কেন অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নিলেন ইরানের নারী ফুটবলাররা

অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাপ ২০২৬ ইরানের জন্য শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু টুর্নামেন্টে এখনও লড়াই চালিয়ে যাওয়া দলগুলোর চেয়েও বেশি আলোচনায় রয়েছে ইরানের নারী ফুটবল দল। কারণ, দলের কয়েকজন খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়াতেই রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন—যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনার শুরু টুর্নামেন্টের আগেই। ১ মার্চ এশিয়ান কাপ শুরু হওয়ার একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের নারী ফুটবল দল অস্ট্রেলিয়ায় টুর্নামেন্ট খেলতে নামে। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দলটিকে ঘিরে শুরু হয় আরেক নাটকীয় অধ্যায়—যা শেষ পর্যন্ত আশ্রয় আবেদনের ঘটনায় গড়ায়।
কী ঘটেছিল অস্ট্রেলিয়ায়?
ইরান এশিয়ান কাপের গ্রুপ ‘এ’-তে ছিল। ২, ৫ এবং ৮ মার্চ—এই তিনটি ম্যাচই তারা খেলেছে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্ট স্টেডিয়ামে।
তবে প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই দলটি আলোচনায় চলে আসে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে যখন ইরানের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়, তখন খেলোয়াড়রা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন—কেউ গান করেননি। অনেক খেলোয়াড়কে তখন চোখের জল সামলাতে দেখা যায়।
ম্যাচের ফলও ভালো হয়নি। ইরান তিনটি ম্যাচই হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বড় খবর হয়ে ওঠে খেলোয়াড়দের এই আচরণ এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলো।
কেন প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীত গাননি খেলোয়াড়রা?
খেলোয়াড়রা বা দলীয় কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
কিছু মানবাধিকারকর্মী ও সমর্থক মনে করেন, এটি ছিল ইরানি সরকারের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ। আবার কেউ কেউ বলেন, খামেনির মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের জন্যই হয়তো তারা সংগীত গাননি।
তবে তিন দিন পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে দৃশ্য বদলে যায়। এবার খেলোয়াড়রা শুধু জাতীয় সংগীতই গাইলেন না, অনেককে সালামও করতে দেখা যায়।
এতে অনেকে মনে করেন, প্রথম ম্যাচের ঘটনার পর তাদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল। শেষ ম্যাচেও একইভাবে তারা সংগীত গেয়েছেন।
কেন খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়?
প্রথম ম্যাচের পরই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক উপস্থাপক খেলোয়াড়দের ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় জাতীয় সংগীত না গাওয়া ‘দেশের প্রতি অসম্মান’ এবং এর জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এই মন্তব্য সামাজিকমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর আন্তর্জাতিক ফুটবলার সংগঠন ফিফপ্রো (FIFPRO) ফিফা ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনকে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত ইরানি সম্প্রদায়ের অনেকেও সরকারের কাছে আবেদন করেন যাতে খেলোয়াড়দের আশ্রয় দেওয়া হয়।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারের প্রতিক্রিয়া
শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার সরকার কোনো স্পষ্ট পদক্ষেপের কথা জানায়নি। তবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী খেলোয়াড়দের পরিস্থিতির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
দলের অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক ঘোষণা করেন, দলের সদস্যরা চাইলে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
কতজন খেলোয়াড় আশ্রয় নিয়েছেন?
অস্ট্রেলিয়ার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে পাঁচজন খেলোয়াড় রাজনৈতিক আশ্রয় চান। পরে আরও একজন খেলোয়াড় এবং একজন স্টাফ সদস্য মানবিক ভিসা পান। তবে একজন খেলোয়াড় শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ইরানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিরা অন্তত এক বছরের জন্য মানবিক ভিসা পেয়েছেন এবং পরে স্থায়ী বসবাসের সুযোগও পেতে পারেন।
কীভাবে তারা দলের হোটেল থেকে বেরিয়ে যান?
অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি দলের চলাফেরার ওপর নজরদারি করছিলেন ইরান সরকারের প্রতিনিধিরা। গোল্ড কোস্টে দলের হোটেলের বাইরে সবসময় পুলিশ মোতায়েন ছিল। একসময় কয়েকজন খেলোয়াড় স্থানীয় ইরানি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সুযোগ বুঝে তারা হোটেল থেকে বেরিয়ে অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যান। পুলিশ তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায় এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করানো হয়। সেখানেই তারা আশ্রয়ের আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন।
যারা দেশে ফিরছেন তাদের কী হবে?
দলের বাকি ২১ খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন। ইরানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় তারা সেখান থেকে অন্য পথে দেশে ফিরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের ‘স্বাগত জানানো হবে’ এবং তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না।
অস্ট্রেলিয়ায় থাকা খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ
অস্ট্রেলিয়ার সরকার, মানবাধিকার সংগঠন এবং ফুটবল সংগঠনগুলো তাদের সহায়তা করার উদ্যোগ নিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পেশাদার লিগ এ লিগের কয়েকটি ক্লাব ইতোমধ্যে ওই খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। স্থানীয় একটি ক্লাব তাদের মাঠে অনুশীলনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে।
এই ঘটনা শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার এবং ক্রীড়াঙ্গনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্কও সামনে এনেছে।
ইরানের নারী ফুটবলারদের এই সিদ্ধান্ত এখন বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবন শুরু করার ওপর।