যুদ্ধ, রাজনীতি ও ফুটবল: কঠিন বাস্তবতায় ইরানের নারী দল

যুদ্ধ, রাজনীতি ও ফুটবল—তিনটি ভিন্ন জগত, কিন্তু ইরানের নারী ফুটবল দলের জন্য সেগুলো এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতায় এসে মিশেছে। অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপ খেলতে গিয়ে দলটির কয়েকজন খেলোয়াড় এমন এক সিদ্ধান্তের মুখে পড়েন, যা শুধু তাদের ক্রীড়াজীবন নয়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে। কেউ আশ্রয় নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন, আবার কেউ ফিরে যাচ্ছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে—যেখানে অপেক্ষা করছে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক চাপ এবং সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা।
দ্য অ্যাথলেটিকের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, টুর্নামেন্ট চলাকালে ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে ছিল কঠোর নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ। গোল্ড কোস্টের একটি হোটেলে অবস্থান করছিল দলটি। সেখান থেকেই হঠাৎ করে পাঁচজন খেলোয়াড়—ক্যাপ্টেন জাহরা ঘানবারি, ফাতেমেহ পাসানদিদেহ, জাহরা সারবালি, আতেফেহ রমাজানজাদেহ এবং মোনা হামৌদি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ তাদের একটি নিরাপদ সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়। পরে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনমন্ত্রী টনি বার্ক তাদের মানবিক ভিসা দেওয়ার ঘোষণা দেন, যাতে তারা অস্ট্রেলিয়ায় থেকে কাজ, পড়াশোনা ও বসবাস করতে পারেন।
পরবর্তীতে আরও একজন খেলোয়াড় ও এক নারী স্টাফ সদস্য আশ্রয়ের আবেদন করেন। যদিও পরে তাদের মধ্যে একজন মত বদলে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে শেষ পর্যন্ত মোট ছয়জন আশ্রয় চাওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া খেলোয়াড়দের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। একদিকে ছিল ইরানে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি—যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে ছিল ইরানি কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকৃতি জানানোয় দলটির খেলোয়াড়দের ওপর চাপ বাড়ে। পরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে তাদের সংগীত গাইতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তখন কিছু খেলোয়াড়কে ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ বলেও আখ্যা দেয়। এর ফলে দেশে ফেরার পর শাস্তির আশঙ্কা আরও বাড়ে।
খেলোয়াড়দের ওপর নজরদারির অভিযোগও উঠে এসেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দলের সঙ্গে এমন কিছু কর্মকর্তা ছিলেন যাদের ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। তারা খেলোয়াড়দের চলাফেরা ও যোগাযোগের ওপর নজর রাখছিলেন।
কিছু সূত্র জানিয়েছে, বিদেশ সফরে যাওয়ার আগে খেলোয়াড়দের পরিবারের পরিচয় ও অবস্থান সরকারের কাছে নথিভুক্ত করা হয়। এমনকি বড় অঙ্কের আর্থিক জামানতও রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, যাতে কেউ দল ছাড়তে না পারেন।
টুর্নামেন্ট চলাকালে খেলোয়াড়দের হোটেল থেকে বাইরে যেতে বা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে সীমাবদ্ধতা ছিল বলেও জানা গেছে। এমনকি হোটেলের সাধারণ জায়গা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত ইরানি প্রবাসীদের একাংশ খেলোয়াড়দের সমর্থনে প্রতিবাদও করেন। এক পর্যায়ে তারা দলের বাস থামানোর চেষ্টা করেন।
যারা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের সামনে এখন আরেকটি কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ থাকা এবং চলমান সংঘাতের কারণে তাদের যাত্রাপথও জটিল হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা প্রথমে মালয়েশিয়া হয়ে তুরস্ক যাবেন এবং সেখান থেকে স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার ঘটনা ইরানি ক্রীড়াঙ্গনে নতুন নয়। তবে নারী ফুটবল দলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই ঘটনাগুলো কেবল ক্রীড়াঙ্গনের খবর নয়; বরং তা তুলে ধরছে যুদ্ধ, রাজনীতি এবং মানবাধিকার প্রশ্নের জটিল বাস্তবতা—যেখানে একজন খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্ত কখনো কখনো মাঠের বাইরের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গেই জড়িয়ে যায়।
সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক