logo

যুদ্ধের ছায়ায় ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ 

যুদ্ধের ছায়ায় ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ 

আর মাত্র তিন মাস পর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে শুরু হওয়ার কথা ফুটবল বিশ্বকাপ। কিন্তু টুর্নামেন্ট ঘিরে উৎসবের আবহের বদলে এখন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে একটিই যে দেশ এই ফুটবল মহাযজ্ঞের আয়োজক, সেই যুক্তরাষ্ট্রই যদি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া একটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালায়, তবে সেই বিশ্বকাপ কতটা স্বাভাবিক থাকবে?

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা আঘাত শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ, ইরানের অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা ও ফিফার অবস্থান সবকিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আর সামনে এসেছে বেশ কিছু প্রশ্ন।

ইরান কি বিশ্বকাপে খেলবে

ইরান ইতোমধ্যে ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে। গ্রুপ পর্বে তাদের ম্যাচ রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে এবং সিয়াটলে মিশরের বিরুদ্ধে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালেও ইরানকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। তবে হামলার পর ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান মাহদি তাজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় অনিশ্চয়তা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে নেবে, আদৌ অংশ নেবে কি না এখনই এসবকিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ফিফা জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সংস্থাটির মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম বলেছেন, তাদের লক্ষ্য ‘সবাইকে নিয়ে নিরাপদ বিশ্বকাপ আয়োজন করা।’

যদি ইরান বয়কট করে বা অংশ না নেয়, তাহলে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) অন্য কোনো দলকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে ইরাক বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম আলোচনায় রয়েছে।

নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই একটি নির্বাহী আদেশে ইরানসহ ১২ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। যদিও বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা এর বাইরে।

তবুও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইরানের ম্যাচগুলো হয়েছিল দেশটির ভেতরের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পটভূমিতে। এবারও একই ধরনের উত্তেজনা দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসে; যেখানে বিশ্বের অন্যতম বড় ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে।

মানবাধিকার সংগঠন ফেয়ারস্কয়ারের নিক ম্যাকগিহান বলেন, ‘এটি এক অজানা পরিস্থিতি। বিশ্বকাপের মাত্র তিন মাস আগে আয়োজক দেশ অংশগ্রহণকারী দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে—এমন নজির আগে নেই।’

তিনি মনে করেন, ইরান সরে দাঁড়ালে ফিফা হয়তো স্বস্তি পাবে, কারণ প্রতিবাদ ও অস্থিরতার ঝুঁকি কমবে।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও ফিফার ‘পিস প্রাইজ’

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে ফুটবল অঙ্গনে। গত ডিসেম্বর বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে ফিফার প্রথম ‘পিস প্রাইজ’ দেওয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, তিনি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা রেখেছেন।

কিন্তু এরপর যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা, নাইজেরিয়া ও ইরানে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে সমালোচকেরা বলছেন, ফিফা কি অতিরিক্ত রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে?

ইউরোপের কিছু রাজনীতিক ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কটের কথাও তুলেছেন।

ফিফা অবশ্য বরাবরই বলে এসেছে, তারা রাজনৈতিক বিষয়ে নিরপেক্ষ। গত বছর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরও ফিফা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। তবে ঠিকই একই কারণ দেখিয়ে তারা রাশিয়াকে বাদ দেয়।

সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল টুর্নামেন্ট থাকবে না এটি হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের সঙ্গেও বিশ্বকাপকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের অনুপস্থিতি বা অংশগ্রহণ—দুই ক্ষেত্রেই উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বকাপ শুরু হতে এখনও কিছুটা সময় বাকি। কিন্তু গত ৪৮ ঘণ্টায় যা ঘটেছে, তা প্রমাণ করে ফুটবল ও রাজনীতি কখনো পুরোপুরি আলাদা নয়।

ইরান খেলবে কি না, ফিফা কী সিদ্ধান্ত নেবে, বিশ্বকাপ কতটা নিরাপদ হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, এর পেছনে থাকবে এক জটিল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।