ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে আজ ম্যানচেস্টারের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই

ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েই নতুন দলকে ‘ম্যানচেস্টারের রাজা’ বলেছিলেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন। আজ ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সেই দাবির উত্তাপ নিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মুখোমুখি হচ্ছে সিটি। মৌসুমের প্রথম প্রিমিয়ার লিগ ডার্বিতে একদিকে টানা জয়ে ছুটতে থাকা এনজো মারেসকার দল, অন্যদিকে ঘরের মাঠে নগর প্রতিদ্বন্দ্বীকে আবার হারিয়ে আত্মবিশ্বাস ফেরানোর অপেক্ষায় মাইকেল ক্যারিকের ইউনাইটেড।
আজ রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে নয়টায় শুরু হবে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দুই দলের ১৯৯তম সাক্ষাৎ। প্রথম তিন লিগ ম্যাচ জিতে সিটির পয়েন্ট ৯, সমান ম্যাচে ইউনাইটেডের ৪। ফলে ডার্বির ফল পয়েন্ট তালিকাতেও দুই প্রতিবেশীর অবস্থান বদলে দেবে।
অ্যান্ডারসনের মন্তব্যের পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন মারেসকা। তার ব্যাখ্যা, গত দেড় দশকে সিটির দাপট দেখেই বড় হয়েছেন এই মিডফিল্ডার, তাই তার এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবে তার আগের সময়ে শহরের ফুটবলে ইউনাইটেডের শ্রেষ্ঠত্বও মেনে নিয়েছেন ইতালিয়ান কোচ।
সেই পুরোনো দাপট ফিরে পাওয়ার আশায় থাকা ইউনাইটেডের জন্য জানুয়ারির ডার্বিটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। অন্তর্বর্তী কোচ হিসেবে ক্যারিকের নতুন অধ্যায়ের প্রথম ম্যাচেই সিটিকে ২–০ গোলে হারিয়েছিল তারা। ব্রায়ান এমবেউমো ও প্যাট্রিক দোরগুর গোলে থেমেছিল সিটির টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পথচলা। মে মাসে স্থায়ী দায়িত্ব পাওয়া ক্যারিক এবার ডার্বিতে নামছেন নিজের দলের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ নিয়ে।
ঘরের মাঠ অবশ্য তাকে ভরসা দিচ্ছে। এই দফায় ক্যারিকের অধীনে প্রিমিয়ার লিগে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের ১০ ম্যাচের নয়টিতেই জিতেছে ইউনাইটেড। কিন্তু চলতি মৌসুমের শুরুটা প্রত্যাশামতো হয়নি। হাল সিটির কাছে ০–২ গোলে হারের পর ইপসউইচকে ৫–২ গোলে হারালেও এভারটনের সঙ্গে ২–২ গোলে ড্র করেছে তারা।
গোল করায় দুই দলের ব্যবধান নেই। প্রথম তিন ম্যাচে সিটি ও ইউনাইটেডের গোল সাতটি করে, লক্ষ্যে শটও সমান ১৯টি। উদ্বেগের জায়গা ইউনাইটেডের রক্ষণ। তিন ম্যাচেই দুটি করে গোল খেয়েছে তারা, ছয়টির তিনটিই প্রথম ১৫ মিনিটে। সিটির মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে শুরুতেই পিছিয়ে পড়লে ঘুরে দাঁড়ানোর কাজ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

সিটি আবার এসেছে বড় পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে। এক দশক পর পেপ গার্দিওলার বিদায়ে কোচের আসনে মারেসকা। রদ্রি ও বের্নার্দো সিলভার মতো পরিচিত মুখও আর দলে নেই। নতুন মাঝমাঠে এসেছেন এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যান্ডারসন ও আইয়ুব বুয়াদ্দি। এত পরিবর্তনের পরও লিগের প্রথম তিন ম্যাচ জেতা নতুন কোচের জন্য স্বস্তির। তবে প্রথম ম্যানচেস্টার ডার্বি তার দল গড়ার প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।
এই তিন মিডফিল্ডারকে ঘুরিয়ে ব্যবহার করছেন মারেসকা। কভেন্ট্রির বিপক্ষে শুরু করেছিলেন এনজো ও অ্যান্ডারসন, পোর্তোর বিপক্ষে এনজোর পাশে ছিলেন বুয়াদ্দি। ফলে ম্যাচের মধ্যে বদলি নামিয়েও মাঝমাঠের গতি ও নিয়ন্ত্রণ বদলানোর সুযোগ থাকছে সিটির। ক্যারিকের পরিকল্পনায় এই বিকল্পগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। মারেসকার কথা, ‘সেখানে জিততে হলে আমাদের পরিপূর্ণ পারফরম্যান্স দরকার।’

কৌশলের বড় লড়াই হতে পারে ইউনাইটেডের রক্ষণ ও মাঝমাঠের মাঝের জায়গায়। মারেসকার সিটি বল পেলে প্রায়ই পেছনে তিনজন, মাঝখানে দুজন এবং সামনের পাঁচটি জায়গায় পাঁচজন রেখে আক্রমণ সাজায়। এই ব্যবস্থায় রায়ান শেরকি ফাঁকা জায়গায় বল পেলে তাঁকে আটকাতে কোবি মাইনু বা ইউরি তিলেমান্সকে এগোতে হতে পারে। তখন তাদের পেছনে তৈরি হওয়া ফাঁক দিয়ে হালান্ডের কাছে বল পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকবে। তাই স্ট্রাইকারকে পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর কাছে বল যাওয়ার পথও বন্ধ করা জরুরি।
ইউনাইটেডের সুযোগ তৈরি হতে পারে ঠিক উল্টো পরিস্থিতিতে। সিটির ফুলব্যাক মাঝমাঠে উঠে এলে বল হারানোর পর পাশের জায়গা খালি পড়ে যেতে পারে। ব্রুনো ফার্নান্দেজ দ্রুত সেখানে পাস পাঠাতে পারলে এমবেউমো কিংবা একাদশে থাকা রাশফোর্ড বা কুনিয়া বিপদ তৈরি করতে পারেন। তবে নিজের অর্ধে বল পাওয়ার পর প্রথম পাসটি ঠিকঠাক দেওয়া জরুরি হবে। সিটির চাপে সেখানেই ভুল হলে পাল্টা আক্রমণের বদলে আবার রক্ষণ সামলাতে হবে।
ইউনাইটেডের এই সম্ভাবনার পক্ষে পরিসংখ্যানও আছে। প্রথম তিন ম্যাচে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে দুটি গোল করেছে তারা, এই সময়ে কোনো দলই এর বেশি করতে পারেনি। ফলে সিটি বেশি সময় বল রাখলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে থাকবে, এমন ধরে নেওয়া যায় না। ব্রুনো কতটা স্বাধীনভাবে বল পাবেন এবং কত দ্রুত আক্রমণভাগের সঙ্গে সংযোগ গড়বেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্য প্রান্তে হালান্ডের সঙ্গে হ্যারি ম্যাগুয়াইর ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের সম্ভাব্য দ্বৈরথেও নজর থাকবে। প্রিমিয়ার লিগে ইউনাইটেডের বিপক্ষে সাত ম্যাচে আট গোল নরওয়েজীয় স্ট্রাইকারের, তবে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে মাত্র দুটি। তাকে ঠেকাতে সেন্টারব্যাকদের সঙ্গে মাঝমাঠের দূরত্ব কম রাখা প্রয়োজন হতে পারে। একজন বলের দিকে এগোলে অন্যজনের পেছনের জায়গা ঢেকে রাখার কাজেও সামান্য ভুলের সুযোগ থাকবে।
ক্যারিকের নিজের আক্রমণভাগ নিয়েও সিদ্ধান্ত বাকি। চোট কাটিয়ে ফেরা বেনিয়ামিন শেশকো এভারটন ও সাবাহর বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে গোল করে শুরুর একাদশের দাবি জোরালো করেছেন। তাকে সামনে রেখে কুনিয়াকে বাঁ দিকে খেলানো যায়, আবার রাশফোর্ডকে ফিরিয়ে কুনিয়াকে মূল স্ট্রাইকার রেখেও নামতে পারে ইউনাইটেড। শেশকোর সাম্প্রতিক গোলগুলো তাই কোচের জন্য বাড়তি বিকল্প তৈরি করেছে।
দল নির্বাচনে চোটের প্রভাবও আছে। ইউনাইটেড পাচ্ছে না কার্লোস বালেবা, মাতাইস ডি লিট, মানুয়েল উগার্তে, আমাদ দিয়ালো ও টম হিটনকে। সাবাহর বিপক্ষে না খেলা লুক শকে ফেরানোর আশা থাকলেও তার ফিটনেসের চূড়ান্ত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। বাঁ প্রান্তে নিয়মিত ডিফেন্ডারকে পাওয়া সিটির আক্রমণ সামলানোর পরিকল্পনায় স্বস্তি দিতে পারে।
সিটির জন্য ভালো খবর, পিঠের সমস্যায় কভেন্ট্রি ও পোর্তোর বিপক্ষে খেলতে না পারা নিকো ও’রাইলি ফিরেছেন। মারেসকা তাঁকে পুরোপুরি প্রস্তুত বলেছেন। তবে কাফের চোটে জেরেমি দোকু এই ডার্বিতেও থাকছেন না।
বিশ্রাম ও প্রস্তুতির সময়েও কিছুটা এগিয়ে সিটি। মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগে পোর্তোকে ২–০ গোলে হারিয়েছে তারা, ইউনাইটেড বৃহস্পতিবার সাবাহকে হারিয়েছে ৪–০ গোলে। সিটির তুলনায় দুই দিন কম পাওয়া পরিস্থিতিকে ক্যারিক ‘আদর্শ নয়’ বললেও এটিকে অজুহাত করছেন না। ম্যাচের শেষ দিকে সতেজ খেলোয়াড় নামানোর সিদ্ধান্ত তাই শুরুর একাদশ বাছাইয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সম্ভাব্য একাদশ (৪–২–৩–১): সেনে লামেনস; দিওগো দালোত, হ্যারি ম্যাগুয়াইর, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, লুক শ; ইউরি তিলেমান্স, কোবি মাইনু; ব্রায়ান এমবেউমো, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, মাতেউস কুনিয়া; বেনিয়ামিন শেশকো।
ম্যানচেস্টার সিটির সম্ভাব্য একাদশ (৪–২–৩–১): জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা; মাতেউস নুনেস, মার্ক গেহি, রুবেন দিয়াস, ইয়োশকো গাভার্দিওল; এলিয়ট অ্যান্ডারসন, এনজো ফার্নান্দেজ; আন্তোয়ান সেমেনিও, রায়ান শেরকি, ইলিমান এনদিয়ায়ে; আর্লিং হালান্ড।


