বিশ্বের সবচেয়ে বিরল চোখের রং

চোখকে অনেকেই মনের আয়না বলেন। মানুষের চেহারায় চোখের রং একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। পৃথিবীতে দুজন মানুষের চোখের রং একেবারে হুবহু এক নয়। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, বিশ্বের সবচেয়ে বিরল চোখের রং কোনটি এবং কীভাবে নির্ধারিত হয় এই রং।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু সৌন্দর্যের নয়, বরং জেনেটিক্স ও শরীরবিজ্ঞানের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সবচেয়ে বিরল চোখের রং
বিশ্বে সবচেয়ে বিরল চোখের রং হলো সবুজ। আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজির (AAO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ২ শতাংশ মানুষের চোখ সবুজ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে গড়ে মাত্র ২ জনের চোখ এই রঙের হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যে রং
বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বাদামি চোখ। একই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষের চোখের রং কোনো না কোনো ধরনের বাদামি। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে পৃথিবীর সব মানুষের চোখই ছিল বাদামি। পরে জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্যান্য রঙের উদ্ভব হয়।
তবে সব বাদামি চোখ একরকম নয়। কারও চোখ গাঢ়, কারও হালকা। প্রত্যেক মানুষের চোখের রং আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে।
অন্যান্য চোখের রং কতটা সাধারণ
নীল চোখ বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত। বিশেষ করে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষের মধ্যে নীল চোখ বেশি দেখা যায়। ধারণা করা হয়, নীল চোখের সব মানুষের পূর্বপুরুষ ছিলেন একজন, যার জিনগত পরিবর্তনের ফলে এই রঙের সূচনা হয়।
হ্যাজেল বা মিশ্র বাদামি-সবুজ রং তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এতে সোনালি বা হালকা বাদামি দাগ থাকতে পারে। বেগুনি চোখ খুবই বিরল বলে শোনা গেলেও, বাস্তবে তা নীল চোখেরই একটি ভিন্ন প্রতিফলন, যেখানে আলো ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়ে বেগুনি আভা তৈরি করে।
কীভাবে নির্ধারিত হয় চোখের রং
চোখের রং নির্ভর করে মেলানিন নামের একটি রঞ্জকের ওপর। এই মেলানিনই চুল, ত্বক ও চোখের রং তৈরি করে। চোখের রঙিন অংশকে আইরিস বলা হয়। আইরিসে যত বেশি মেলানিন থাকে, চোখ তত গাঢ় হয়। যেমন:
- বেশি মেলানিন থাকলে চোখ হয় বাদামি
- মাঝামাঝি পরিমাণ থাকলে সবুজ বা হ্যাজেল
- কম মেলানিন থাকলে নীল বা ধূসর
মেলানিন শুধু রংই নির্ধারণ করে না, এটি চোখকে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকেও সুরক্ষা দেয়। যাদের চোখে মেলানিন বেশি, তাদের সূর্যালোকজনিত ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে।
জেনেটিক্সের ভূমিকা
চোখের রং নির্ধারণে একাধিক জিন কাজ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ওসিএ২ (OCA2) এবং এইচইআরসি২ (HERC2) জিন। এই দুটি জিন একসঙ্গে কাজ করে আইরিসে মেলানিনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।
আগে ধারণা করা হতো, বাবা-মা দুজনের চোখ নীল হলে সন্তানের চোখও নীল হবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। একাধিক জিন একসঙ্গে কাজ করায় ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
ভৌগোলিক প্রভাব
ভৌগোলিক অবস্থানও চোখের রঙে প্রভাব ফেলে। আফ্রিকা ও এশিয়ায় বাদামি চোখ বেশি দেখা যায়। ইউরোপের উত্তরাঞ্চলে নীল চোখ বেশি, আর দক্ষিণ ইউরোপে বাদামি চোখের হার বেশি।
বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই অধিকাংশ মানুষের চোখ বাদামি, যা আমাদের জিনগত ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দুই চোখের রং ভিন্ন হতে পারে কি
হ্যাঁ, হতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় হেটেরোক্রোমিয়া। এতে একজন মানুষের দুই চোখের রং আলাদা হতে পারে, অথবা একই চোখে ভিন্ন ভিন্ন রঙের অংশ থাকতে পারে। এটি সাধারণত জেনেটিক কারণে হয়, তবে কখনও আঘাত বা স্নায়বিক সমস্যার কারণেও হতে পারে।
চোখের রং পরিবর্তন করা কি সম্ভব
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করে সাময়িকভাবে চোখের রং পরিবর্তন করা যায়। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া রঙিন লেন্স ব্যবহার করলে কর্নিয়ায় প্রদাহ, সংক্রমণ বা স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
কিছু অস্ত্রোপচার পদ্ধতির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে চোখের রং পরিবর্তনের দাবি করা হলেও, এসব পদ্ধতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং পুরোপুরি নিরাপদ হিসেবে প্রমাণিত নয়। তাই বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের ঝুঁকি না নেওয়ার পরামর্শ দেন।
চোখের রং শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক ইতিহাস ও শারীরিক সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত। বিশ্বের সবচেয়ে বিরল চোখের রং সবুজ হলেও, প্রতিটি চোখই অনন্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাদামি চোখই সবচেয়ে সাধারণ, যা আমাদের জিনগত ঐতিহ্যের অংশ।
সবশেষে বলা যায়, চোখের রং যাই হোক না কেন, চোখের সুস্থতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, রোদে সানগ্লাস ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় কসমেটিক ঝুঁকি এড়িয়ে চলাই হতে পারে চোখের সুরক্ষার সেরা উপায়।
সূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট


