Advertisement

মেসির বিশ্বজয়ের নেপথ্যে ছিল তার বাবার দীর্ঘ লড়াই

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
মেসির বিশ্বজয়ের নেপথ্যে ছিল তার বাবার দীর্ঘ লড়াই
মেসির বিশ্বসেরা হওয়ার পিছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল তার বাবা হোর্হে মেসি। ছবি: গেটি ইমেজ

লিওনেল মেসি তখন বিশ্বজয়ী ফুটবলার নন। রোজারিওর রাস্তায় বল নিয়ে ছুটে বেড়ানো ছোট্ট এক শিশু। তার প্রতিভার খবরও জানত না গোটা পৃথিবী। সেই সময় থেকেই পাশে ছিলেন বাবা হোর্হে মেসি। কখনো কোচ, কখনো অভিভাবক, পরে প্রতিনিধি ও পরামর্শক হয়ে ছেলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

Advertisement

শনিবার আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন হোর্হে। তার মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাবাকে নিয়ে মেসির বলা পুরোনো কথাগুলো। সেখানে উঠে এসেছে একজন শ্রমজীবী বাবার লড়াই এবং ছেলের স্বপ্ন পূরণে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সব সিদ্ধান্তের গল্প।

পেশাদার ফুটবলার হিসেবে মেসি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগে রোজারিওর একটি ধাতব কারখানায় কাজ করতেন হোর্হে। সংসার চালাতে তাকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করতে হতো। বাবার সেই পরিশ্রমের কথা স্মরণ করে এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, ‘বাবা ভোর ৪টায় কাজে যেতেন এবং রাত ৯টায় রাতের খাবারের সময় ফিরতেন।’

ব্যস্ততার কারণে বাবার সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটানোর সুযোগ পেতেন না মেসি। তবে বাড়ি ফেরার পর হোর্হে কখনো ছেলেকে বকাঝকা করতেন না। অল্প সময়টুকু আনন্দেই কাটানোর চেষ্টা করতেন দুজন।

মেসির ভাষায়, ‘বাবাকে খুব মিস করতাম। তিনি কখন ফিরবেন, কখন তাকে জড়িয়ে ধরব, সেই অপেক্ষায় থাকতাম।’

নিজের ক্যারিয়ারের সব বড় সিদ্ধান্তে বাবার সাহায্য নিতেন মেসি।
নিজের ক্যারিয়ারের সব বড় সিদ্ধান্তে বাবার সাহায্য নিতেন মেসি।

স্ত্রী সেলিয়া কুচ্চিত্তিনির সঙ্গে চার সন্তানকে বড় করেছেন হোর্হে। লিওনেল ছাড়াও তাদের সন্তান রদ্রিগো, মাতিয়াস ও মারিয়া সোল। সাধারণ সেই পরিবারটির জীবন তখনো সংবাদমাধ্যমের আলো থেকে অনেক দূরে। হোর্হে কাজ করতেন, আর ছোট্ট লিও গ্রান্দোলি ও পরে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

গ্রান্দোলিতে মেসির প্রথম কোচও ছিলেন তার বাবা। পুরোনো এক সাক্ষাৎকারে শৈশবের সেই সময়ের কথা স্মরণ করে মেসি বলেছিলেন, ‘বাবা আমাদের কোচ ছিলেন এবং আমরা সবকিছু জিততাম।’ ছেলের প্রতিভা বিকাশের একেবারে শুরুর পর্বেই তাই জড়িয়ে আছেন হোর্হে।

যে সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছিল মেসির জীবন

শৈশবে মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ার পর বড় পরীক্ষার সামনে পড়ে পরিবারটি। চিকিৎসা ছিল ব্যয়বহুল। হোর্হে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেখান থেকে প্রথম দুই বছর চিকিৎসার খরচ জোগাড়ে সহায়তা পেয়েছিলেন। পরে সেই সহায়তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

ছেলের চিকিৎসা ও ফুটবল ক্যারিয়ার বাঁচাতে তখন নতুন পথ খুঁজতে শুরু করেন হোর্হে। শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনা মেসিকে নেওয়ার আগ্রহ দেখালে ১৩ বছর বয়সী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে স্পেনে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

পরিচিত শহর, চাকরি ও স্বাভাবিক জীবন পেছনে রেখে হোর্হের সেই যাত্রাই বদলে দেয় ফুটবল ইতিহাস। বার্সেলোনা মেসির চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। এরপর বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে মূল দলে জায়গা করে নেন আর্জেন্টাইন তারকা। বাকিটা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মেসি ও তার বাবা।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মেসি ও তার বাবা।

মেসি যত বড় তারকা হয়েছেন, বাবার ভূমিকাও তত বদলেছে। পেশাদার এজেন্ট হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও হোর্হে শিখে নিয়েছিলেন চুক্তি, বাণিজ্যিক সমঝোতা ও দলবদলের জটিল বিষয়গুলো। ধীরে ধীরে তিনিই হয়ে ওঠেন ছেলের প্রধান প্রতিনিধি।

বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির একাধিক চুক্তি নবায়ন থেকে শুরু করে ২০২১ সালে তার কাতালান ক্লাব ছাড়ার আলোচনায় যুক্ত ছিলেন হোর্হে। পিএসজিতে যোগদান এবং দুই বছর পর ইন্টার মায়ামিতে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।

হোর্হেের লক্ষ্য ছিল, ছেলে যেন মাঠের খেলাতেই মনোযোগ দিতে পারেন। চুক্তি, পৃষ্ঠপোষকতা ও মাঠের বাইরের অন্য বিষয়গুলো সামলাতেন তিনি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা।

যে অনুমোদন সবসময় চাইতেন মেসি

তবে তাদের সম্পর্ক শুধু বাবা ও প্রতিনিধির ছিল না। ফুটবল নিয়ে মেসির সবচেয়ে বিশ্বস্ত আলোচনাসঙ্গীদের একজন ছিলেন হোর্হে। ম্যাচ শেষে বাবাকে বার্তা পাঠাতেন মেসি। জানতে চাইতেন, তার খেলা কেমন হয়েছে।

মেসি একবার বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সবসময় বাবার অনুমোদন চাইতাম। ম্যাচ শেষে তাকে জিজ্ঞাসা করতাম, আমাকে কেমন দেখেছে সে।’

সবসময়ই বাবার কাছে শুনতে চাইতেন কেমন খেলেছেন তিনি।
সবসময়ই বাবার কাছে শুনতে চাইতেন কেমন খেলেছেন তিনি।

হোর্হে ছিলেন ছেলের কঠোর সমালোচকও। মেসি দুর্দান্ত খেললেও কোথায় ভুল করেছেন, সেটি ধরিয়ে দিতেন। বাবার সেই সমালোচনাই তাকে আরও ভালো করার তাগিদ দিয়েছে বলে জানিয়েছিলেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা।

মায়ের কাছে মেসি সবসময় সেরা ছিলেন। খারাপ খেললেও ছেলের কোনো দোষ খুঁজে পেতেন না সেলিয়া। কিন্তু বাবার কাছ থেকে মিলত খেলার নির্মোহ বিশ্লেষণ। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার পরও সেই মতামতকে সমান গুরুত্ব দিতেন মেসি।

মেসি ও তার বাবা।
মেসি ও তার বাবা।

নিজের সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রেও মা-বাবাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। শৈশবে বাবার সঙ্গে যতটা সময় কাটাতে পারেননি, নিজের সন্তানদের সঙ্গে তার চেয়ে বেশি সময় থাকার সৌভাগ্য হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

হোর্হে তাই মেসির কাছে শুধু বাবা কিংবা প্রতিনিধি ছিলেন না। বিশ্বজোড়া খ্যাতি আসার আগে যিনি তার সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছিলেন, চিকিৎসার জন্য দেশ ছেড়েছিলেন এবং সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার পরও যাঁর অনুমোদন খুঁজতেন মেসি, সেই মানুষটিই ছিলেন হোর্হে মেসি।