logo

বিশ্বকাপে এবার নিজেদের প্রমাণের মিশনে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন কাতার

বিশ্বকাপে এবার নিজেদের প্রমাণের মিশনে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন কাতার

বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন এগিয়ে চলেছে। আর ৪৪ দিনের অপেক্ষা। এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে এশিয়ার নতুন চমক কাতার। ঘরের মাঠের হতাশা পেছনে ফেলে এবার নিজেদের যোগ্যতায় বিশ্বমঞ্চে ফেরা একটি দল।

দল পরিচিতি

কাতারকে এখন আর শুধু ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরে এশিয়ান ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে তারা। ২০১৯ সালের পর ২০২৩ এএফসি এশিয়ান কাপ জিতে কাতার প্রমাণ করেছে, মহাদেশীয় পর্যায়ে তারা এখন প্রতিষ্ঠিত শক্তি।

‘আল-আন্নাবি’ নামে পরিচিত এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সমন্বয়। স্কোয়াডের বেশিরভাগ খেলোয়াড় ঘরোয়া লিগ থেকেই উঠে আসা, ফলে একসঙ্গে খেলার অভ্যাসটা স্পষ্ট। তবে এখানেই প্রশ্নও আছে—বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ইউরোপভিত্তিক প্রতিপক্ষের গতি ও চাপ তারা কতটা সামলাতে পারবে।

কোচ হুলেন লোপেতেগির অধীনে কাতার এখন আরও ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল খেলতে চাইছে। শুধু বল দখল নয়, রক্ষণে স্থির থাকা এবং সুযোগ পেলে দ্রুত আক্রমণে ওঠাই হতে পারে তাদের মূল পরিকল্পনা। ২০২৫ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অধীনেই দলটি ২০২৬ বিশ্বকাপে ওঠে।

বিশ্বকাপে ইতিহাস

কাতারের বিশ্বকাপ ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২২ সালে আয়োজক দেশ হিসেবে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলে তারা। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে ছিল নির্মম বাস্তবতা।

২০২২ সালের কাতার দল

গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের তিনটিতেই হার। ইকুয়েডরের কাছে ০-২, সেনেগালের কাছে ১-৩ এবং নেদারল্যান্ডসের কাছে ০-২ ব্যবধানে হার নিয়ে শেষ হয় তাদের প্রথম বিশ্বকাপ অভিযান। সেই আসরে মোহাম্মদ মুনতারি করেন কাতারের প্রথম বিশ্বকাপ গোল।

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ কাতারের জন্য একেবারেই ভিন্ন গল্প। এবার তারা আয়োজক হিসেবে নয়, বাছাইপর্ব পেরিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপে ওঠে কাতার। 

বিশ্বকাপে কাতারের পারফরম্যান্স

বছরআয়োজক দেশফলাফল
২০২২কাতারগ্রুপ পর্ব
২০২৬কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রবাছাইপর্ব পেরিয়ে অংশগ্রহণ


যেভাবে বিশ্বকাপে কাতার

কাতারের বিশ্বকাপে ওঠার গল্পে সবচেয়ে বড় ম্যাচ ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে সেই ২-১ জয়। ম্যাচটি ছিল চাপে ভরা।

দুর্দান্ত এক ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে কাতার

দ্বিতীয়ার্ধে আকরাম আফিফের সেট পিস থেকেই প্রথমে খুখি, পরে পেদ্রো মিগেল গোল করেন। শেষদিকে লাল কার্ড এবং ইনজুরি টাইমে আরব আমিরাত গোল করলেও কাতার শেষ পর্যন্ত জয় ধরে রাখে।

এই জয় শুধু বিশ্বকাপের টিকিটই দেয়নি, কাতারের ফুটবলের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ও খুলে দিয়েছে।

বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ

এবারের বিশ্বকাপে কাতার রয়েছে গ্রুপ ‘বি’-তে। তাদের সঙ্গে আছে কানাডা, সুইজারল্যান্ড এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা।
গ্রুপটি সহজ নয়। কানাডা স্বাগতিক সুবিধা পাবে, সুইজারল্যান্ড বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক দল, আর বসনিয়া শারীরিক ও টেকনিক্যাল দুই দিক থেকেই কঠিন প্রতিপক্ষ।

কাতারের জন্য প্রতিটি ম্যাচই হবে প্রমাণের মঞ্চ।

বর্তমান স্কোয়াড

বর্তমান স্কোয়াডে কাতার স্পষ্টভাবে ভারসাম্য খুঁজছে অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতার মধ্যে।

গোলপোস্টে মেশাল বারশাম সবচেয়ে পরিচিত নাম। তার সঙ্গে আছেন মাহমুদ আবুনাদা ও শেহাব আল-লাইথির মতো বিকল্প। বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা কাতারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ডিফেন্সে পেদ্রো মিগেল, তারেক সালমান, হোমাম এলামিন ও জাসেম গাবের পরিচিত মুখ। ইউসুফ আয়মান, আবদুল্লাহ আল-ইয়াজিদি, ইসা লাইয়ে ও সুলতান আল-ব্রেকের মতো খেলোয়াড়রাও ছেড়ে কথা বলবে না। এই ডিফেন্স লাইনটাই কাতারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, কারণ বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের গতি ও প্রেসিং তাদের নিয়মিত চাপে ফেলতে পারে।

কাতার ফুটবল দল

মিডফিল্ডে আবদুলআজিজ হাতেম, আহমেদ ফাথি ও আসিম মাদিবোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চেষ্টা করবেন লোপেতেগি। তাদের সঙ্গে মুস্তাফা তারেক, মোহামাদ মান্নাই, আয়ুব আল-আলাউই ও মোহাম্মদ খালেদের মতো খেলোয়াড়রা বিকল্প হিসেবে থাকবেন। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে ম্যাচে টিকে থাকার সম্ভাবনাও বাড়বে

আক্রমণভাগেই কাতারের আসল শক্তি। আকরাম আফিফ এই দলের প্রাণ। তার সঙ্গে আলমোয়েজ আলী, এডমিলসন জুনিয়র, মোহাম্মদ মুনতারি, ইউসুফ আবদুরিসাগ ও অভিজ্ঞ হাসান আল-হাইদোস থাকলে আক্রমণে বৈচিত্র্য তৈরি হয়। আফিফ ও আলমোয়েজের বোঝাপড়াই কাতারের সবচেয়ে বড় ভরসা।

শক্তিমত্তা

কাতারের সবচেয়ে বড় শক্তি আকরাম আফিফকে ঘিরে তৈরি আক্রমণ। তিনি শুধু গোল করেন না, সুযোগ তৈরি করেন, গতি বদলান এবং ম্যাচের ছন্দও নিয়ন্ত্রণ করেন।

আরেকটি বড় দিক তাদের দলগত সমন্বয়। দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলার কারণে কাতার অনেক সময় সংগঠিত ফুটবল খেলতে পারে।

দুর্বলতা

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আন্তর্জাতিক স্তরের চাপ সামলানো। স্কোয়াডের বড় অংশ কাতার স্টার্স লিগভিত্তিক হওয়ায় ইউরোপীয় বা উচ্চগতির প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মানিয়ে নেওয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ।

রক্ষণ থেকে আক্রমণে যাওয়ার সময় এবং বল হারানোর পর দ্রুত পজিশনে ফেরা—এই জায়গাগুলোতেই উন্নতির প্রয়োজন।

কোচের কৌশল

 

কাতার কোচ হুলেন লোপেতেগি

সাধারণত বল দখলভিত্তিক ফুটবলে বিশ্বাসী। তবে কাতারের বাস্তবতা ভেবে তাকে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী কৌশল নিতে হবে।

৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনে কাতারকে দেখা যেতে পারে। রক্ষণে কম্প্যাক্ট থাকা, মাঝমাঠে বল ধরে রাখা এবং আফিফকে হাফ স্পেসে জায়গা করে দেওয়া হতে পারে পরিকল্পনার মূল অংশ।

কাতারের হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে

আকরাম আফিফ এই দলের সবচেয়ে বড় নাম। আরব আমিরাতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার ম্যাচে দুই অ্যাসিস্ট করেই তিনি দেখিয়েছেন, চাপের মুহূর্তে কাতার তার দিকেই তাকায়।

পেদ্রো মিগুয়েল, আকরাম আফিফ,বারশাম

আলমোয়েজ আলী গোলের সামনে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ। তার ফিনিশিং কাতারের আশা বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

মেশাল বারশাম গোলপোস্টে বড় ভূমিকা রাখবেন। কঠিন গ্রুপে কাতার টিকে থাকতে চাইলে তাকে বেশ কয়েকটি ম্যাচেই পার্থক্য গড়তে হবে।

পেদ্রো মিগেল রক্ষণে অভিজ্ঞতা এবং সেট পিসে হুমকি—দুই দিকেই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রেডিকশন

কাতার এই গ্রুপে আন্ডারডগ হিসেবেই নামবে। কানাডা, সুইজারল্যান্ড ও বসনিয়ার বিপক্ষে পয়েন্ট পাওয়া সহজ হবে না। তবে আফিফ যদি নিজের সেরা ছন্দে থাকেন এবং রক্ষণ বড় ভুল এড়াতে পারে, তাহলে অন্তত একটি ম্যাচে চমক দেখানোর সুযোগ আছে। এশিয়া পোস্ট স্পোর্টসের প্রেডিকশন কাতারের জন্য গ্রুপ পর্ব পেরোনো কঠিন হবে। তবে ২০২২ সালের মতো খালি হাতে ফেরার সম্ভাবনা এবার কম, কারণ এই দলটি আগের চেয়ে বেশি পরিণত।

কাতারের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধুই আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি ২০২২-এর হতাশা মুছে দেওয়ার সুযোগ।  এটি প্রমাণ করার সুযোগ, এশিয়ার সাফল্য শুধু নিজেদের অঞ্চলে আটকে নেই।

প্রশ্ন একটাই আফিফদের কাতার কি এবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গল্প লিখতে পারবে, নাকি আবারও থেমে যাবে মাঝপথে?