logo

মৃত্যু হুমকি, কূটনীতি আর ফুটবল: ইরানের সেই যুক্তরাষ্ট্র সফরের গল্প

মৃত্যু হুমকি, কূটনীতি আর ফুটবল: ইরানের সেই যুক্তরাষ্ট্র সফরের গল্প
ইরানের সেই সফরের কিছু দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর বিশ্বকাপ খেলতে যখন ইরান জাতীয় ফুটবল দল যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নামবে, সেটি হবে এক অদ্ভুত দৃশ্য। দুই মহাদেশের এই দুই ভিন্ন মতাদর্শের দেশ দুটির সম্পর্ক যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘ বৈরিতার ছায়ায় ঢাকা। মাঠে তারা ফুটবল খেলবে, কিন্তু মাঠের বাইরে থাকবে কূটনীতির ভারী বাতাস।

তবু এই দৃশ্য কিন্তু পুরোপুরি নতুন নয়। ২৬ বছর আগে, ২০০০ সালের জানুয়ারিতে, ইরান একবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল। সেই সফর ছিল তাদের জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র সফর। সেই সফরে ছিল মৃত্যুর হুমকি, আঙুলের ছাপ নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েন, এফবিআই নিরাপত্তা, প্রবাসী ইরানিদের চোখভরা আনন্দ, আর রোজ বোলে ৫০ হাজার দর্শকের সামনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ১-১ ড্র।

২৬ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই স্মৃতিই আবার ফিরে আসছে। কারণ ইরানের এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরও শুধুই ফুটবল নয়। এটি এমন এক গল্প, যেখানে বল গড়ানোর আগেই রাজনীতি, নিরাপত্তা আর মানুষের আবেগ একসঙ্গে মাঠে নেমে পড়েছে।

২০০০ সালের ৫ জানুয়ারি ইরান দল যখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে বিমানে ওঠে, তার আগে পেরোতে হয়েছিল দীর্ঘ আলোচনার পথ। ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক বহু বছর ধরে ছিন্ন, নিষেধাজ্ঞা ছিল, পারস্পরিক অবিশ্বাসও ছিল প্রবল। একদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নজরদারি, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থীদের আপত্তি; সব মিলিয়ে একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনই হয়ে উঠেছিল কূটনৈতিক পরীক্ষার মতো।

সফরের শেকড় ছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। ফ্রান্সে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বহুল আলোচিত ম্যাচের আগেই তৈরি হয়েছিল অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। ম্যাচের আগে প্রচলিত নিয়মে ইরানি খেলোয়াড়দের যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের দিকে এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করার কথা ছিল। কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশের কারণে সেটি জটিল হয়ে ওঠে। পরে সমাধান হয় ভিন্নভাবে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়রাই এগিয়ে যান ইরানিদের দিকে। দুই দল উপহার বিনিময় করে, একসঙ্গে ছবি তোলে। উত্তেজনার জায়গায় তৈরি হয় এক ধরনের মানবিক সেতুবন্ধ।

দুই দলের ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ম্যাচের আগে সৌজন্য বিনিময় করেন।
দুই দলের ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ম্যাচের আগে সৌজন্য বিনিময় করেন।

সেখান থেকেই দুই দেশের ফুটবল ফেডারেশনের মধ্যে সম্পর্ক এগোনোর আলোচনা শুরু হয়। ইরান-জন্ম নেওয়া ফুটবল কর্মকর্তা মেহরদাদ মাসউদি দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্র সকার ও ইরান ফুটবল ফেডারেশন পরের দেড় বছর ধরে আলোচনা চালায়। কিন্তু চুক্তি করা, সফরের অনুমতি পাওয়া, নিষেধাজ্ঞার জটিলতা সামলানো—সবকিছুই ছিল কঠিন। মাসউদির ভাষায়, এটি ছিল তার দেখা সবচেয়ে জটিল কাজগুলোর একটি।

সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিল আঙুলের ছাপ ও ছবি তোলার নিয়ম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী ইরানি নাগরিকদের সে সময় আঙুলের ছাপ ও ছবি দিতে হতো। ইরান ফুটবল ফেডারেশন শর্ত দেয়, এই প্রক্রিয়া থেকে ছাড় না পেলে তারা সফরে যাবে না। কারণ বহু ইরানির কাছে এই নিয়ম ছিল অপমানজনক, যেন তাদের অপরাধীর মতো দেখা হচ্ছে।

শেষ মুহূর্তে সেই ছাড় মেলে। যুক্তরাষ্ট্র সকারের কর্মকর্তা থম মেরেডিথ সরকারি ছাড়পত্রের কপি নিয়ে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে যান, সেখান থেকে ইরানি দলের পাসপোর্ট অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ করেন। তবু নাটক থামেনি। শিকাগোতে নামার পর অভিবাসন কর্মকর্তা আবার আঙুলের ছাপ চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরানি কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হন। পরে ছাড়পত্রের চিঠি দেখিয়ে সংকট সামাল দিতে হয়।

এরপর দল পৌঁছায় ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে অপেক্ষা করছিল এক ভিন্ন দৃশ্য। প্রবাসী ইরানিদের জন্য এই সফর ছিল বহু বছরের আবেগের বিস্ফোরণ। বিমানবন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে স্টেডিয়াম যেখানেই ইরান দল গেছে, সমর্থকেরা ভিড় করেছেন। অনেকেই আগে কখনো কাছ থেকে নিজেদের জাতীয় দলকে দেখেননি। আয়োজকদের একজন পল মেন্ডেস পরে সেই অভিজ্ঞতাকে তুলনা করেছিলেন রকস্টারদের অনুসরণ করা ভক্তদের সঙ্গে।

তবে সেই আবেগের আড়ালেও নিরাপত্তার ছায়া ছিল ঘন। সফরের নিরাপত্তা বৈঠকে স্থানীয় পুলিশ ছাড়াও এফবিআই প্রতিনিধির উপস্থিতি আয়োজকদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, এটি সাধারণ ফুটবল সফর নয়। পুলিশ এসকর্ট, রাস্তা বন্ধ, বিকল্প বাস, গোপন বের হওয়ার পথ সবকিছুই ছিল পরিকল্পনায়। ম্যাচের দিন পর্যন্ত নিরাপত্তা নিয়ে নানা সতর্কতা ছিল।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল মৃত্যু হুমকি। যুক্তরাষ্ট্র সকারের প্রতিনিধিরা ইরান ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি মোহসেন সাফায়ি ফারাহানিকে জানান, কেউ তাকে হত্যা বা দলের বিমান ভূপাতিত করার হুমকি দিয়েছে, যদি বাডওয়াইজারের (বিয়ার প্রতিষ্ঠান) বিজ্ঞাপনসহ ম্যাচটি এগোয়। অ্যালকোহল ইসলামে নিষিদ্ধ হওয়ায় এই বিজ্ঞাপন নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্র সকার বিজ্ঞাপন সরানোর প্রস্তাব দিলেও ফারাহানি শান্ত থাকেন এবং ম্যাচ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

মাঠের গল্প অবশ্য ছিল অন্যরকম। ২০০০ সালের ১৬ জানুয়ারি পাসাডেনার রোজ বোলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচ দেখতে জড়ো হয় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। গ্যালারিতে ছিল ঢাকঢোল, পতাকা, হাতে বানানো ব্যানার, ইরানি স্লোগান। বাইরে আমেরিকান টেলগেটিংয়ের দৃশ্য, আর বাতাসে কাবাবের গন্ধ। ক্যালিফোর্নিয়ায় খেলা হলেও অনেক ইরানি সমর্থকের কাছে সেটি হয়ে উঠেছিল ঘরের মাঠ।

সেই ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়
সেই ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়

ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই ইরানের মেহদি মাহদাভিকিয়া গোল করেন। গ্যালারির বড় অংশ তখন “ইরান! ইরান!” স্লোগানে কেঁপে ওঠে। পরে মাহদাভিকিয়া বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল যেন তেহরানেই খেলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস আরমাস পরে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ শেষ হয় ১-১ ড্রয়ে।

কিন্তু স্কোরলাইন সেদিন মূল গল্প ছিল না। ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়েরা জার্সি বদল করেন, আলিঙ্গন করেন। ফুল, পেন্যান্ট, ঐতিহ্যবাহী উপহার বিনিময় হয়। দুই দেশের রাজনৈতিক দূরত্ব কমেনি, কূটনৈতিক সম্পর্কও বদলায়নি। কিন্তু রোজ বোলের সেই সন্ধ্যা দেখিয়েছিল, ফুটবল কখনো কখনো রাষ্ট্রের ভাষা নয়, মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে।

ইরানিয়ান ফুটবলাররা ম্যাচ শেষে তাদের সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান।
ইরানিয়ান ফুটবলাররা ম্যাচ শেষে তাদের সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান।

২০২২ বিশ্বকাপেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মুখোমুখি হয়েছিল। সেখানেও ম্যাচ ঘিরে ছিল রাজনৈতিক উত্তাপ। তবে শেষ বাঁশির পর যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের ইরানি খেলোয়াড়দের সান্ত্বনা দিতে দেখা যায়। ২০০০ সালের রোজ বোলের মতোই সেই দৃশ্যও মনে করিয়ে দেয়, বৈরিতার মাঝেও খেলোয়াড়েরা অনেক সময় মানুষ হিসেবেই একে অন্যের পাশে দাঁড়ান।

২০২২ সালের বিশ্বকাপের দুই দলের মধ্যকার ম্যাচের দৃশ্য
২০২২ সালের বিশ্বকাপের দুই দলের মধ্যকার ম্যাচের দৃশ্য

এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের যুক্তরাষ্ট্র সফরও তাই শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট ভ্রমণ নয়। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, যুদ্ধের ছায়া ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এবারও থাকবে। তবু ২০০০ সালের সফরের স্মৃতি সামনে রাখলে বোঝা যায়, এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে।

সেটি হলো ফুটবলের পুরোনো, কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় সত্য: কখনো কখনো এক স্টেডিয়ামে ২২ জন খেলোয়াড়, একটি বল এবং হাজারো মানুষের কণ্ঠ এমন এক দৃশ্য তৈরি করে, যা কূটনীতির আনুষ্ঠানিক ভাষায় বলা যায় না।

*দ্য অ্যাথলেটিক থেকে অনূদিত