ইরানে সাইবার যুদ্ধের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি রাখঢাক রাখছে না। সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে তারা কোন ধরনের অস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে তা জানাচ্ছে।
তবে সাইবার জগতে কী ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে সে বিষয়ে তারা অনেক বেশি সতর্ক এবং নীরব। দীর্ঘ সময়ের সংবাদ সম্মেলন, বক্তব্য এবং অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে সাইবার অভিযানের উল্লেখ খুবই কম। আর এমন তথ্যই দিচ্ছে বিবিসি’র এক প্রতিবেদন।
তবুও এই সংঘাতে সাইবার যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সমুদ্রের তলদেশ থেকে মহাকাশ এবং সাইবার স্পেস পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গা থেকে ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধে সাইবার অপারেশন এখন বড় ধরনের কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগেই শুরু হয় সাইবার অভিযান
অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি এবং হ্যাকিং কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়।
পেন্টাগনের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, কোনো হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পরিকল্পনা করতে হয়।
এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হ্যাকাররা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নেটওয়ার্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল নাকি ইরানের সিসিটিভি ও ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করে বড় ধরনের নজরদারি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল আগেই। এর মাধ্যমে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন চলাচলের ধরণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট সংযুক্ত ক্যামেরা সাইবার যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বর্তমানে। কারণ এগুলোর মাধ্যমে কম খরচে রাস্তাঘাট, স্থাপনা এবং মানুষের চলাচল সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যায়।
সামরিক অভিযানে সাইবার প্রযুক্তির সহায়তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার প্রযুক্তি সাধারণত এককভাবে যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে না। তবে এটি অন্য সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইসরায়েলের সাবেক সামরিক সাইবার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ তাল কলেন্ডার জানিয়েছেন, সাইবার অপারেশন তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্থলভাগে বা আকাশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে সহায়তা করে।
প্রথম দফা হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাইবার কমান্ড ও স্পেস কমান্ডের সদস্যরা শুরুতেই ইরানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নজরদারি সক্ষমতা দুর্বল করার কাজ করেছে। এর ফলে ইরানের পক্ষে পরিস্থিতি বোঝা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো কঠিন হয়ে পড়ে।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, মোবাইল ফোন টাওয়ার জ্যাম করা বা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কৌশলও ব্যবহার করা হতে পারে যাতে সম্ভাব্য হামলার আগে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে না পারে। যদিও এ ধরনের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
লক্ষ্য খোঁজার নতুন পদ্ধতি
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাইবার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামরিক লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করার কাজও চলতে পারে। এতে ওপেন সোর্স তথ্য, স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ এবং সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বড় পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্য শনাক্ত করতে এটি সহায়ক হতে পারে।
সাইবার যুদ্ধ নিয়ে গোপনীয়তা
ইরানের বিরুদ্ধে সাইবার হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে এসব অভিযানের বিষয়ে তারা সাধারণত খুব কম তথ্য প্রকাশ করে।
২০১০ সালে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় চালানো স্টাক্সনেট নামের বিখ্যাত সাইবার হামলার বিষয়েও এখনও খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার অপারেশনের কৌশল বা প্রযুক্তি প্রকাশ করলে প্রতিপক্ষ দ্রুত তা বন্ধ করার উপায় বের করে ফেলতে পারে। তাই অনেক সময় এসব বিষয় গোপন রাখা হয়।
তবে কিছু গবেষক মনে করেন, ভবিষ্যতে সাইবার যুদ্ধ নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কারণ এটি আধুনিক সামরিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
ইরানের সাইবার প্রতিক্রিয়া কোথায়
এই সংঘাতে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেটি হলো সাইবার ক্ষেত্রে ইরানের দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে কম।
এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মেডিকেল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্ট্রাইকারের ওপর সাইবার হামলার দাবি। একটি হ্যাকার গোষ্ঠী দাবি করেছে যে তারা কোম্পানির ডেটা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।
তবে ইরানকে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ সাইবার শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতীতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর ওপর ২০১২ সালের বড় সাইবার হামলার মতো ঘটনার সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান সরাসরি বা রাষ্ট্রসমর্থিত হ্যাকার গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রতিশোধমূলক সাইবার হামলা চালাতে পারে। অনেক সময় দেশপ্রেমিক হ্যাকারদের নামে পরিচালিত আক্রমণের পেছনেও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
সূত্র : বিবিসি