেসিকে আর কিছু প্রমাণ করতে হয়নি। যে মানুষটির দেশপ্রেম নিয়েও একসময় প্রশ্ন উঠেছিল, তার নামেই তখন বুয়েনস এইরেসের রাস্তায় গান।

তারপরও থামেননি

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আবার কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখে স্কালোনির দল।

৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি শুধু অতীতের কোনো স্মৃতিচিহ্ন হয়ে ছিলেন না। আট গোল ও চার গোলে সহায়তা করে আবারও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। সেখানে স্পেনের কাছে হেরে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভাঙলেও, এবার পরাজয়ের পর তার দিকে অভিযোগের আঙুল ওঠেনি।

কারণ তত দিনে সম্পর্কটা বদলে গেছে।

২০১৬ সালের পরাজিত মেসি জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন চারপাশের চাপ আর নিজের হতাশা নিয়ে। ২০২৬ সালের মেসি বিদায় নিচ্ছেন এমন একটি দেশ থেকে, যারা তাকে আর যেতে দিতে চায় না।

শেষটা তাই ঘরেই

আজ মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে শেষবার আর্জেন্টিনার জার্সি পরবেন মেসি। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বিদায়ের নাম দিয়েছে ‘শেষ ট্যাঙ্গো’।

তাদের ভাষায়, ‘শেষ ট্যাঙ্গোটা আর্জেন্টিনাতেই হতে হতো। কারণ কিছু নাচ কেবল ঘরেই শেষ করা যায়।’

২১ বছরের পথ পেরিয়ে কথাটা মেসির ক্ষেত্রেই হয়তো সবচেয়ে বেশি মানায়।

কারণ তার আর্জেন্টিনা-গল্পটা কখনো সহজ ছিল না। অভিষেকেই লাল কার্ড, দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন, বিশ্বকাপ ফাইনালের কান্না, পরপর দুই কোপার হতাশা, অবসর; সব পেরিয়েই এসেছিল মারাকানা ও লুসাইল।

একসময় আর্জেন্টিনা জানতে চাইত, মেসি তাদের জন্য কতটা।

বিদায়ের দিনে প্রশ্নটা ঠিক উল্টো।

মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা কেমন হবে?

*দিয়ারিও এএস অবলম্বনে