চাপ নয়, ব্রাজিলকে আনন্দ নিয়ে খেলতে বললেন আনচেলত্তি

ফুটবলের অন্যতম সেরা দল ব্রাজিলের সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়। ভুল পাস যেন জাতীয় সংকট হয়ে দাঁড়ায়, চাপ যেন আনন্দকে ঢেকে ফেলে, আর সৃজনশীলতা যেন উদ্বেগের নিচে চাপা পড়ে। বিশ্বকাপ শুরুর এক মাসেরও কম সময় আগে ব্রাজিলকে সেই পুরোনো ভয় থেকে বের করে আনতেই চাইছেন সেলেসাও কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
রিও ডি জেনেইরোতে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তরে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রাজিল কোচ বলেছেন, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আবার নিজেদের স্বভাবের কাছে ফিরতে হবে। তবে শুধু আনন্দ বা প্রতিভা দিয়ে নয়, সেই আনন্দকে রাখতে হবে সংগঠন, শৃঙ্খলা ও দলীয় দায়িত্ববোধের ভেতরে।
আনচেলত্তির চোখে ব্রাজিলের বড় সমস্যা চাপের ভার। তিনি বলেন, ‘এই বছর আমি যেটা দেখেছি, সত্যি বলতে, খেলোয়াড়দের ওপর অনেক চাপ আছে। আমার মনে হয়, খেলোয়াড়রাও নিজেদের ওপর অনেক চাপ নেয়, কখনও কখনও খুব বেশি। ফলে চাপ আর দুশ্চিন্তা আনন্দ, শক্তি এবং ব্রাজিলিয়ানদের সৃজনশীলতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়।’
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতা শুধু কৌশলগত ভুল দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়নি, বারবার এসেছে মানসিক ভাঙনের কথাও। আনচেলত্তিও বন্ধুসুলভ ম্যাচে সেই লক্ষণ দেখেছেন। তার মতে, কখনও কখনও সতীর্থের একটি ভুলও খেলোয়াড়রা অতিরিক্ত ভারীভাবে নেয়।
তিনি বলেন, ‘কিছু প্রীতি ম্যাচে আমি দেখেছি, সতীর্থের একটি ভুল যেন ট্র্যাজেডির মতো মনে হয়। এসব এড়াতে আমাদের একটি রুটিন তৈরি করতে হবে। কারণ চাপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চাপ ভালোভাবে সামলাতে পারলে প্রেরণা বাড়ে, পারস্পরিক বন্ধন বাড়ে, কারণ চাপ ভাগ করে নেওয়া যায়। তখন সেটা একা কারও ওপর এত ভারী হয়ে পড়ে না।’
ব্রাজিল নিয়ে চিরন্তন প্রশ্ন, তারা কি সুন্দর ফুটবল খেলবে, নাকি শুধু জিতবে? আনচেলত্তি এই প্রশ্নটাকেই ভুল মনে করেন। তার কাছে ব্রাজিলের পরিচয় মুছে দেওয়া নয়, বরং সেই পরিচয়কে আধুনিক ফুটবলের কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই আসল কাজ।

আনচেলত্তি বলেন, ‘ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ও ব্রাজিলিয়ান ফুটবল যা হারাতে পারে না, সেটি হলো তাদের সবচেয়ে বড় গুণ, সৃজনশীলতা, আনন্দ ও শক্তি।’
এই ভাবনার সবচেয়ে পরিষ্কার ছবি আনচেলত্তি খুঁজে পেয়েছেন ফুটবল মাঠে নয়, রিওর কার্নিভালে। এ বছর প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের কার্নিভাল দেখেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জাতীয় দলের জন্য তিনি নতুন উপমা টেনেছেন।
ইতালিয়ান কোচ বলেন, ‘এ বছর এখানে আমার প্রথম কার্নিভাল ছিল। আমি অনেক আনন্দ, অনেক শক্তি দেখেছি। মানুষ সূর্য ওঠা পর্যন্ত নাচছে। কিন্তু একই সঙ্গে সবাই যে উৎসবের অংশ মনে করে, সেখানে সবার বড় দায়বদ্ধতাও দেখেছি। আপনি যদি রিওতে প্যারেড দেখেন, সবকিছু নিখুঁতভাবে সংগঠিত, সময়, সংগীত, সবকিছু। ব্রাজিলিয়ান মানুষের এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আমি জাতীয় দলে আনতে চাই, আনন্দ, শক্তি, সংগঠন, দায়বদ্ধতা ও মানসিকতা।’

ব্রাজিলের ফুটবলীয় আভা হারিয়ে গেছে, এমন ধারণাও মানছেন না আনচেলত্তি। তার মতে, কয়েকটি হতাশাজনক বিশ্বকাপ দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া ব্রাজিলের ফুটবল পরিচয় মুছে যায় না।
তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলের বিশেষ কিছু আছে, সব সময় থাকবে। ব্রাজিলের বড় প্রতিভা তৈরি করার ক্ষমতা ছিল, এখনও আছে। এখনো এই দেশ অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি প্রতিভা তৈরি করে।’
তবে আনচেলত্তি এটাও মনে করেন, আধুনিক ফুটবলের তীব্রতা, কাঠামো ও দলীয় শ্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্রাজিল কিছুটা ধীর ছিল। তাই প্রতিভাকে রক্ষা করতে হবে সংগঠনের ভেতরে।
তার ভাষায়, ‘ব্রাজিলের গুণগুলো আগের মতোই আছে, কিন্তু সেই সৃজনশীলতাকে সংগঠন, দায়বদ্ধতা ও মানসিকতা দিয়ে সহায়তা করতে হবে। প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিভাকে হারাতে সংগঠন দরকার। আমরা সেটা করব, কারণ সংগঠন শেখানো যায়, প্রতিভা শেখানো যায় না।’
‘জোগো বনিতো’ নিয়েও নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন আনচেলত্তি। তার কাছে সুন্দর ফুটবল শুধু ব্যক্তিগত স্কিল নয়। সেটি হতে পারে দলীয় কাজ, সম্মিলিত দায়বদ্ধতা, বল পায়ে দারুণ দলীয় মানসিকতা এবং সবার কঠোর পরিশ্রম।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে অনেকেই এবার প্রধান ফেবারিট ভাবছে না। আনচেলত্তি এতে অস্বস্তি দেখছেন না। বরং তার মতে, এবারের বিশ্বকাপে কোনো নিখুঁত দল নেই।
আনচেলত্তি বলেন, ‘আমি এটা পছন্দ করি। আমার মনে হয়, এটা এমন একটি বিশ্বকাপ যেখানে পরিষ্কার কোনো ফেবারিট নেই। কারণ প্রতিটি দলেরই সমস্যা আছে। কোনো নিখুঁত দল নেই। আমার বিশ্বাস, সবচেয়ে সহনশীল দলই বিশ্বকাপ জিতবে।’
২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপ জেতে না ব্রাজিল। ২০০২ সালের পর আর ট্রফি ওঠেনি তাদের হাতে। সেই মর্যাদা ফেরানোর পথ আনচেলত্তির কাছে খুব সরল, কিন্তু কঠিন।
তিনি বলেন, ‘ফুটবলে মর্যাদা ফিরে পাওয়ার একটাই পথ আছে, সেটি হলো বিশ্বকাপ জেতা।’