কেন পর্তুগাল শিবির ছেড়েছিলেন, সব জানালেন রোনালদো
-4fd642-720x405.webp)
দুবার কথা রাখেননি পর্তুগাল কোচ হোর্হে জেসুস, এমন অভিযোগ তুলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে কোচের ওপর আস্থা হারিয়ে পর্তুগাল শিবির ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকেও সঠিক বলছেন না তিনি। ঘটনার ছয় দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া দীর্ঘ বিবৃতিতে সমর্থক ও সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চেয়ে পর্তুগাল অধিনায়ক জানিয়েছেন, শাস্তি পেলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে এখনই সরে দাঁড়াচ্ছেন না তিনি।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতির মাঝপথে পর্তুগাল শিবির ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই রোনালদোকে ঘিরে বিতর্ক চলছিল। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, সময়মতো নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন। এবার মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেওয়া সেই বিবৃতিতে কোচের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, নিজের ক্ষোভ এবং জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন তিনি।
রোনালদোর দাবি, ২০২৬ বিশ্বকাপের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। এমনকি পর্তুগিজ সমর্থকদের উদ্দেশে বিদায়ী চিঠিও লিখে রেখেছিলেন।
তবে দেশে ফেরার পথে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েন্সা তাকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। একই সময়ে সম্ভাব্য নতুন কোচ হিসেবে জেসুসের ব্যাপারেও রোনালদোর মতামত চাওয়া হয়েছিল।
জেসুসকে সমর্থন করেছিলেন জানিয়ে রোনালদো লিখেছেন, ‘আমি ফেডারেশন সভাপতিকে বলেছিলাম, আমার মতে এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। তাই বর্তমান কোচকে নিয়োগ দেওয়ার দিন আমি সত্যিই খুশি হয়েছিলাম।’
রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে জেসুসের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় দলে তার ভূমিকা এবং শারীরিক চাপ সামলানোর পরিকল্পনাও ঠিক হয়েছিল। চলতি আন্তর্জাতিক বিরতির সব ম্যাচে তাকে খেলানো হবে না, এমন একটি সমঝোতা ছিল দুই পক্ষের মধ্যে।
তবে দলের অধিনায়ক হিসেবে সফরে না যাওয়ার প্রস্তাবে রাজি হননি রোনালদো। তার যুক্তি ছিল, মাঠে না নামলেও অধিনায়কের সতীর্থদের সঙ্গে থাকা উচিত। পরে জেসুসও সেই অবস্থান মেনে নিয়েছিলেন বলে দাবি তার।
বিতর্কের মূল সূত্রপাত নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে।
রোনালদোর দাবি, ম্যাচের দিন দুপুরে জেসুস জানতে চান তিনি প্রায় ৩০ মিনিট খেলতে পারবেন কি না। পূর্বপরিকল্পনায় ওই ম্যাচে তার খেলার কথা না থাকলেও তিনি সম্মতি দেন।
দ্বিতীয়ার্ধে টাচলাইনে গা গরমও করেন রোনালদো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠে নামানো হয়নি।
‘আমি মিনিটগুলো চলে যেতে দেখলাম, কিন্তু আমাকে আর ডাকা হলো না। কোচ আমার কাছে দেওয়া কথা রাখেননি,’ বলেছেন রোনালদো।
ম্যাচ শেষে পর্তুগালের সমর্থকদের অভিবাদন না জানিয়েই চলে গিয়েছিলেন তিনি। সেই আচরণ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল। এবার সেটিকে নিজের ভুল বলে স্বীকার করেছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী।
রোনালদো বলেছেন, ‘আমি সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে যাইনি। এটা আমার ভুল ছিল, যার দায় পুরোপুরি আমার। এটা হওয়া উচিত ছিল না।’
তবে রোনালদোর অভিযোগ, সমস্যা শুধু ওই ম্যাচেই শেষ হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে জেসুস ও আল নাসরের ক্রীড়া পরিচালক সিমাও কৌতিনিওর উপস্থিতিতে একটি বৈঠক হয়। সেখানে নরওয়ে ম্যাচে তাকে গা গরম করিয়েও মাঠে না নামানো ভুল ছিল বলে জেসুস স্বীকার করেন এবং পরদিন সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি পরিষ্কার করার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে জেসুসের বক্তব্য আগের দিনের ব্যক্তিগত আলোচনার সঙ্গে মেলেনি বলে অভিযোগ করেছেন রোনালদো।
‘সংবাদ সম্মেলনে তার আচরণের সঙ্গে আমাদের বৈঠকের কোনো মিল ছিল না। এমন কিছু কথা ও আগ্রাসী ভঙ্গি শুনেছি, যা আমার প্রাপ্য ছিল বলে মনে করি না,’ বলেছেন তিনি।
রোনালদোর দাবি, এখানেই দ্বিতীয়বার তার কাছে দেওয়া কথা রাখেননি জেসুস। এরপর কোচের ওপর আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তবে নিজের সেই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছেন পর্তুগাল অধিনায়ক।
‘আমার সতীর্থদের কাছেও ক্ষমা চাইতে হবে শিবির ছেড়ে যাওয়ার জন্য। কোচের কথার ওপর বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে গেলেও আমার চলে যাওয়া উচিত হয়নি। দায় পুরোপুরি আমার।’
নিজের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা মেনে নেবেন বলে জানিয়েছেন রোনালদো।
‘আমি সাধারণ কোনো খেলোয়াড় নই, আমি দলের অধিনায়ক। সেটি বরং আমার জন্য বাড়তি দায়। আমি ক্ষমা চেয়েছি, কিন্তু কাজের পরিণতিও থাকতে হয়।’
তবে এত কিছুর পরও জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছা নেই রোনালদোর।
সাম্প্রতিক বিতর্কের পর তাকে বিদায়ী ম্যাচ দেওয়ার প্রসঙ্গও উঠেছিল। কিন্তু রোনালদোর মতে, জাতীয় দল এখনো তার কাছে বিদায়ের মঞ্চ নয়, প্রতিযোগিতা এবং জয়ের জায়গা।
তিনি বলেছেন, ‘বিদায়ী একটি বা একাধিক ম্যাচ হবে, তার জন্য সময় আছে। কিন্তু জাতীয় দলের কথা ভাবলে আমার মাথায় আসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা।’
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও পরিষ্কার বার্তাও দিয়েছেন পর্তুগালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
‘আমি যদি শারীরিকভাবে ভালো থাকি, ক্লাবের হয়ে খেলি এবং আশা করি গোলও করি, তাহলে যে শাস্তিই দেওয়া হোক সেটি শেষ করার পর জাতীয় দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ও জিততে আমি আগের মতোই প্রস্তুত থাকব।’
রোনালদোর এই বিবৃতির আগে অবশ্য জেসুস ঘটনাটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পর তিনি জানান, রোনালদো চাইলে জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ থাকবে। ফেডারেশন সভাপতি প্রোয়েন্সাও তার জন্য দরজা খোলা থাকার কথা বলেছিলেন।
রোনালদোর নতুন অভিযোগের পর প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জেসুস বা পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
রোনালদোকে ছাড়াই ডেনমার্ককে ৪-২ এবং নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে নেশন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে পর্তুগাল। মাঠের ফলের বাইরে এখন তাই বড় প্রশ্ন, পরবর্তী আন্তর্জাতিক বিরতিতে জেসুসের দলে আবার দেখা যাবে কি না ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করা পর্তুগিজ অধিনায়ককে।


