ফুটবল ম্যাচ কেন ৯০ মিনিটের

ফুটবল মানেই ৯০ মিনিটের টানটান উত্তেজনা। দুই অর্ধে ৪৫ মিনিট করে ভাগ করা এই সময়সীমা আজ বিশ্বজুড়ে এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে, আমরা সাধারণত ভেবেই দেখি না এই নিয়মটি ঠিক কীভাবে এলো। কেন এই খেলা ৮০ কিংবা ১০০ মিনিটের হলো না? অথবা ক্রিকেট-বেসবলের মতো কোনো নির্দিষ্ট সময় ছাড়াই কেন দুই দল মাঠ ছাড়তে পারে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে, যখন ফুটবল আজকের মতো কোনো বৈশ্বিক নিয়মে বাঁধা ছিল না। তখন একেক অঞ্চলে খেলা হতো একেক নিয়মে; কোথাও ম্যাচের দৈর্ঘ্য ছিল অনেক বেশি, কোথাও বল হাতে ছোঁয়া যেত, আবার কোথাও অফসাইড কিংবা গোলপোস্টের কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামোই ছিল না।
উনিশ শতকের ইংল্যান্ড ও নিয়মের হরেক রকম
১৮৬৩ সালে লন্ডনের এক ‘পাব’-এ বসে দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) প্রথম ফুটবলের নিয়মকানুন লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করে। আধুনিক ফুটবলের ভিত্তি স্থাপনে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। তবে এফএ নিয়ম তৈরি করলেও তৎকালীন পুরো ইংল্যান্ডের সব ক্লাব যে তা সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছিল, তা কিন্তু নয়।
সেই সময় ‘শেফিল্ড এফসি’ (Sheffield FC) নিজেদের তৈরি স্বাধীন নিয়মে ফুটবল খেলত। তাদের খেলার ধরন এবং সময়সীমা এফএর নিয়মের চেয়ে একেবারেই আলাদা ছিল। শেফিল্ডের ম্যাচগুলো সাধারণত চলত দীর্ঘ দুই ঘণ্টা (১২০ মিনিট) ধরে। অন্য দিকে লন্ডনের এফএ-ও তখন তাদের নিয়মগুলো নিয়ে এক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
১৮৬৬ সালের সেই ঐতিহাসিক সমঝোতা
ফুটবল ইতিহাসের চাকা ঘুরে যায় ১৮৬৬ সালে, যখন শেফিল্ড এফসি লন্ডনের ব্যাটারসি পার্কে এফএ দলের মুখোমুখি হতে আসে। যেহেতু দুই দলের খেলার নিয়ম ছিল ভিন্ন, তাই ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর আগে দুই পক্ষকে একটি সাধারণ সমঝোতায় আসতে হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক আলোচনার টেবিলেই সিদ্ধান্ত হয়—ম্যাচটি দুই ঘণ্টার বদলে ৯০ মিনিট খেলা হবে।
সমঝোতার জন্ম দিল ইতিহাস
মূলত দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী নিয়মের মাঝামাঝি একটি ‘উইন-উইন’ সমাধান ছিল এই ৯০ মিনিট। এটি শেফিল্ডের দীর্ঘ দুই ঘণ্টার ক্লান্তিকর ম্যাচের চেয়ে কম, আবার খুব ছোটও নয়। দুই পক্ষের খেলোয়াড়দের শারীরিক সহনশীলতা এবং দর্শকদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখে এই সময়টিকেই উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল। ব্যাটারসি পার্কের সেই ম্যাচের পর থেকে ধীরে ধীরে এই ৯০ মিনিটই ফুটবলের অলিখিত মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
১৮৬৬ সালের সেই ফুটবল কিন্তু আজকের মতো মসৃণ ছিল না। তখন গোল করা ছাড়াও ‘টাচডাউন’ (Touchdown) নামক একটি নিয়ম ছিল, যেখানে গোললাইনের পেছনে বল স্পর্শ করতে পারলে টাইব্রেকার হিসেবে পয়েন্ট দেওয়া হতো। ১৮৬৭ সালে এই নিয়মটি বাতিল করা হলেও তত দিনে ৯০ মিনিটের কাঠামোটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আইএফএবি (IFAB)-এর আনুষ্ঠানিক সিলমোহর
ফুটবলের নিয়ম কড়াকড়ি করার পরবর্তী বড় ধাপটি আসে ১৮৯৭ সালে। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ম নির্ধারক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (IFAB) আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোর দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট এবং প্রতি দলে ১১ জন করে খেলোয়াড় থাকার নিয়ম অনুমোদন করে। ব্যস, এরপর থেকেই দুই অর্ধে ৪৫ মিনিট করে মোট ৯০ মিনিটের কাঠামোটি বিশ্ব ফুটবলের চিরন্তন ব্যাকরণে পরিণত হয়।
আধুনিক ফুটবল: ৯০ মিনিট ছাড়িয়েও যেখানে নাটকের বিস্তার
আজকের আধুনিক ফুটবলে অবশ্য রেফারির শেষ বাঁশি বাজতে বাস্তবে ৯০ মিনিটের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। খেলোয়াড়দের চোট, বদলি, গোলের পর বাঁধভাঙা উদযাপন, ভিএআর রিভিউ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে যোগ হওয়া বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’-এর কারণে মাঠের হারিয়ে যাওয়া সময়টুকু পুষিয়ে দিতে রেফারি প্রতি অর্ধের শেষে ‘স্টপেজ টাইম’ বা ‘অ্যাডেড টাইম’ যোগ করেন। ফলে ৯০ মিনিটের ম্যাচ অনেক সময় ১০০ বা ১১০ মিনিট পর্যন্ত গড়ায়। আবার নকআউট পর্বে ড্র এড়াতে ম্যাচ গড়ায় ৩০ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে, এরপরও ফয়সালা না হলে পেনাল্টি শুটআউট।
মাঠ বদলেছে, বলের নকশা বদলেছে, রেফারিকে সাহায্য করতে এসেছে ভিএআর প্রযুক্তি এবং খেলোয়াড়দের গতি ও ফিটনেস বেড়েছে বহুগুণ। তবে ১৯ শতকের ইংল্যান্ডের সেই ব্যাটারসি পার্কের সমঝোতা থেকে জন্ম নেওয়া ‘৯০ মিনিট’ আজও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ধ্রুবক হয়ে টিকে আছে।
