বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চেও পড়তে পারে। ১০০ দিনেরও কম সময় বাকি থাকা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভিসা জটিলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আদৌ কি দল পাঠাতে পারবে ইরান।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। টুর্নামেন্ট শুরু হবে ১১ জুন এবং চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। ৪৮ দলের এই আসরে অংশ নেওয়ার কথা ইরানেরও, যারা এশিয়া অঞ্চল থেকে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত সেই পরিকল্পনাকেই বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান বিশ্বকাপে খেলুক বা না খেলুক—তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।
এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তোলে। কারণ, বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে হলে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতেই হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা নীতির কারণে সেই সুযোগ পাওয়া সহজ হবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজও পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক হামলার পর তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ নিয়ে আশাবাদী থাকা কঠিন।
যুদ্ধের প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনে
সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতে ইরানে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই সংঘাত ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়, কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমনকি ইরানের সমর্থকদের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে দলকে সমর্থন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, দেশটি মার্কিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কয়েকটি দেশের একটি।
‘অচেনা পরিস্থিতি’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ক্রীড়া ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক সাইমন চ্যাডউইকের মতে, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ইরান চাইলে নিজেই বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াতে পারে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ম্যাচ খেলতে হলে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, চিকিৎসকসহ পুরো দলকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি পেতে হবে—যা বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, যদি ইরান সত্যিই বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে সেটি শুধু ক্রীড়া নয়—রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবেও বড় প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বকাপ বয়কটের নজির বিরল
রাজনৈতিক কারণে বিশ্বকাপ থেকে কোনো দলের সরে দাঁড়ানোর ঘটনা খুবই বিরল। সর্বশেষ ১৯৫০ সালে আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করেছিল।
অলিম্পিক গেমসে রাজনৈতিক বয়কটের ইতিহাস থাকলেও ফুটবল বিশ্বকাপে এমন ঘটনা প্রায় দেখা যায় না। তাই ইরান যদি সরে দাঁড়ায়, তা হবে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
আর্থিক প্রভাবও বড়
বিশ্বকাপ শুধু ক্রীড়া আয়োজন নয়, এটি বিশাল অর্থনৈতিক আয়োজনও। টিভি সম্প্রচার, স্পনসরশিপ, বিজ্ঞাপন—সব মিলিয়ে এতে জড়িত থাকে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানো ইরানের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তৈরি হতে পারে নতুন জটিলতা।
ফিফার কূটনৈতিক ভূমিকা
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আয়োজক দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ফিফা কোনোভাবেই চাইবে না যে কোনো দল বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ুক বা অংশগ্রহণ না করুক। কারণ, এতে বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকট তৈরি হতে পারে।
‘স্পোর্টস কোল্ড ওয়ার’-এর আশঙ্কা
চ্যাডউইকের মতে, যদি রাজনৈতিক কারণে কোনো দেশকে বড় ক্রীড়া আসর থেকে দূরে রাখা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিকল্প ক্রীড়া প্রতিযোগিতা তৈরির প্রবণতা বাড়তে পারে।
এর উদাহরণ হিসেবে তিনি রাশিয়ার প্রস্তাবিত ‘পিস গেমস’-এর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে অনেক দেশকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তার মতে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নতুন ধরনের বিভাজন তৈরি করতে পারে—যা এক ধরনের “স্পোর্টস কোল্ড ওয়ার”-এর সূচনা ঘটাতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হতে তিন মাসেরও কম সময় বাকি থাকলেও ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও পরিষ্কার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, কূটনৈতিক সমাধানই হতে পারে একমাত্র পথ। কারণ বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজন থেকে কোনো দল বাদ পড়লে তার প্রভাব শুধু মাঠেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ক্রীড়া সম্পর্কেও পড়বে।
তাই শেষ পর্যন্ত ক্রীড়াকূটনীতিই হয়তো নির্ধারণ করবে—২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরান থাকবে কি না।