ইংল্যান্ডের শীর্ষ পাঁচ লিগের ৯৪ শতাংশ ক্লাব লোকসানে

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফুটবল লিগ ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ। সম্প্রচারস্বত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা ও দলবদলের বাজারে বিপুল অর্থের লেনদেন হয় দেশটির ফুটবলে। অথচ সেই ইংল্যান্ডেরই শীর্ষ পাঁচ স্তরের ৯৪ শতাংশ ক্লাব চলছে লোকসানে। আরও উদ্বেগের বিষয়, মালিকেরা অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দিলে প্রায় ২৯ শতাংশ ক্লাব এক মাসও টিকতে পারবে না।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ইংল্যান্ডের স্বাধীন ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার (আইএফআর) প্রকাশিত ‘স্টেট অব দ্য গেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র। দেশটির ক্লাব ফুটবলের আর্থিক পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক উল্লেখ করে জরুরি সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ইংল্যান্ডের শীর্ষ পাঁচ স্তরের ক্লাবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৯০০ কোটি পাউন্ড আয় করেছে। বিপরীতে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১৭০ কোটি পাউন্ড। বিপুল আয় সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্লাবের লোকসানে থাকার পেছনে খেলোয়াড়দের বেতন, দলবদলের খরচ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শুধু লোকসানই নয়, অনেক ক্লাবের আর্থিক ভিত্তিও নড়বড়ে। ইংলিশ ফুটবল লিগ (ইএফএল) ও ন্যাশনাল লিগের ৬০ শতাংশের বেশি ক্লাবের দায় তাদের সম্পদের হিসাবি মূল্যের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ হিসাবের হিসাবে এসব ক্লাব দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ক্লাবগুলো ইতিমধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করেছে বা আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া ঘোষিত হয়েছে।
মালিকদের আর্থিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালিকেরা অর্থায়ন বন্ধ করলে ২৯ শতাংশ ক্লাব ৩০ দিনের বেশি কার্যক্রম চালাতে পারবে না। আর ৬৬ শতাংশ ক্লাব টিকতে পারবে না ৯০ দিনের বেশি।
এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও নেই অনেক ক্লাবের। ইএফএল ও ন্যাশনাল লিগের অধিকাংশ ক্লাবেরই মালিকদের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের যথাযথ পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
ক্লাবগুলোর ব্যয় বৃদ্ধির চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২১-২২ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর গড় লোকসান ছিল দুই কোটি পাউন্ড। ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডে। একই সময়ে চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাবগুলোর গড় লোকসান এক কোটি ১০ লাখ থেকে বেড়ে দুই কোটি ২০ লাখ পাউন্ড হয়েছে।
শুধু খেলোয়াড়দের বেতন নয়, দলবদলের খরচও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। গত চার মৌসুমে ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলোর বার্ষিক দলবদলসংক্রান্ত হিসাবি ব্যয় ১৩০ কোটি থেকে বেড়ে ২৬০ কোটি পাউন্ড হয়েছে। একই সময়ে খেলোয়াড়দের এজেন্টদের পেছনে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৩ শতাংশ।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, ইএফএল ও ন্যাশনাল লিগের ১৭টি ক্লাবের খেলোয়াড়দের বেতন বাদ দিয়েও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় তাদের মোট আয়ের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ ফুটবলারদের কোনো বেতন দিতে না হলেও এসব ক্লাব লোকসান এড়াতে পারত না।
এই পরিস্থিতির জন্য প্রিমিয়ার লিগ ও নিচের স্তরের ক্লাবগুলোর মধ্যে আয়ের বড় ব্যবধানকেও দায়ী করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। শীর্ষ পাঁচ স্তরের সম্মিলিত আয়ের ৮০ শতাংশের বেশিই আসে প্রিমিয়ার লিগ থেকে। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগের একটি ক্লাব গড়ে চ্যাম্পিয়নশিপের একটি ক্লাবের তুলনায় আট গুণের বেশি আয় করে।
শীর্ষ লিগে ওঠার প্রতিযোগিতায় অনেক ক্লাব নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করছে। বিশেষ করে প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমিত ক্লাবগুলোর জন্য দেওয়া আর্থিক সহায়তাও চ্যাম্পিয়নশিপে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে বলে মনে করে আইএফআর।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংস্থাটির চেয়ারম্যান ডেভিড কোগান বলেন, ‘ইংলিশ ফুটবলের সাফল্যের কেন্দ্রে বড় একটি বৈপরীত্য রয়েছে। আমাদের কিছু ক্লাব বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও প্রতিযোগিতামূলক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে। অথচ অন্যরা আর্থিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।’
কোগানের মতে, আয়ের তুলনায় দ্রুত ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের বোঝা এবং মালিকদের অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা ইংলিশ ফুটবলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
তিনি বলেন, ‘উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্লাব আমাদের জানিয়েছে, মালিকেরা সরে গেলে তারা টিকে থাকতে পারবে না। এই ঝুঁকি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।’
পরিস্থিতি সামাল দিতে ছয় দফা পরিকল্পনা দিয়েছে স্বাধীন ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাবগুলোর লোকসান কমানো, আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি এবং বিভিন্ন স্তরের লিগের মধ্যে আয়ের বণ্টনব্যবস্থায় সংস্কার।
পাশাপাশি ক্লাব পরিচালনায় সমর্থকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহি ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, ক্লাবগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন অর্থায়নের পাশাপাশি কার্যকর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য সংস্কার প্রয়োজন। আয়ের বণ্টন নিয়ে ইংলিশ ফুটবল লিগের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। আট সপ্তাহের জনপরামর্শের পর ২০২৭ সালের শুরুতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে।
