logo

পৃথিবী বহু আগেই তৈরি করেছিল নিজস্ব পারমাণবিক রিয়্যাক্টর

পৃথিবী বহু আগেই তৈরি করেছিল নিজস্ব পারমাণবিক রিয়্যাক্টর

আমরা আজ যে পারমাণবিক রিয়্যাক্টরের কথা জানি, সেগুলো মানুষ তৈরি করেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য। কিন্তু অনেকেই জানেন না, পৃথিবী নিজেই এক সময় প্রাকৃতিকভাবে পারমাণবিক রিয়্যাক্টর তৈরি করেছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় ২০০ কোটি বছর আগে। তখন ডাইনোসরের অস্তিত্বও ছিল না, আর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছিল।

পরে মহাদেশের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে সেই এলাকা আজকের পশ্চিম আফ্রিকার অংশ হয়ে যায়। বর্তমানে গ্যাবনের ওকলো নামের একটি শহরের কাছে এই প্রাকৃতিক পারমাণবিক রিয়্যাক্টরের একমাত্র চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা এই স্থান নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, দীর্ঘ সময়েও পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মে কোনো পরিবর্তন হয়নি। একই সঙ্গে এখান থেকে পারমাণবিক বর্জ্য নিরাপদে সংরক্ষণের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেছে বলে জানাচ্ছে গবেষণা এবং অন্বেষণের জন্য শীর্ষস্থানীয় একটি ওয়েবসাইট।

১৯৭২ সালে প্রথম ধরা পড়ে অদ্ভুত এক সংকেত

১৯৭২ সালে প্রথম এই প্রাচীন রিয়্যাক্টরের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফ্রান্সের এক পারমাণবিক প্রযুক্তিবিদ গ্যাবনের ওকলো এলাকার একটি খনি থেকে আনা ইউরেনিয়াম আকরিক পরীক্ষা করার সময় খুব সামান্য অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন।

তিনি দেখেন, ওই আকরিকে ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপের পরিমাণ বিশ্বের অন্যান্য ইউরেনিয়াম আকরিকের তুলনায় সামান্য কম। এই পার্থক্য খুবই ছোট ছিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বোঝায় যে, ওই ইউরেনিয়ামের একটি অংশ আগে থেকেই কোনো পারমাণবিক বিক্রিয়ায় ব্যবহার হয়ে গেছে।

যেহেতু ওই আকরিকের বয়স প্রায় ২০০ কোটি বছর, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, সেখানে কোনো সময় প্রাকৃতিকভাবে পারমাণবিক রিয়্যাক্টর সক্রিয় ছিল।

কীভাবে তৈরি হয়েছিল প্রাকৃতিক পারমাণবিক রিয়্যাক্টর

বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, ওকলো এলাকায় ভূগর্ভে এক ডজনেরও বেশি প্রাকৃতিক রিয়্যাক্টর ছিল। তখন এগুলো মাটির অনেক গভীরে অবস্থান করত।

সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিকের স্তরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি ঢুকে পড়ত। এই পানি পারমাণবিক বিক্রিয়াকে সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এর ফলে ইউরেনিয়াম ভেঙে শক্তি উৎপন্ন করত এবং একটি চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হতো।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা আধুনিক প্রেসারাইজড ওয়াটার রিয়্যাক্টরের মতো কাজ করত।

চারটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে সম্ভব হয়েছিল এই ঘটনা

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক রসায়নবিদ অ্যালেক্স মেশিকের মতে, চারটি বিশেষ কারণ একসঙ্গে মিলে যাওয়ায় ওকলোতে প্রাকৃতিক রিয়্যাক্টর তৈরি হয়েছিল।

প্রথমত, সেখানে ইউরেনিয়াম আকরিকের পরিমাণ ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানি চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করতে সাহায্য করেছিল।
তৃতীয়ত, মাটির নিচের বিশেষ ভূ-রাসায়নিক পরিবেশ রিয়্যাক্টরকে অতিরিক্ত গরম হয়ে বিস্ফোরিত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল।
চতুর্থত, সেই সময়ের ভূতাত্ত্বিক অবস্থা এই প্রক্রিয়ার জন্য উপযুক্ত ছিল।

এই ঘটনাটি ঘটেছিল গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্টের পর, প্রায় ২৪০ কোটি বছর আগে। তখন অসংখ্য সায়ানোব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর প্রাচীন সমুদ্রে বৃদ্ধি পেয়ে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন ছড়িয়ে দেয়। এই অক্সিজেন পরে ইউরেনিয়ামকে পানিতে দ্রবণীয় আকরিক হিসেবে তৈরি করতে সাহায্য করে।

কীভাবে চলত সেই প্রাচীন রিয়্যাক্টর

ওকলো রিয়্যাক্টরগুলো ধারাবাহিকভাবে নয়, বরং বিরতি দিয়ে কাজ করত। ভূগর্ভস্থ পানি ইউরেনিয়াম স্তরে ঢুকলে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হতো। বিক্রিয়ার ফলে তাপ বাড়লে পানি ফুটে বাষ্প হয়ে যেত এবং বিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেত।

কিছু সময় পরে এলাকা ঠান্ডা হলে আবার পানি ঢুকত এবং পুনরায় বিক্রিয়া শুরু হতো।

বিজ্ঞানীরা প্রায় এক বর্গমাইল এলাকায় ১৬টি পর্যন্ত প্রাচীন রিয়্যাক্টরের চিহ্ন শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি একটি গাড়ির ইঞ্জিনের সমান শক্তি উৎপন্ন করত।

এই রিয়্যাক্টরগুলো প্রায় দুই লাখ বছর ধরে কখনও চালু, কখনও বন্ধ অবস্থায় কাজ করেছে।

প্রাচীন রিয়্যাক্টর থেকে বিজ্ঞানীদের শিক্ষা

গবেষকরা জানতে চেয়েছিলেন, আজ যে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটে, ২০০ কোটি বছর আগেও কি একই নিয়ম কার্যকর ছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, সেই নিয়মে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই সময় স্থলভাগে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী ছিল না। তবুও রিয়্যাক্টর থেকে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ মাটির নিচেই আটকে ছিল।

এই রিয়্যাক্টর থেকে সিজিয়াম, স্ট্রনটিয়াম এবং প্লুটোনিয়ামের মতো অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় উপাদান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আশপাশের পাথর ও মাটির স্তর সেই বিকিরণকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রায় ২০০ কোটি বছর ধরে একই জায়গায় আটকে ছিল।

ওকলো প্রাকৃতিক পারমাণবিক রিয়্যাক্টর পৃথিবীর ইতিহাসের এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক উদাহরণ। এটি দেখায় যে, প্রকৃতি কখনও কখনও মানুষের তৈরি প্রযুক্তির মতো জটিল প্রক্রিয়াও নিজে থেকেই তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে এই ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের পারমাণবিক শক্তি, পৃথিবীর প্রাচীন পরিবেশ এবং পারমাণবিক বর্জ্য নিরাপদে সংরক্ষণের উপায় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। ভবিষ্যতে নিরাপদ পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এই প্রাচীন রিয়্যাক্টর থেকে পাওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র : হিস্টোরি