logo

সেলফি দেখেই কি বোঝা যাবে ক্যানসার রোগী কত দিন বাঁচবেন, গবেষণা কী বলছে

সেলফি দেখেই কি বোঝা যাবে ক্যানসার রোগী কত দিন বাঁচবেন, গবেষণা কী বলছে
ছবি: ইউনিল্যাড টেক

একটি সেলফি শুধু স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যম না, ভবিষ্যতে এটি মানুষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতেও সাহায্য করতে পারবে। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মুখের একটি ছবি বিশ্লেষণ করে ক্যানসার রোগীর জৈবিক বয়স অনুমান করা এবং তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের গবেষকেরা এআইভিত্তিক একটি মডেল তৈরি করেছেন, যার নাম এফএএইচআর-ফেস (FAHR-Face)। এই প্রযুক্তি মুখের ছবিতে থাকা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসকদের আরও কিছু তথ্য দেওয়া, যাতে তারা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাড়তি সহায়তা পান। গবেষণাটির ফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ডিজিটাল হেলথ-এ।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, শুধু একটি সেলফি দেখেই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব কোনো ক্যানসার রোগী কত দিন বাঁচবেন। প্রযুক্তিটি এখনো গবেষণার পর্যায়ে আছে। এবং মনে রাখতে হবে, প্রচলিত চিকিৎসা পরীক্ষা, রোগের ধরন ও অবস্থা এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের বিকল্প হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যায় না।

কীভাবে সেলফি বিশ্লেষণ করে ক্যানসারের ঝুঁকি অনুমান করে এআই?

গবেষকদের তৈরি FAHR-Face মডেলটি ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করে। এটিকে ৪ কোটিরও বেশি প্রকাশ্যে পাওয়া মুখের ছবি দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই মডেলের মাধ্যমে দুটি আলাদা টুল তৈরি করা হয়েছে, যেগুলো মুখের ছবি থেকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করে।

টুল দুটি হলো-

FAHR-FaceAge: মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একজন মানুষের জৈবিক বয়স অনুমান করে। অর্থাৎ, তার মুখের চেহারা দেখে তাকে কতটা বয়স্ক মনে হচ্ছে, তা হিসাব করে।

FAHR-FaceSurvival: মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করে।

দুটি টুলই মুখের বিভিন্ন অংশের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে। যেমন কপাল, কপালের পাশের অংশ, চোখের নিচের এলাকা এবং নাকের দুই পাশের ভাঁজ। তবে মুখের ঠিক কোন জৈবিক পরিবর্তনের কারণে ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে, তা গবেষকেরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেননি।

এআই মূলত ছবির মধ্যে থাকা কিছু ধরন বা প্যাটার্ন শনাক্ত করে পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাস দেয়। এটি মুখের ছবি দেখে সরাসরি ক্যানসার শনাক্ত করে না বা রোগীর নির্দিষ্ট আয়ু বলে দিতে পারে না।

জৈবিক বয়স কী এবং ক্যানসারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

জন্মের পর থেকে যে বয়স বাড়ে, সেটি আমাদের কালানুক্রমিক বয়স। অন্যদিকে, শরীরের কার্যক্ষমতা ও বয়সজনিত পরিবর্তনের ভিত্তিতে যে বয়সের ধারণা পাওয়া যায়, তা আমাদের জৈবিক বয়স।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একই বয়সের দুজন মানুষের মধ্যে একজন শারীরিকভাবে বেশ কর্মক্ষম থাকতে পারেন, অন্যজনের ক্ষেত্রে বয়সজনিত দুর্বলতা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। তাদের কালানুক্রমিক বয়স একই হলেও শারীরিক অবস্থায় পার্থক্য থাকতে পারে।

ক্যানসারের চিকিৎসায় এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই বয়সের দুজন রোগীর চিকিৎসা সহ্য করার ক্ষমতা এক রকম নাও হতে পারে। রোগীর শারীরিক সক্ষমতা, অন্যান্য অসুস্থতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসককে অনেক সময় চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করতে হয়।

এআইয়ের মাধ্যমে মুখের ছবি থেকে জৈবিক বয়স অনুমান করা গেলে ভবিষ্যতে রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নে বাড়তি তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে মুখের চেহারা দিয়ে শরীরের সব ধরনের পরিবর্তন বোঝা সম্ভব না। তাই এ ধরনের অনুমানকে অন্যান্য চিকিৎসা পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

গবেষণায় কী আছে

গবেষণায় ক্যানসার রোগীদের মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে জৈবিক বয়সের অনুমানের সঙ্গে তাদের মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছে।

গবেষণার প্রতিবেদনে উঠে আসা উল্লেখযোগ্য ফলাফলগুলো হলো-

যেসব রোগীর মুখের ছবি থেকে অনুমান করা জৈবিক বয়স তাদের প্রকৃত বয়সের তুলনায় অন্তত পাঁচ বছর বেশি ছিল, তাদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক গোষ্ঠীর চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি দেখা গেছে।

যেসব রোগীর অনুমান করা জৈবিক বয়স প্রকৃত বয়সের তুলনায় অন্তত পাঁচ বছর কম ছিল, তাদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক গোষ্ঠীর চেয়ে ১৭ শতাংশ কম ছিল।

রোগীদের গড়ে প্রায় চার বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করে এই সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এ ফলাফল থেকে ধারণা পাওয়া যায়, মানুষের মুখের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এমন কিছু তথ্য থাকতে পারে, যা তাঁর শারীরিক অবস্থা এবং ক্যানসারের চিকিৎসার পরবর্তী ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মৃত্যুঝুঁকি ২১ শতাংশ বেশি হওয়ার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে ২১ শতাংশ। এটি গবেষণায় তুলনা করা বিভিন্ন রোগীগোষ্ঠীর ঝুঁকির পার্থক্য। কোনো নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে কী ঘটবে, তা শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।

ক্যানসারের চিকিৎসায় এআই কীভাবে সাহায্য করতে পারে?

ক্যানসারের চিকিৎসা নির্ধারণের সময় চিকিৎসককে রোগীর বয়সের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা, ক্যানসারের ধরন, রোগের পর্যায় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপির মতো চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী কতটা ভালোভাবে চিকিৎসা সহ্য করতে পারবেন, তা গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে মুখের ছবি বিশ্লেষণকারী এআই প্রযুক্তি চিকিৎসকদের এই মূল্যায়নে বাড়তি তথ্য দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো রোগীর শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত পরীক্ষা প্রয়োজন কি না, তা বুঝতে এটি সহায়ক হতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধা হলো, একটি সাধারণ ছবির মাধ্যমে দ্রুত কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে এর ব্যবহার কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আরও গবেষণা ও যাচাইয়ের ওপর।

চিকিৎসকরা কখনোই শুধু এআইয়ের দেওয়া পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না। রোগীর পরীক্ষার ফলাফল, ক্যানসারের পর্যায়, চিকিৎসার সম্ভাব্য উপকারিতা ও ঝুঁকি এবং রোগীর নিজের মতামতও বিবেচনা করতে হবে।

এই প্রযুক্তি কি এখনই ব্যবহার করা যাবে?

না, নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তিটিকে এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত বলা যাচ্ছে না। গবেষকেরা এর কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা আরও যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছেন।

বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের মানুষ, বয়স এবং ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন ও পর্যায়ের রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি একই রকম কার্যকর কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত এআই অন্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভুল বা পক্ষপাতপূর্ণ পূর্বাভাস দিতে পারে।

এ ছাড়া মুখের ছবি ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্যের অন্তর্ভুক্ত। তাই রোগীর সম্মতি, ছবির গোপনীয়তা এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় কথা, কোনো রোগীর মুখ দেখে তাঁকে চিকিৎসার অনুপযুক্ত মনে করা কিংবা এআইয়ের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

তাহলে কি একটি সেলফি বলে দিতে পারবে ক্যানসার রোগী কত দিন বাঁচবেন?

বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এআইয়ের তৈরি পূর্বাভাস একজন রোগীর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু তার নির্দিষ্ট আয়ু বা চিকিৎসার ফল নিশ্চিতভাবে জানাতে পারে না।

গবেষণাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআইয়ের নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে জৈবিক বয়স ও শারীরিক অবস্থার কিছু তথ্য পাওয়া গেলে ক্যানসার রোগীদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়তা মিলতে পারে।

তবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার আগে আরও গবেষণা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে এর বাস্তব উপকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন। আপাতত ক্যানসার রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ ‘New AI tool can predict cancer survival by a single patient selfie, study suggests’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।