logo

কেন বারবার ছোট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলে আর্জেন্টিনা?

কেন বারবার ছোট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলে আর্জেন্টিনা?

বুয়েনোস আইরেসের আইকনিক লা বোম্বোনেরা। সাধারণত যেখানে বোকা জুনিয়র্স–রিভার প্লেট লড়াইয়ে গর্জে ওঠে গ্যালারি, সেখানে এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ—মৌরিতানিয়া ও জাম্বিয়া।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের জন্য এমন সূচি স্বাভাবিক নয়। তাই বিস্ময়টা শুধু আলবেসিলেস্তেরা সমর্থকদের নয়, ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের মধ্যেও। ফরাসি দৈনিক ল’একিপ সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—কেন আর্জেন্টিনা বারবার তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষে খেলছে?

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে আর্জেন্টিনা এখনও কোনো ইউরোপিয়ান দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলেনি। এমনকি ফিফা র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ ২০ দলের সঙ্গেও দেখা হয়নি তাদের। সামনে বিশ্বকাপ এই বাস্তবতায় বিষয়টি অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর। তবে আর্জেন্টিনার জন্য এটি পুরোনো প্যাটার্ন।

পুরোনো অভ্যাস, নতুন নয়

মৌরিতানিয়া (র‍্যাংকিং ১১৫) ও জাম্বিয়া (৯১)—এই দুই ম্যাচ আলাদা করে চোখে পড়লেও, এটি হঠাৎ তৈরি হওয়া প্রবণতা নয়।

গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচের তালিকা দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট। ভেনেজুয়েলা, পুয়ের্তো রিকো, অ্যাঙ্গোলা; এল সালভাদর, কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা; পানামা, কুরাসাও, ইন্দোনেশিয়া—প্রতিপক্ষের নামগুলো এক ধরনের প্যাটার্নই তুলে ধরে।

শেষ চার বছরে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচগুলোর প্রতিপক্ষের গড় র‍্যাংকিং প্রায় ৮৫—দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে যা সর্বনিম্ন। তুলনায় ব্রাজিলের প্রতিপক্ষের গড় র‍্যাংকিং প্রায় ২০।

সবচেয়ে লক্ষণীয়, এই সময়ের মধ্যে আর্জেন্টিনা একবারও ফিফা র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ ২০ দলের মুখোমুখি হয়নি।

তাহলে কেন এই পথ?

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি একাধিকবার বলেছেন, ইউরোপিয়ান দলের সঙ্গে ম্যাচ আয়োজন করা কঠিন—নেশনস লিগের কারণে তাদের সূচি ভরা থাকে।

কথাটা আংশিক সত্য। তবে পুরোটা নয়। একই সময়ে ব্রাজিল স্পেন ও ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে খেলেছে। জাপান, মরক্কো বা মেক্সিকোর মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষেও ম্যাচ আয়োজন অসম্ভব ছিল না।

প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়।

অর্থনীতির টান

কারণ একাধিক। তবে সবচেয়ে বড় কারণটা অর্থনৈতিক।

ল’একিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে আমন্ত্রণ জানাতে অনেক দেশই মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে রাজি। উদাহরণ হিসেবে অ্যাঙ্গোলা একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের জন্য প্রায় ৭ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় করেছে।

মরক্কোর সঙ্গে ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

শুধু ম্যাচ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজার সম্প্রসারণ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা নিজেদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনে বাণিজ্যিক চুক্তিও করেছে তাদের ফুটবল ফেডারেশন।

কৌশলগত দিকও আছে

সহজ প্রতিপক্ষ মানে জয়ের সম্ভাবনা বেশি। আর সেই জয় সরাসরি প্রভাব ফেলে ফিফা র‍্যাংকিংয়ে।

বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে বাছাইপর্বের বাইরে টানা ১১টি ম্যাচ জিতেছে আর্জেন্টিনা। এর ফলে র‍্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে তারা।

একই সঙ্গে এই ম্যাচগুলো স্কোয়াড গভীরতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করে। নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া, বিভিন্ন কম্বিনেশন পরীক্ষা—এসবের জন্য তুলনামূলক কম চাপের ম্যাচ বেছে নেওয়া হচ্ছে।

স্কালোনির ভাষায়, “অপরিচিত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেললেও শেখার সুযোগ থাকে।”

তবু অস্বস্তি রয়ে যায়

সমর্থকদের একটি বড় অংশ এই কৌশলে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় একই প্রশ্ন—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল কেন নিজেদের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে না?

কারণ শেষ পর্যন্ত আসল পরীক্ষা হবে বিশ্বকাপেই। সেখানে প্রতিপক্ষ হবে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার সেরা দলগুলো।

সহজ ম্যাচে জয় পাওয়া আর বড় মঞ্চে চাপ সামলানো—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।

এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার কৌশল কার্যকর—ফলাফল ভালো, র‍্যাংকিং শক্ত, স্কোয়াড প্রস্তুত।

তবু প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে—এই ‘সহজ পথ’ কি যথেষ্ট?

শেষ পর্যন্ত সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে এক জায়গাতেই—বিশ্বকাপের মঞ্চে।