অ্যাসিস্টের রেকর্ডের দুয়ারে ব্রুনো ফার্নান্দেস

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেসকে কখনোই খুব সহজে কোনো নির্দিষ্ট ছকে আটকে রাখা যায় না। তিনি শুধু সিস্টেমের অংশ নন, অনেক সময় নিজেই সিস্টেমকে নিজের মতো করে চালান। সেই সৃজনশীলতা, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা আর নেতৃত্বগুণ মিলিয়েই এবার প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে বড় এক রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পর্তুগিজ মিডফিল্ডার।
এক মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড এখন যৌথভাবে থিয়েরি অঁরি ও কেভিন ডি ব্রুইনার দখলে। দুজনই করেছিলেন ২০টি করে অ্যাসিস্ট। সেই রেকর্ড ছুঁতে ব্রুনোর দরকার আর মাত্র একটি অ্যাসিস্ট। হাতে আছে আরও চার ম্যাচ। রোববার (৩ মে) লিভারপুলের বিপক্ষেই তিনি সেই মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন।
ব্রুনোর বিশেষত্ব শুধু অ্যাসিস্টের সংখ্যায় নয়, সেগুলো তৈরির ধরনেও। কখনো সেট-পিস থেকে নিখুঁত ডেলিভারি, কখনো উইং থেকে কাটব্যাক, কখনো আবার ডিফেন্সের ফাঁক গলে আগাম থ্রু বল। তার পাসিং অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ, অনেক সময় বল হারানোর আশঙ্কাও থাকে। কিন্তু ঠিক সেই ঝুঁকিই তাকে আলাদা করে।
রক্ষণভাগ পুরোপুরি গুছিয়ে ওঠার আগেই তিনি বল ছাড়তে ভালোবাসেন। অর্ধেক জায়গাকে সুযোগে পরিণত করার ক্ষমতা তার আছে। সতীর্থের রান বুঝে দ্রুত পাস, ফেক বল, ছোট জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, এসবই ব্রুনোকে ইউনাইটেডের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অন্তর্বর্তী কোচ মাইকেল ক্যারিকও ব্রুনোর মৌসুমকে বড় করে দেখছেন। ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে ২-১ জয়ের পর তিনি বলেন, ব্রুনো লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। গোল করা, গোল বানানো এবং দলের ভেতরে প্রভাব রাখা, সব দিক থেকেই তার মৌসুম বড় বলে মনে করেন ক্যারিক।
কাসেমিরো একবার ব্রুনোকে ইউনাইটেডের ‘হৃদস্পন্দন’ বলেছিলেন। চলতি মৌসুমে সেই কথার মান যেন আরও বেড়েছে। ব্রুনো ক্লাসিক নম্বর টেন নন, যিনি শুধু আক্রমণের পেছনে ভাসবেন। বল ছাড়া অবস্থায়ও তিনি দৌড়ান, প্রেস করেন, প্রয়োজনে নিচে নেমে বিল্ডআপে অংশ নেন। ইউনাইটেড যখন পেছন থেকে বল এগিয়ে নিতে হিমশিম খায়, তখনও মাঝমাঠে নেমে পথ খোঁজেন তিনি।
নেতৃত্বের জায়গাতেও ব্রুনোর প্রভাব স্পষ্ট। অধিনায়ক হওয়ার পর তিনি দায়িত্বটা প্রকাশ্যভাবেই বহন করছেন। কখনো রেফারির সঙ্গে তর্ক করছেন, আবার পরমুহূর্তেই ফুলব্যাককে কভার করতে পেছনে ছুটছেন। তার খেলায় আবেগ আছে, তীব্রতা আছে, কখনো অস্থিরতাও আছে। কিন্তু সেটাই তাকে সবার থেকে আলাদা করে।
এই মৌসুমে ক্যারিকের অধীনে একটু বেশি স্বাধীনতা পেয়েছেন ব্রুনো। ওপরের দিকে খেলা এবং জায়গা বদলানোর সুযোগ পেয়ে ইউনাইটেডের আক্রমণকে আরও আনপ্রেডিক্টেবেল করে তুলেছেন তিনি। দল যখন পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, তখনও ব্যক্তিগত মুহূর্ত দিয়ে ম্যাচ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়ে চলেছেন ৩১ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার।
অরি ২০০২-০৩ মৌসুমে আর্সেনালের হয়ে ২০ অ্যাসিস্ট করেছিলেন। ডি ব্রুইনা ২০১৯-২০ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে একই কীর্তি গড়েন। দুজনই তা করেছিলেন শক্তিশালী, আক্রমণসমৃদ্ধ দলে। ব্রুনোর রেকর্ডের দৌড় কিছুটা আলাদা, কারণ ইউনাইটেড এখনো পুনর্গঠনের মধ্যে থাকা দল। রুবেন আমোরিমের অস্থির সময় পেরিয়ে দল এখনো স্থিরতা খুঁজছে।
তবু ব্রুনো থেমে নেই। চলতি মৌসুমে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার সিটির রায়ান চেরকির চেয়ে ৯ অ্যাসিস্ট এগিয়ে আছেন তিনি। ইউনাইটেডের হয়ে সাত মৌসুমে তার মোট অ্যাসিস্ট এখন ৭০।
এই মৌসুমে তিনি এরই মধ্যে ডেভিড বেকহামের ক্লাব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন। ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ইউনাইটেডের হয়ে ১৫ অ্যাসিস্ট করেছিলেন বেকহাম। ব্রুনো সেই রেকর্ড পেছনে ফেলে এখন তাকিয়ে আছেন প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ এক মৌসুমের অ্যাসিস্ট রেকর্ডের দিকে।
রায়ান গিগসের ১৬২ অ্যাসিস্টের সর্বকালের প্রিমিয়ার লিগ রেকর্ড এখনো অনেক দূরের পথ। কিন্তু এই মৌসুমে ব্রুনো যা করছেন, তা তাকে ইউনাইটেড ইতিহাসেআলাদা স্তরে তুলে দিচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা, সেই এক অ্যাসিস্ট কবে আসে।