logo

আমাদের হাসির পেছনের বিজ্ঞান

আমাদের হাসির পেছনের বিজ্ঞান

হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে সার্বজনীন অভিব্যক্তিগুলোর একটি। ভাষা বা সংস্কৃতির কোনো বাধা নেই এতে। পৃথিবীর যেকোনো মানুষ হাসি বুঝতে পারে। এমনকি শিশুদেরও হাসতে শেখাতে হয় না। 

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক এবং হাসি নিয়ে গবেষণার অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ সোফি স্কট বলেন, ‘শিশুরা আগে কখনো হাসি না দেখলেও বা না শুনলেও তারা স্বাভাবিকভাবেই হাসতে পারে।’

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কেন হাসি? শুধু মজার কথা, কৌতুক, ছবি বা সিনেমার জন্যই কি? বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি তার চেয়েও অনেক গভীর।

হাসি আসলে কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসি একটি অবাচনিক আবেগের প্রকাশ। আমরা সাধারণত আনন্দ প্রকাশ করতে হাসি। তবে এই আনন্দ একক নয়, বরং সামাজিক। অর্থাৎ অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দই হাসির মূল ভিত্তি।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ একা থাকার চেয়ে অন্যদের সঙ্গে থাকলে প্রায় ৩০ গুণ বেশি হাসে। বিজ্ঞান সাময়িকী ট্রেন্ডস ইন কগনেটিভ সাইন্সেস (Trends in Cognitive Sciences)-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

হাসি ইচ্ছাকৃত নয়। স্বতঃস্ফূর্ত হাসি হঠাৎ করেই বেরিয়ে আসে। 

হাসির সময় শরীরে কী ঘটে

হাসির সময় আমাদের মস্তিষ্ক থেকে অ্যান্ডোরফিন নামের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। এটি শরীরকে আরাম দেয় এবং ভালো অনুভূতি তৈরি করে। মুখের পেশি ও শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

অর্থাৎ আমরা জন্মগতভাবেই হাসার ক্ষমতা নিয়ে জন্মাই। অন্ধ বা বধির শিশুরাও হাসতে পারে। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুরকেও সুড়সুড়ি দিলে তারা শব্দ করে, যা অনেকটা হাসির মতো।

আমরা কেন হাসি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসির চারটি প্রধান কারণ রয়েছে।

সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতে

হাসি সামাজিক সম্পর্ককে মজবুত করে। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডায় আমরা বেশি হাসি। যারা একা থাকেন বা সামাজিক সম্পর্ক কম, তারা তুলনামূলকভাবে কম হাসেন।

আবেগ ঢাকতে

আমরা শুধু আনন্দে হাসি না। অনেক সময় ভয়, অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা বা রাগ ঢাকতেও হাসি। একে অনেকে নার্ভাস লাফটার বলেন। কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলানোর একটি উপায় হতে পারে এই হাসি।

শারীরিক প্রতিক্রিয়া

সুড়সুড়ি দিলে হাসি পাওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস, অ্যামিগডালা ও সেরিবেলামের মতো অংশ এতে সক্রিয় থাকে।

কৌতুক বা মজার কিছু পেলে

অবশ্যই হাসির একটি বড় কারণ হলো রসবোধ। মজার সিনেমা বা নাটক দেখার সময় আমরা হাসি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্ল্যাপস্টিক কমেডিতে কারও পড়ে যাওয়ার দৃশ্য অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হয়। বিজ্ঞান সাময়িকী নিউরোসাইকোলজিয়া (Neuropsychologia)-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, কারও বিস্মিত বা অদ্ভুত মুখভঙ্গি আমাদের হাসাতে পারে।

হাসি কি ছোঁয়াচে

হ্যাঁ, হাসি ছোঁয়াচে। যেমন হাই তোলা একজনের দেখে আরেকজন হাই তোলে, তেমনি একজনের হাসি অন্যজনকে হাসাতে পারে। এটি সামাজিক বন্ধনের অংশ। আমরা অবচেতনভাবেই অন্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে হাসি।

হাসতে হাসতে চোখে পানি কেন আসে

হাসি ও কান্না দুটিই অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন কেন হাসতে হাসতে কারও চোখে পানি আসে। ধারণা করা হয়, প্রবল আবেগের মুহূর্তে শরীর এক ধরনের অসহায়ত্ব অনুভব করে, আর তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অশ্রু ঝরে। তবে এটি এখনও প্রমাণিত নয়।

হাসির স্বাস্থ্য উপকারিতা

হাসি আমাদের শরীর ও মনের জন্য উপকারী। যদিও গবেষকেরা মনে করেন, এর অনেক উপকার সামাজিক সম্পর্কের কারণেও হতে পারে। তবু কয়েকটি উপকারিতা স্পষ্টভাবে পাওয়া গেছে।

মানসিক চাপ কমায়

হাসলে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন কমে যায়। একই সঙ্গে অ্যাড্রেনালিন ও অ্যান্ডোরফিন নিঃসৃত হয়। ফলে মন হালকা হয়, চাপ কমে।

ব্যথা সহনীয় করে

অ্যান্ডোরফিন নিঃসরণ শারীরিক ও মানসিক ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সম্পর্ক মজবুত করে

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর মনোবিজ্ঞানী রবার্ট লেভিসন (Robert Levinson) দম্পতিদের নিয়ে গবেষণায় দেখেছেন, যারা টানাপোড়েনের সময় হাস্যরস ব্যবহার করেন, তাদের সম্পর্কে সন্তুষ্টি বেশি।

ক্যালরি খরচ করে

ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাসলে প্রায় ৪০ ক্যালরি পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

স্মৃতিশক্তি বাড়ায়

লোমা লিন্ডা ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, হাস্যরসাত্মক ভিডিও দেখার পর প্রবীণদের স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি উন্নত হয়েছে।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক

২০১৬ সালে এপিডেমিওলজি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন, যারা নিয়মিত হাসেন না, তাদের হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

হাসি কি ওষুধের মতো কাজ করে

হাসির এত উপকারিতা দেখে অনেকেই বলেন, হাসিই সেরা ওষুধ। হাসি সামাজিক বন্ধন তৈরি করে, মন ভালো রাখে এবং শরীরকে সক্রিয় করে। শুধু হাসি নয়, হাসিমুখও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে প্রাণখোলা হাসির মতো গভীর প্রভাব তৈরি করতে পারে না।

ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মাঝে আমরা অনেক সময় হাসতে ভুলে যাই। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, হাসি শুধু আনন্দের প্রকাশ নয়, এটি আমাদের শরীর ও মনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানো, ইতিবাচক পরিবেশে থাকা এবং জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো উপভোগ করা আমাদের আরও বেশি হাসতে সাহায্য করতে পারে।

অতএব, সুযোগ পেলেই প্রাণ খুলে হাসুন। হয়তো এই ছোট অভ্যাসই আপনার সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের পথে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।