logo
Advertisement

জার্মান ফুটবলে উগ্রপন্থার ছায়া, ব্যানার টাঙিয়ে গুলির হুমকি

দ্য অ্যাথলেটিক
দ্য অ্যাথলেটিক
জার্মান ফুটবলে উগ্রপন্থার ছায়া, ব্যানার টাঙিয়ে গুলির হুমকি
জার্মানির ফুটবল ক্লাব সমর্থকদের মধ্যে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান বাড়ছে। ছবি: গেটি ইমেজ

প্রিয় দলের খেলা দেখে মাঠ থেকে বেরিয়েছিলেন স্টেফান আর। রাস্তায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন কালো পোশাক পরা সুঠামদেহী এক ব্যক্তি। কাছে এসে হাত চেপে ধরলেন। পেছন থেকে এগিয়ে এলেন আরও অন্তত দুজন। ঘিরে ফেলা হলো তাঁকে। গুলি করার হুমকির পর আরেকজনের নির্দেশ, এখনই শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে।

ঘটনাটি ২০১৯ সালের গ্রীষ্মের। জার্মান কাপের ম্যাচে হামবুর্গের মুখোমুখি হয়েছিল কেমনিৎসার এফসি। বার্লিন থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে ক্লাবটির গেলার্টশ্ট্রাসের মাঠের গ্যালারিতে একটি ব্যানার টাঙিয়েছিলেন স্টেফান। রংধনুর রঙে লেখা কথাগুলোতে ছিল বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানানো, বিশ্বজনীনতা ও সহনশীলতার আহ্বান। সেই ব্যানারই তাঁকে বিপদে ফেলে।

নিরাপত্তার কারণে এই প্রতিবেদনে তাঁর প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হয়নি। স্টেফান আগে এমন একটি সমর্থকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলত। কিন্তু সেই গোষ্ঠীর প্রান্তিক কিছু সদস্যের ইসলামবিদ্বেষী ও শরণার্থীবিরোধী মনোভাব তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি গড়ে তোলেন বৈচিত্র্যের পক্ষে একটি সমর্থকগোষ্ঠী।

২০২৪ সালে দ্য অ্যাথলেটিককে স্টেফান বলেছিলেন, ‘তখনই নাৎসিরা বুঝে যায় আমরা কী করতে চাইছি।’ তাঁকে হুমকি দেওয়া লোকেরাও একই ক্লাবের সমর্থক। পরে ফেসবুকে খুঁজে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছিলেন তিনি।

হুমকির প্রভাব কাটেনি। কেমনিৎসারের উগ্র ডানপন্থী সমর্থকেরা সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও তাঁদের প্রভাব প্রবল। স্থানীয় বক্সিং ও মিশ্র মার্শাল আর্টের জগতের সঙ্গেও তাঁদের যোগাযোগ আছে। ম্যাচের দিনে নিজেকে বিশেষভাবে অরক্ষিত মনে হয় স্টেফানের। গ্যালারির দক্ষিণের বাঁকানো অংশটি তিনি এড়িয়ে চলেন। সেখানে উগ্রপন্থীদের এমন দখল, যেন কর্তৃত্ব ফলানোর অধিকার তাঁদেরই। প্রকাশ্যে কোনো সমর্থক আন্দোলনের সঙ্গেও আর যুক্ত নন তিনি।

‘মাঠের কাছে যাওয়ার সময়, আবার বের হওয়ার সময়ও ভয় লাগত,’ বলেছিলেন স্টেফান। ‘কিন্তু আমি জানি, ঘরে বসে থাকলে ওরাই জিতে যাবে।’

জার্মান ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক অনেক পুরোনো। ইংল্যান্ডে সমর্থকদের বিভাজন প্রধানত শহর বা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে। তবে জার্মানিতে বহু ক্লাবের গ্যালারির পরিচয় গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতেও। হামবুর্গের সেন্ট পাওলির সমর্থকদের বামপন্থী পরিচিতি সুপ্রতিষ্ঠিত। আবার কিছু ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে ডানপন্থার প্রভাব রয়েছে। বরুসিয়া ডর্টমুন্ড তার পরিচিত উদাহরণ, যদিও নিজেদের সমর্থকদের উগ্রপন্থী অংশকে সরাতে ক্লাবটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কাজ করেছে।

ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশের মতো জার্মানিতেও ডানপন্থী রাজনীতির সমর্থন বাড়ছে। বিশেষ করে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি, সংক্ষেপে এএফডির উত্থান উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে দলটি। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনে অন্যদের সহায়তা প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো এএফডির সরকারকে সমর্থন না দেওয়ার অবস্থান জানিয়েছে।

এএফডির উত্থানের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে জার্মানিজুড়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। বার্লিনের একটি সমাবেশেই জড়ো হন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। সেখানে শহরের বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের সমর্থকদের ব্যানারও দেখা যায়।

বর্ণবাদ ও উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়েছিল জার্মানির সবচেয়ে বড় ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বামঘেঁষা রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও পরিচিত ক্লাবটির সম্মানসূচক সভাপতি উলি হোয়েনেস এএফডির নীতির সমালোচনা করেন। বিক্ষোভে সমর্থন জানান তৎকালীন কোচ টমাস টুখেল, যিনি এখন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের দায়িত্বে। তিনি বলেছিলেন, ‘যতটা প্রতিবাদ করা দরকার, আমরা এখনো ততটা করছি না। সব ধরনের উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে কোনো সংশয় থাকতে পারে না। আর আমাদের ইতিহাস ও চলমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে তো অবশ্যই।’

ঠিক সেই সময় মিউনিখে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ খেলতে যাওয়া লাৎসিওর একদল সমর্থক রাজনীতিকে নিয়ে আসে অন্যভাবে। উগ্র ডানপন্থী সমর্থকদের জন্য কুখ্যাত ইতালিয়ান ক্লাবটির এই সমর্থকেরা হফব্রয়হাউস আম প্লাৎসলে ফ্যাসিবাদী গান গায়। ১৯২০ সালে এই জায়গাতেই নাৎসি পার্টির প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন অ্যাডলফ হিটলার।

জার্মান ফুটবলের নিচের স্তরেও একই সংঘাত। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চতুর্থ স্তরের কেমনিৎসার খেলেছিল এনার্গি কটবুসের বিপক্ষে। কটবুসের সমর্থকদের মধ্যেও উগ্র ডানপন্থার শক্ত উপস্থিতি রয়েছে। সেই ম্যাচে কেমনিৎসারের দক্ষিণ গ্যালারিতে রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার) মানুষদের বিদ্রূপ করে ব্যানার ওঠে। একটিতে লেখা ছিল, ‘লিঙ্গ মাত্র দুটি, একজন অন্ধ মানুষও তা দেখতে পান।’ অন্যটিতে জার্মান ফুটবল সংস্থার সমর্থকদের জন্য পণ্য বিক্রির দোকানের বিভাগ তুলে ধরা হয়: পুরুষ, নারী, নবজাতক ও শিশু।

পরের ম্যাচে কটবুসের সমর্থকেরাও একই ধরনের ব্যানার দেখায়। তাতে বলা হয়, লিঙ্গ মাত্র দুটি, আর দুটিই জার্মান ফুটবল সংস্থাকে ঘৃণা করে। এএফডির রাজনীতিক গেয়র্গ পাৎসডেরস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একে ‘দারুণ উদ্যোগ’ বলে প্রশংসা করেন।

দুই শহরেই তখন এএফডির জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। অথচ কেমনিৎসে ২০১৮ সালে উগ্র ডানপন্থীদের বিক্ষোভ দাঙ্গায় রূপ নিয়েছিল। শহরটি ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করেছে। ২০২৫ সালের ইউরোপীয় সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ছিল সেই চেষ্টার একটি স্বীকৃতি। কিন্তু পুরোনো পূর্ব জার্মানির বড় শহরগুলোর একটি, একসময় যার নাম ছিল কার্ল-মার্ক্স-শ্টাট, সেখানে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি রয়ে গেছে। বার্লিন থেকে দূরত্ব খুব বেশি না হলেও দ্রুতগতির রেলসংযোগের অভাবে ট্রেনে পৌঁছাতে তিন ঘণ্টার বেশি লাগে।

স্টেফানের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি মানুষকে বিচ্ছিন্ন বোধ করায়। তাঁর মতো মধ্যপন্থীদের অভিযোগ, জাতীয়তাবাদী উগ্রতার বিরুদ্ধে শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে ফুটবল ক্লাব, যথেষ্ট ভূমিকা নেয়নি।

রূপান্তরকামীবিরোধী ব্যানার নিয়ে স্থানীয় একটি সংবাদপত্র প্রশ্ন করলে কেমনিৎসার সরাসরি উত্তর দেয়নি। ক্লাবটি জানিয়েছিল, ঘরের মাঠের ম্যাচের আগে ও চলাকালে স্কোরবোর্ডে নিজেদের মূল্যবোধ তুলে ধরে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বৈষম্যবিরোধী বার্তা দেওয়া হয়। কিন্তু বিতর্কিত ব্যানারগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অবস্থান ছিল না।

স্টেফান জোর দিয়ে বলেন, কেমনিৎসারের সব সমর্থক উগ্র ডানপন্থী নন, অনেকে ডানপন্থীও নন। ২০২৪ সালে তাঁর হিসাবে, বিপজ্জনক উগ্রপন্থীদের সংখ্যা ৫০ জনেরও কম। কিন্তু তাঁদের প্রভাব এত বেশি যে সাধারণ সমর্থক থেকে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যেও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। বিরোধিতা করলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই প্রভাবের বড় একটি উদাহরণ টমাস হালার। নিজেকে নব্যনাৎসি বলে পরিচয় দেওয়া এই ফুটবল হুলিগ্যান ২০১৯ সালে ক্যানসারে মারা যান। কেমনিৎসারের মাঠের ভেতরেই তাঁর স্মরণানুষ্ঠান হয়। কালো পোশাক পরা সমর্থকেরা হাতে জ্বলন্ত ফ্লেয়ার তুলে ধরেন। গথিক হরফের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘শান্তিতে ঘুমাও, টমি।’ স্টেডিয়ামের ঘোষকও ক্লাবের প্রতি হালারের সমর্থনকে সম্মান জানিয়ে বলেন, তিনি কেমনিৎসার এফসির জন্যই বেঁচেছিলেন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে হালার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হুনারা নামের সমর্থকগোষ্ঠী। নামটির অর্থই ছিল হুলিগ্যান, নাৎসি ও বর্ণবাদী। তাঁর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হালার সিকিউরিটি ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্লাবের সঙ্গে কাজ করেছে। পরের বছর কেমনিৎসার হুনারা ও এনএস-বয়েজকে নিষিদ্ধ করে। দ্বিতীয় গোষ্ঠীটির প্রতীকে হিটলার ইয়ুথের এক সদস্যের ছবি ব্যবহার করা হতো।

তারপরও ক্লাব যথেষ্ট উদ্যোগী হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন তোলেন স্টেফান। তাঁর মতে, উগ্রপন্থীদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষকে মাঠবিমুখ করেছে। আবার দর্শক ও আয় হারানোর ভয়ে ক্লাব সেই উগ্রপন্থীদের নিষিদ্ধ করতেও দ্বিধায় পড়ে। এভাবে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের মাঠে ১৫ হাজার দর্শকের জায়গা আছে। কিন্তু সাধারণত আসে প্রায় তিন হাজার। মানুষ এসবের অংশ হতে চায় না।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘কেউ কি মাঠে এসে নিরাপদ বোধ করবে? এটাই যদি আপনার ভাবমূর্তি হয়, তাহলে ক্লাবকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে, এমন পৃষ্ঠপোষক পাওয়া অসম্ভব।’

কেমনিৎসারের বর্ণবাদবিরোধী দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা হুমকি পাওয়ার পর স্টেফানকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জার্মান সাময়িকী ডের স্পিগেল ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন করলে ক্লাবের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুখপাত্র স্টেফানের বক্তব্য নিয়ে সংশয় তৈরি করেন। ঘটনাটিকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এমন কয়েকজনের কাজ হিসেবে, যারা রাজনৈতিকভাবে তাঁর মতের সঙ্গে একমত ছিল না, অথবা একটু বেশি বিয়ার খেয়েছিল।

ক্লাব মৃদুভাবে নিন্দা জানালেও ঠিক কী বলা হয়েছিল, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ডের স্পিগেল পুলিশকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে কর্তৃপক্ষ জানায়, ঘটনার বিবরণে কোনো অসংগতির কথা তাদের জানা নেই। তবে শেষ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি।

স্টেফান বলেছিলেন, ‘কী বলা হয়েছিল, আমি ঠিকই জানি। এই ঘটনার পর ক্লাবের ওপর আমার আস্থা অনেকটাই হারিয়ে গেছে।’

হালারকে স্মরণ করার ঘটনা গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি গোল করার পর কেমনিৎসারের ফরোয়ার্ড ডানিয়েল ফ্রান কালো রঙের একটি টি-শার্ট তুলে ধরেছিলেন। তাতে স্থানীয় হুলিগ্যানদের সমর্থন করার আহ্বান ছিল।

ফ্রানের ব্যাখ্যা ছিল, হালারের চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহে টি-শার্টটি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি ভেবেছিলেন। নব্যনাৎসি গোষ্ঠীর সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা জানতেন না। তাঁকে জরিমানা করা হয়। চার মাস পর চোটের কারণে খেলতে না পারা একটি ম্যাচে পরিচিত উগ্র ডানপন্থীদের পাশে বসতে দেখা যায় তাঁকে। নব্যনাৎসি গোষ্ঠীর প্রতি প্রকাশ্যে সহানুভূতি দেখানোর অভিযোগে এবার চুক্তি বাতিল করে ক্লাব।

কেমনিৎসার তখন বলেছিল, উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা তাদের কর্তব্য। ফ্রান অবশ্য উগ্র ডানপন্থার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, তিনি শুধু সমর্থকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে চেয়েছিলেন।

এর কয়েক সপ্তাহ পরই হুমকি পান স্টেফান। নিজের ঘটনায় ক্লাবের কাছ থেকে একই মাত্রার সমর্থন পাননি বলে তাঁর আক্ষেপ ছিল। তারপরও ফ্রানের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন তিনি। স্টেফানের ভাষায়, কেমনিৎসে সমর্থকদের কাছাকাছি থাকতে গেলে সমস্যা হয়। কারণ, সবচেয়ে প্রভাবশালীদের কিছু শহরের সবচেয়ে বিপজ্জনক উগ্র ডানপন্থীও। তাঁরা সব সময় থাকেন এবং যোগাযোগ তৈরির পথ খুঁজে নেন।

ফ্রানের গল্পের পরের অধ্যায় অবশ্য অন্যরকম। বার্লিনের কাছে পটসডামে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলারের পুরোনো ক্লাব এসভি বাবেলসবের্গ। বামপন্থী মূল্যবোধে পরিচালিত ক্লাবটি জার্মান ফুটবলে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম পরিচিত নাম। যে সড়কে তাদের স্টেডিয়াম, সেটির নাম কার্ল লিবকনেখটের নামে। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির এই সহপ্রতিষ্ঠাতা হত্যার শিকার হন এবং ইউরোপের বামপন্থী রাজনীতিতে শহীদের মর্যাদা পান।

২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের সময় শরণার্থী ফুটবলারদের নিয়ে একটি দল গড়েছিল বাবেলসবের্গ। তারও আগে প্রকাশ্যে নিজের সমকামী পরিচয় জানানো সাবেক ফুটবলার টমাস হিৎসলসপের্গারকে ডেকে সমকামীবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে ক্লাবটি। পরে অটিজম আছে, এমন খেলোয়াড়দের জন্যও দল গড়ে তারা। ছোট শিশুদের দেখাশোনার ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে মা-বাবারা খেলা দেখতে পারেন। এমনকি মাঠের বাড়তি ঘাস থেকে তৈরি কাগজে ছাপা ম্যাচপুস্তিকাও কিনতে পারেন দর্শকেরা।

২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাবেলসবের্গে খেলেছিলেন ফ্রান। সমর্থকদের সঙ্গে সহজে মিশতেন। তবে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল না। ফুটবলজীবন নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এরপর যান আরবি লাইপজিগে, পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রেড বুলের বিপুল বিনিয়োগে যে ক্লাব তখন একের পর এক ধাপ পেরিয়ে ওপরে উঠছিল।

কেমনিৎসার চুক্তি বাতিল করার পাঁচ মাস পর বাবেলসবের্গে ফেরেন ফ্রান। পরে দলের অধিনায়কও হন। তাঁকে ফেরানো নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে মতভেদ ছিল। তবে ক্লাব সভাপতি আর্খিবাল্ড হরলিৎস আজীবন সদস্যদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁদের কেউ ফ্রানকে নাৎসি কিংবা ডানপন্থী মতাদর্শের অনুসারী মনে করেন কি না। হরলিৎসের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউই তা মনে করেননি।

অন্য ক্লাবের সমর্থকেরা অবশ্য খোঁচা দিতে ছাড়েননি। তাঁদের অভিযোগ, ফ্রানের গোল পাওয়ার আশায় নিজেদের আদর্শের সঙ্গে আপস করেছে বাবেলসবের্গ। ক্লাবের উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য বারবারা পেখ বিষয়টি অন্যভাবে দেখেন। ২০২৪ সালে তিনি বলেছিলেন, ফ্রানের ফেরা এবং নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসার গল্পটি পুনর্মিলনের শক্তিশালী উদাহরণ।

পেখ নিজে এসেছেন পূর্ব জার্মানির থুরিঙ্গিয়া থেকে। বার্লিন প্রাচীর পতনের পর পটসডামের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। খালি ভবনে বসতি গড়ে তোলা মানুষের ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায়ও তাঁকে টেনেছিল। পুরোনো পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বামপন্থা থেকে ডানপন্থার দিকে সরে যাওয়ার কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যায় সেই সময়ের অভিজ্ঞতায়।

পশ্চিম জার্মানির রাজনীতিকেরা পূর্বের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ঢেলে সাজাতে শুরু করলে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। ব্যাপক ছাঁটাই শুরু হয়। চার দশক ধরে নিশ্চিত চাকরির অভিজ্ঞতা থাকা মানুষ প্রথমবার বেকার হয়ে পড়েন। সেই তীব্র হতাশা ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ অনেক পূর্ব জার্মান আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

২০২৪ সালেও অর্থনীতিতে পশ্চিমের চেয়ে পিছিয়ে ছিল পূর্ব জার্মানি। ফুটবলেও তার ছাপ ছিল। ১৯৯১ সালে দুই অঞ্চলের প্রতিযোগিতা একীভূত হওয়ার সময় পূর্বের ওবারলিগা থেকে মাত্র দুটি ক্লাব বুন্দেসলিগায় জায়গা পায়। ২০২৪ সালের হিসাবে, পুরোনো ওবারলিগার ১৪ দলের মধ্যে দুটি দ্বিতীয় স্তরে, ১০টি তৃতীয় স্তর বা তার নিচে খেলছিল। বাকি দুটির আর অস্তিত্ব ছিল না।

পূর্ব জার্মানির ফুটবলে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও বঞ্চনার গল্প আরও পুরোনো। ১৯৭৮ সালে গোপন পুলিশ সংস্থা স্টাসির প্রধান এরিখ মিলকে ডায়নামো ড্রেসডেনের সাজঘরে গিয়ে খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, তাঁদের আধিপত্যের যুগ শেষ। এরপর টানা ১০টি ওবারলিগা শিরোপা জেতে ডায়নামো বার্লিন। ক্লাবটির সদস্যদের বড় অংশের সঙ্গে স্টাসির সম্পর্ক ছিল।

কয়েকজন ইতিহাসবিদের মতে, এই সময়েই পূর্ব জার্মানির ফুটবল গ্যালারি উগ্র ডানপন্থীদের আশ্রয় হয়ে ওঠে। ডায়নামো বার্লিনও এর বাইরে ছিল না। রেফারিদের অনুকূল সিদ্ধান্তসহ নানা সুবিধায় দলটির আধিপত্য এমন পর্যায়ে যায় যে দর্শকেরা প্রতিযোগিতার ওপর বিশ্বাস হারাতে থাকেন। মাঠে উপস্থিতিও কমে যায়।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির এক মঙ্গলবার রাতে বাবেলসবের্গে জভিকাউয়ের উপস্থিতি সেই অতীত ও বর্তমানকে পাশাপাশি এনে দাঁড় করায়। ১৯৪৯–৫০ মৌসুমে পূর্ব জার্মানির ওবারলিগার প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জভিকাউ। অথচ ২০১৬ সালের পর প্রথমবার চতুর্থ স্তরে নেমে যাওয়া দলটি তখন ভিন্ন বাস্তবতায়। আগের মৌসুমে তাদের কট্টর সমর্থকেরা বাবেলসবের্গের একটি ব্যানার চুরি করেছিলেন। ফলে ম্যাচ ঘিরে কার্ল লিবকনেখট স্টেডিয়ামের বাইরে পুলিশের উপস্থিতি ছিল বেশি।

গোলমাল বাধে মাঠের ভেতরেই। বাবেলসবের্গের ছোট একটি সমর্থকদল গেট ঠেলে মাঠ দিয়ে জভিকাউয়ের গ্যালারিতে ঢোকার চেষ্টা করে। খেলা শুরু করতে দেরি হয়। ফ্লেয়ারের তীব্র আলো ও ধোঁয়া ছড়ানো বোমার মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আর ফুটবল হুলিগ্যানবৃত্তির সীমারেখা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

জভিকাউয়ের তরুণ সমর্থকদের একটি অংশ বামপন্থী বলে পরিচিত। কিন্তু বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থানের আরেকটি অংশের সঙ্গে সেদিন এসেছিলেন ডায়নামো ড্রেসডেনের উগ্র ডানপন্থী সমর্থকেরাও। হলুদ রঙের স্কি-মুখোশে মুখ ঢেকে রাখায় তাঁদের আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল।

জার্মানির সব ক্লাবের সমর্থকদের রাজনৈতিক পরিচয় বাবেলসবের্গের মতো সহজে নির্ধারণ করা যায় না। আবার বাবেলসবের্গও কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয়। পেখের ভাষায়, ক্লাবটি একটি অবস্থান নেয়।

‘আমরা গণতান্ত্রিক, আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী। আমাদের দেশের এমন একটি ইতিহাস আছে, যা মনে রাখতে হবে,’ বলেছিলেন তিনি।

পটসডামের আশপাশে সেই ইতিহাস খুব দূরের কিছু মনে হয় না। কয়েক মাইল পূর্বে ভানজের হ্রদের ধারের সম্মেলনকেন্দ্রে ইহুদি নিধনের পরিকল্পনা নিয়ে কুখ্যাত বৈঠক হয়েছিল। উত্তরে গ্লিনিকে সেতু শীতল যুদ্ধের সময় গুপ্তচর বিনিময়ের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর পশ্চিমে ল্যান্ডহাউস আলডন অতিথিশালায় ২০২৩ সালে বসেছিল আরেকটি বৈঠক।

সেখানে এএফডির একটি প্রতিনিধিদল এবং জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার উগ্র ডানপন্থী মহলের পরিচিত ব্যক্তিরা কথিত ‘পুনরভিবাসন’ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। এর আওতায় ব্যাপকভাবে দেশছাড়া করার কথা ছিল অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী এবং বিদেশি বংশোদ্ভূত এমন জার্মান নাগরিকদের, যাঁদের সমাজের সঙ্গে মিশতে ব্যর্থ বলে বিবেচনা করা হবে।

পেখ জানিয়েছিলেন, এই বৈঠকের খবরে বাবেলসবের্গের সদস্যেরা বিচলিত হন। অনেকে এএফডিবিরোধী মিছিলে অংশ নেন। তবে তাঁরা কেউ বিস্মিত হননি। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় নির্বাচন ও পরবর্তী ফেডারেল নির্বাচন সামনে রেখে বাবেলসবের্গের মতো ক্লাবগুলোর আরও জোরে কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে করতেন তিনি। তাঁর কথা, ‘খেলাধুলা মানুষকে এক করে। একে অন্যের পাশে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, তা শেখায়।’

জভিকাউয়ের বিপক্ষে বাবেলসবের্গের ৩–১ গোলের জয়ের রাতে গ্যালারিতে পেখের পাশে ছিলেন ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপের মার্টিন এন্ডেমান। তিনি কাছের ক্লাব টেনিস বরুসিয়া বার্লিনের সমর্থক। সেই ক্লাবও সবাইকে সঙ্গে নেওয়া ও বৈষম্যবিরোধী অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়।

নিজের দল না হলেও বাবেলসবের্গের জয়ে খুশি ছিলেন এন্ডেমান। গ্যালারিতে তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, সবাইকে চেনেন, সবাইও তাঁকে আপন করে নিয়েছেন। জার্মান ফুটবলে একই মূল্যবোধে বিশ্বাসী সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

অন্য ইউরোপীয় দেশের চেয়ে জার্মানির সমর্থকেরা বেশি রাজনীতিসচেতন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে এন্ডেমান ক্লাব পরিচালনার ব্যবস্থার কথা বলেন। জার্মান ফুটবলের ‘৫০+১’ নিয়ম সদস্যদের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাধিকার রাখার নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে।

এন্ডেমানের ব্যাখ্যা, ‘সদস্যভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে এখানে নিজেদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের বেশি। এর ফলে জার্মানির ফুটবল ক্লাবগুলো আশপাশের এলাকা ও মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আমাদের ক্লাব কোন মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়াবে, তা নির্ধারণে আমাদের ভূমিকা থাকে। এর ভালো ও খারাপ, দুই ধরনের ফলই হতে পারে।’

বাবেলসবের্গ ও টেনিস বরুসিয়ার মধ্যে এই অনানুষ্ঠানিক বন্ধন বার্লিনের অন্য অংশেও ছড়িয়ে আছে। গেজেলশাফটসশ্পিলে নামের একটি সংগঠন ফ্যাসিবাদবিরোধী ক্লাব ও সমর্থকগোষ্ঠীগুলোকে কাছাকাছি আনতে সাহায্য করেছে। পেখ ও এন্ডেমান দুজনই জানেন, ক্রয়েৎসবের্গ এলাকার তুর্কিয়েমস্পোরের মতো ক্লাবগুলো কী করার চেষ্টা করছে। একসময় এই এলাকার পূর্ব সীমানা ছিল বার্লিন প্রাচীর।

১৯৭৮ সালে গড়ে ওঠা তুর্কিয়েমস্পোর আশির দশকে জার্মান ফুটবলের তৃতীয় স্তরে উঠেছিল। তাদের খেলা দেখতে তিন হাজারের বেশি দর্শক আসতেন। কিন্তু প্রাচীর পতনের পরের ইতিহাস দেখায়, বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত বর্ণবাদ কীভাবে একটি ক্লাবের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। ২০২৪ সালে ক্লাবটি খেলছিল বার্লিনের অপেশাদার লিগে।

তখনকার চেয়ারম্যান মুরাত দোয়ান বড় হয়েছেন ক্লাবের সোনালি সময় দেখে। ক্রয়েৎসবের্গের তুর্কি সম্প্রদায়ের সঙ্গে তুর্কিয়েমস্পোরের সম্পর্ক তখন অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল। দোয়ানের মতে, দর্শক টানা তুলনামূলক সহজও ছিল। টেলিভিশন সবার ঘরে ছিল না। বার্লিনের খুব কম তুর্কিই দেশের গালাতাসারাই, ফেনেরবাচে বা বেশিকতাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারতেন।

‘তুর্কিয়েমস্পোর দেশের সঙ্গে সংযোগের কাজ করত,’ বলেছিলেন দোয়ান।

ক্রয়েৎসবের্গের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্প্রে নদী। ওপারে ফ্রিডরিখসহাইন, তখনকার পূর্ব জার্মানি। দুই জার্মানি এক হওয়ার পর তুর্কিয়েমস্পোর এমন সব দলের মুখোমুখি হতে শুরু করে, যাদের সঙ্গে আগে কখনো খেলেনি।

দোয়ান নিজে ক্লাবের মাঝমাঠে খেলতেন। পূর্বাঞ্চলে খেলতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে মনে রেখেছেন সহিংস এক পরিবেশ হিসেবে। পশ্চিম ইউরোপ থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন সেই অঞ্চলে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব অনেক বেশি তীব্র ছিল। একবার তাঁর দিকে শূকরের মাথা ছুড়ে দেওয়া হয়। তাঁকে ও সতীর্থদের নিয়মিত পাথর ছুড়ে মারা হতো।

বিষয় :