logo

মেসি-রোনালদো বিতর্কেও কি রাজনীতির প্রভাব আছে?

মেসি-রোনালদো বিতর্কেও কি রাজনীতির প্রভাব আছে?
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

মেসি না রোনালদো, ফুটবলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের উত্তর সাধারণত খোঁজা হয় গোল, ট্রফি, ব্যালন ডি’অর, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা বিশ্বকাপের হিসাবে। কেউ বলেন, লিওনেল মেসির প্রতিভা স্বাভাবিক, শিল্পীর মতো। কেউ বলেন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শৃঙ্খলা, পরিশ্রম ও গোলের ক্ষুধাই তাকে আলাদা করে। তবে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা এই বিতর্কে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

গবেষণাটির দাবি, মানুষ মেসি না রোনালদো, কাকে বেশি পছন্দ করেন, তার সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক আছে। ২৬ দেশের ১০ হাজারের বেশি মানুষের ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, তুলনামূলক উদারপন্থী মনোভাবের উত্তরদাতারা মেসির দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। অন্যদিকে তুলনামূলক রক্ষণশীল মনোভাবের উত্তরদাতাদের মধ্যে রোনালদোর প্রতি পছন্দ বেশি দেখা গেছে।

গবেষণাটি করেছেন সাইফুদ্দিন আহমেদ, কোকিল জাইডকা, মুহাম্মদ এহাব রাসুল ও তেরেসা গিল-লোপেজ। এসএসআরএন-এ প্রকাশিত প্রিপ্রিন্ট গবেষণাটির শিরোনাম Political Identity Beyond Politics: The Messi-Ronaldo Preference Across 26 Countries। গবেষণায় ২৬ দেশের ১০,৬৬১ জন উত্তরদাতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের কাছে মেসি ও রোনালদো সম্পর্কে পছন্দ বা অনুকূলতার মাত্রা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণাটি মাঠের পারফরম্যান্স বা কে সেরা ফুটবলার, এই প্রশ্ন সরাসরি মাপেনি। বরং দুই খেলোয়াড়ের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে মানুষের পছন্দ বিশ্লেষণ করেছে। অর্থাৎ মেসি বা রোনালদোর ফুটবলীয় দক্ষতার বিচার নয়, তাদের নিয়ে মানুষের সামগ্রিক অনুভূতি, ভাবমূর্তি ও পছন্দের প্রবণতা ছিল গবেষণার কেন্দ্রে।

গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মেসি ও রোনালদো বিশ্বজুড়ে দুই ভিন্ন ধরনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। মেসিকে অনেকেই দেখেন শান্ত, সংযত, পরিবারকেন্দ্রিক ও দলমুখী প্রতিভা হিসেবে। রোনালদোর ভাবমূর্তি অনেকের চোখে আত্মবিশ্বাসী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পরিশ্রমী এবং নিজেকে সামনে তুলে ধরতে অভ্যস্ত এক সুপারস্টারের। এই দুই ধরনের ভাবমূর্তি মানুষের বৃহত্তর মূল্যবোধের সঙ্গে মিলে যেতে পারে বলেই গবেষকদের ধারণা।

তবে এই ফলকে সরলভাবে নেওয়া ঠিক হবে না। গবেষণার অর্থ এই নয় যে সব উদারপন্থি মেসিভক্ত বা সব রক্ষণশীল রোনালদোভক্ত। বরং একই দেশের মানুষের মধ্যে তুলনা করলে দেখা গেছে, যারা গড়ের তুলনায় বেশি উদারপন্থি, তাদের মেসির প্রতি ঝোঁক সামান্য বেশি। আর যারা গড়ের তুলনায় বেশি রক্ষণশীল, তাদের মধ্যে রোনালদোর প্রতি ঝোঁক কিছুটা বেশি।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই রাজনৈতিক বিভাজন তরুণ উত্তরদাতাদের মধ্যে বেশি স্পষ্ট। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রভাব কমে যায়। গবেষকদের ধারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যালগরিদম-নির্ভর কনটেন্ট এবং রাজনৈতিকভাবে বেশি বিভক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা তরুণদের সাংস্কৃতিক পছন্দেও রাজনৈতিক পরিচয়ের ছাপ বেশি পড়তে পারে।

আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো ছোট ভিডিও প্ল্যাটফর্মের প্রভাব। যারা টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস বা ইউটিউব শর্টসের মতো ছোট ভিডিও কনটেন্ট বেশি দেখেন, তাদের মধ্যে রোনালদোর প্রতি ঝোঁক কিছুটা বেশি দেখা গেছে। রোনালদোর বিশাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উপস্থিতি ও ব্র্যান্ড ইমেজ এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে।

দেশভেদেও পার্থক্য ছিল। কিছু দেশে মেসির প্রতি পছন্দ বেশি, কিছু দেশে রোনালদোর। দক্ষিণ কোরিয়ায় মেসির দিকে ঝোঁক সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, যার পেছনে রোনালদোর ২০১৯ সালের একটি প্রীতি ম্যাচে না খেলার ঘটনার প্রভাব থাকতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন। অন্যদিকে কিছু দেশে রোনালদোর জনপ্রিয়তা বেশি, যেখানে তরুণ জনগোষ্ঠী, ছোট ভিডিও প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার ও তার দীর্ঘদিনের ব্র্যান্ড উপস্থিতি ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। এটি এখনও পিয়ার-রিভিউড গবেষণা নয়। আবার জরিপটি এক নির্দিষ্ট সময়ের ছবি দিয়েছে; তাই এখান থেকে কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করা যায় না। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কেউ মেসি বা রোনালদোকে পছন্দ করেন, এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। বরং বলা যায়, পছন্দের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি ধারাবাহিক কিন্তু ছোট সম্পর্ক দেখা গেছে।

গবেষকদের মতে, মেসি-রোনালদো বিতর্ক আসলে শুধু ফুটবল বিতর্ক নয়, এটি মানুষের পরিচয়, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িত। একজন ভক্ত কাকে মহান মনে করেন, সেটি শুধু পরিসংখ্যানের হিসাব নয়। তার মধ্যে থাকতে পারে শৈশবের স্মৃতি, ক্লাব-ভক্তি, খেলার ধরন, ব্যক্তিত্বের প্রতি আকর্ষণ, এমনকি নিজের মূল্যবোধের প্রতিফলনও।