Advertisement

রদ্রিকে হারিয়ে কেন বড় বিপদের সামনে রিয়াল

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
রদ্রিকে হারিয়ে কেন বড় বিপদের সামনে রিয়াল
রদ্রির এক সিদ্ধান্তে রিয়ালের দ্বিগুণ ক্ষতির শঙ্কা। গ্রাফিক্স: গোল.কম

দুই সপ্তাহ আগেও দলবদলের অঙ্কটি রিয়াল মাদ্রিদের জন্য বেশ সহজ বলেই মনে হচ্ছিল। মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া রদ্রি স্পেনে ফিরতে চান, বিশ্বকাপে র অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর নতুন করে আগ্রহ দেখিয়েছে রিয়াল, আর ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদও বাকি মাত্র এক বছর। সব মিলিয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা মাঝমাঠের খেলোয়াড়কে তুলনামূলক কম দামে পাওয়ার আদর্শ সুযোগই যেন তৈরি হয়েছিল।

Advertisement

রদ্রির জন্য সান্তিয়াগো বার্নাব্যুকেই তখন সবচেয়ে সম্ভাব্য গন্তব্য মনে হচ্ছিল। স্পেনের এই তারকাও আগে বলেছিলেন, বিশ্বের সেরা ক্লাবগুলোর একটি রিয়াল মাদ্রিদকে প্রত্যাখ্যান করা কঠিন। ফলে হোসে মরিনহোর দলের মাঝমাঠে তার জায়গাটিও অনেকটা কল্পনা করে ফেলেছিলেন সমর্থকেরা।

কিন্তু দলবদলের বাজারে দুই সপ্তাহই কখনো কখনো পুরো গল্প বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রিয়াল যখন ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে মূল্য নিয়ে সমঝোতা এবং রদ্রির সঙ্গে ব্যক্তিগত চুক্তি সম্পন্ন করতে পারছিল না, তখন সুযোগটি নেয় বার্সেলোনা। ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়ের গুরুতর চোটের পর দ্রুত একজন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রকের খোঁজে নামা কাতালান ক্লাবটি সরাসরি যোগাযোগ করে রদ্রির সঙ্গে। এরপরই বদলে যায় পরিস্থিতি।

রদ্রির এজেন্ট পাবলো বারকেরোর দাবি, রিয়ালের আগ্রহকে সম্মান জানালেও বার্সেলোনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার মক্কেল। দুই ক্লাবের মধ্যে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। বার্সেলোনার প্রথম প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। তারপরও রদ্রির ব্যক্তিগত পছন্দ সত্যিই চূড়ান্ত হয়ে থাকলে রিয়ালের স্বপ্নের একটি দলবদল তাদের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে।

রদ্রি শুধু একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নন

রিয়ালের মাঝমাঠে প্রতিভার অভাব নেই। অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি ও এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার মতো খেলোয়াড়েরা গতি, শারীরিক শক্তি এবং বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর। কিন্তু রদ্রির বিশেষত্ব শুধু প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি।
বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি।

রক্ষণভাগের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি। প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যেও বল ধরে রাখা, সঠিক সময়ে আক্রমণের দিক বদলানো এবং দলের দুই প্রান্তের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে তার তুলনা খুব কম। কখন খেলার গতি বাড়াতে হবে আর কখন বল নিজেদের দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে হতাশ করতে হবে, সেটিও রদ্রির চেয়ে ভালো বোঝেন এমন খেলোয়াড় এখন বিশ্ব ফুটবলে খুব বেশি নেই।

বড় ম্যাচে রিয়ালকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য ঠিক এমন একজন ফুটবলারই প্রয়োজন মরিনহোর। রদ্রি থাকলে তার সামনে থাকা আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়েরা আরও স্বাধীনভাবে খেলতে পারতেন। একই সঙ্গে রক্ষণভাগও পেত বাড়তি সুরক্ষা।

তাকে না পেলে বর্তমান খেলোয়াড়দের দিয়েই সেই ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করতে হবে রিয়ালকে। বিকল্প হিসেবে বাজারে গেলেও রদ্রির সমমানের পরীক্ষিত একজন খেলোয়াড় পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

রিয়ালের হার, বার্সেলোনার দ্বিগুণ লাভ

রদ্রি ম্যানচেস্টার সিটিতে থেকে গেলে কিংবা অন্য কোনো লিগে চলে গেলে রিয়ালের ক্ষতি শুধু তাকে না পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু সম্ভাব্য গন্তব্য বার্সেলোনা হওয়ায় এই দলবদলের প্রভাব অনেক বড়।

বার্সার জন্য রদ্রি ট্রান্সফার বয়ে আনবে বড় এক সমস্যার সমাধান।
বার্সার জন্য রদ্রি ট্রান্সফার বয়ে আনবে বড় এক সমস্যার সমাধান।

ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়ের হাঁটুর চোট বার্সেলোনার মাঝমাঠে বড় একটি শূন্যতা তৈরি করেছে। প্রায় চার মাসের জন্য বাইরে থাকা ডাচ ফুটবলারের অস্ত্রোপচারও লাগতে পারে। রদ্রি এলে সেই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান পেয়ে যাবেন হান্সি ফ্লিক।

বল দখলে রেখে খেলার যে কৌশল ফ্লিক অনুসরণ করেন, তার সঙ্গেও রদ্রির ধরন দারুণভাবে মানানসই। স্পেন জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন সতীর্থও রয়েছেন বার্সেলোনায়। ফলে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার কাজটিও তার জন্য তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

ডি ইয়ং সুস্থ হয়ে ফেরার পর রদ্রি, পেদ্রি, গাভি ও ডাচ তারকাকে নিয়ে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী মাঝমাঠ গড়ার সুযোগ পাবে বার্সেলোনা। দীর্ঘদিন ধরে সের্হিও বুসকেতসের যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজতে থাকা কাতালানদের সেই অপেক্ষাও শেষ করতে পারেন রদ্রি।

রিয়ালের বিপদ এখানেই। নিজেদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি পূরণের জন্য তারা যে খেলোয়াড়কে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই খেলোয়াড়ই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বল জায়গাটিকে শক্তিতে পরিণত করতে পারেন।

হাতছাড়া হতে পারে বিরল এক সুযোগ

ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে রদ্রির চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর। নতুন চুক্তিতে রাজি না হলে তাকে এবারই বিক্রি করতে হতে পারে ইংলিশ ক্লাবটিকে। এ কারণে প্রায় ৬ কোটি পাউন্ডে তাকে ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে।

রিয়াল কোচ মরিনহো চেয়েছিলেন রদ্রিকে দলে ভেড়াতে।
রিয়াল কোচ মরিনহো চেয়েছিলেন রদ্রিকে দলে ভেড়াতে।

বর্তমান দলবদলের বাজারে বিশ্বসেরা পর্যায়ের একজন মাঝমাঠের খেলোয়াড়ের জন্য অঙ্কটি খুব বেশি নয়। বিশেষ করে সেই ফুটবলার যখন সদ্য বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে ফিরেছেন।

রদ্রির বয়স ৩০ হলেও তার খেলাটি অতিরিক্ত গতিনির্ভর নয়। অবস্থান নির্বাচন, ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা এবং বল ব্যবহারের দক্ষতার কারণে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আরও কয়েক বছর প্রভাব বিস্তার করার সামর্থ্য তার রয়েছে। ফলে রিয়াল শুধু বর্তমানের জন্য নয়, অন্তত পরবর্তী দুই বা তিন মৌসুমের জন্য মাঝমাঠের একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান পেতে পারত।

এমন মানের খেলোয়াড়কে এমন অনুকূল পরিস্থিতিতে নেওয়ার সুযোগ খুব দ্রুত আবার আসবে, সেই নিশ্চয়তা নেই।

বদলে যেতে পারে লা লিগার শিরোপার হিসাব

বার্সেলোনা টানা তৃতীয় লিগ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে নতুন মৌসুমে নামবে। রিয়ালের সামনে তাই এমনিতেই কঠিন চ্যালেঞ্জ। রদ্রি বার্সেলোনায় গেলে দুই দলের শক্তির ব্যবধান কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

রদ্রি রিয়ালে যোগ দিলে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে শিরোপার লড়াইয়ে মরিনহের দলকে এগিয়ে দিতে পারতেন। এখন সেই একই ফুটবলার বার্সেলোনাকে আরও পরিণত, ভারসাম্যপূর্ণ ও কঠিন প্রতিপক্ষে পরিণত করতে পারেন।

লা লিগায় প্রায়ই অল্প কয়েকটি পয়েন্টে শিরোপা নির্ধারিত হয়। এল ক্লাসিকোর ফলও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে। এমন পরিস্থিতিতে রদ্রির মতো একজন খেলোয়াড়ের পক্ষ পরিবর্তন শুধু একটি দলের একাদশ নয়, পুরো প্রতিযোগিতার গতিপথ বদলে দিতে পারে।

মর্যাদার লড়াইয়েও বড় ধাক্কা

রিয়াল সাধারণত নিজেদের অগ্রাধিকার দেওয়া খেলোয়াড়কে সহজে হাতছাড়া করে না। সেই খেলোয়াড় যখন মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া, স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী তারকা এবং আগে রিয়ালে খেলার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন, তখন তাঁকে না পাওয়ার ব্যর্থতা আরও বেশি চোখে পড়বে।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে এই দলবদল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দাবি করা হচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে, ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে সমঝোতার কাছাকাছি গিয়েও শেষ মুহূর্তে মূল্য কমানোর চেষ্টা করেছিল রিয়াল। অন্য প্রতিবেদনের দাবি, অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়েই বার্সেলোনাকে বেছে নিয়েছেন রদ্রি। মরিনিও এই ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলেও খবর রয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি।

রদ্রিকে না পেলেই রিয়াল মাদ্রিদ ধসে পড়বে, বিষয়টি অবশ্য এমন নয়। দলটিতে এখনো ম্যাচ ও শিরোপা জেতানোর মতো অসংখ্য বিশ্বমানের ফুটবলার রয়েছেন। কিন্তু দলবদলের বাজারে কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষতি শুধু একটি মৌসুমে মাপা যায় না।

রদ্রির মতো বিরল একজন খেলোয়াড়কে তুলনামূলক কম দামে নেওয়ার সুযোগ হারানো, তাঁর উপযুক্ত বিকল্প না পাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকেই বার্সেলোনার জার্সিতে দেখতে হওয়া দীর্ঘ মেয়াদে বড় কৌশলগত ব্যর্থতা হয়ে উঠতে পারে।

রিয়ালের বিপদ তাই শুধু রদ্রিকে না পাওয়ায় নয়। আসল বিপদ, নিজেদের প্রয়োজনের নিখুঁত সমাধানটিকেই সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে তুলে দেওয়ার সম্ভাবনায়।