দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে একজোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এখন অনলাইন স্ক্যামারদের অভয়ারণ্য। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াকে তাদের স্বর্গরাজ্য বলা যায়। তারা এ অঞ্চলে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করে। তারা রোমান্স স্ক্যাম, বিনিয়োগের নামে প্রতারণা এবং স্ক্যাম কম্পাউন্ডে (প্রতারণা শিবির) জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষকে শোষণ করে। প্রথমবারের মতো এসব প্রতারক ও সাইবার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে টেক জায়ান্ট এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। মাইক্রোসফট, মেটা, কয়েনবেজ, স্টারলিংকের মতো বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং মার্কিন বিচার বিভাগ ও থাইল্যান্ডের রয়্যাল পুলিশ স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অভিযান পরিচালনা করছে। সম্প্রতি এসব অভিযানের বিভিন্ন তথ্য এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিকানা প্রতিষ্ঠান ‘মেটা’।
মেটা জানায়, শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপরাধী স্ক্যাম নেটওয়ার্কগুলো ধ্বংসের লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালানা করেছে। অনলাইন স্ক্যামারদের হাত থেকে মানুষকে রক্ষায় বিভিন্ন কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম কোনো অভিযান। যা অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে বাস্তব জগতের অপরাধীদের যুক্ত করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণেও সফল হয়েছে।
এই অভিযানে এর মধ্যে ১৪ লাখের বেশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপ নিষ্ক্রিয় করেছে মেটা। স্ক্যামারদের সঙ্গে যুক্ত ২০ হাজার অ্যাকাউন্ট স্থগিত করেছে মাইক্রোসফট। অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ৩০ লাখ ডলারের বেশি সমপরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পদ জব্দ করেছে ক্রিপ্টোমাইনিং প্রতিষ্ঠান কয়েনবেজ। স্ক্যামিংয়ের সঙ্গে জড়িত হাজারও ডিভাইসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে স্টারলিংক। স্ক্যাম সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত ৬৩ অভিযুক্তকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ফলে অনেক সম্ভাব্য নতুন স্ক্যাম সেন্টারের অবস্থান ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানিয়েছে মেটা।
গত ১৮ মে থেকে এ অভিযান চলছে উল্লেখ করে মেটা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনিন পিরোর নেতৃত্বে মার্কিন বিচার বিভাগের ‘স্ক্যাম সেন্টার স্ট্রাইক ফোর্স’ মেটা, মাইক্রোসফট, কয়েনবেজ, স্টারলিংক এবং অন্যান্য কোম্পানিকে এফবিআই, সিক্রেট সার্ভিস এবং যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ডের আইন প্রয়োগকারী অংশীদারদের সঙ্গে একত্রিত করে।
এ বিষয়ে মেটা জানায়, আমরা একসঙ্গে তথ্য বিনিময়, অংশীদারত্ব গভীর এবং অপরাধী চক্রগুলোকে শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করতে পদক্ষেপ জোরদার করেছি। সপ্তাহজুড়ে অংশীদাররা ওয়াশিংটন ডিসিতে একত্রিত হয়ে কার্যকর তথ্য বিনিময় করেছে। যা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোর সংযোগ মেলাতে সাহায্য করেছে। কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত অভিযান প্রতারণামূলক আক্রমণের প্রায় প্রতিটি স্তরে অপরাধী স্ক্যামারদের লক্ষ্যবস্তু ও ধ্বংস করতে সাহায্য করেছে। এই অপরাধী চক্রগুলো রোমান্স স্ক্যাম, বিনিয়োগের নামে প্রতারণা এবং স্ক্যাম কম্পাউন্ডে (প্রতারণা শিবির) জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষকে শোষণ করে। ফলে অনলাইন ব্যবহারকারীদের রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।’
মেটার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি জেনারেল কাউন্সিল ক্রিস সন্ডারবি বলেন, ‘মানুষকে স্ক্যাম থেকে রক্ষা করা আমাদের বড় দায়িত্ব। যৌথ অভিযানে দশ লাখের বেশি অ্যাকাউন্ট অপসারণ করা হয়েছে। ফ্রিজ করা হয়েছে সম্পদ। ৬০ জনেরও বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াই চালিয়ে যেতে শিল্প খাত, মার্কিন বিচার বিভাগ, এফবিআই, রয়্যাল থাই পুলিশ এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব করতে পেরে আমরা গর্বিত।’
মাইক্রোসফটের ডিজিটাল ক্রাইমস ইউনিটের গ্লোবাল হেড স্টিভেন মাসাডা বলেন, ‘প্রযুক্তি কোম্পানি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে কী হতে পারে, এই অভিযানই প্রমাণ করে। স্ক্যাম নেটওয়ার্কগুলো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এবং সীমান্তে কাজ করে। মাইক্রোসফট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যাতে অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো ধ্বংস করা যায় এবং এর পেছনে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।’
কয়েনবেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়া ব্রেস্যাক বলেন, ‘আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্লকচেইন প্রযুক্তি আমাদের কাছে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি। অপরাধীরা লুকিয়ে থাকতে পারে না। প্রতিটি লেনদেনই একটি চিহ্ন রেখে যায়। এই স্বচ্ছতাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কাজ করে অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোকে শনাক্ত, ফ্রিজ এবং ধ্বংস করতে সাহায্য করেছে।’
স্টারলিংক ও স্পেসএক্সের বিজনেস অপারেশন্স বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রায়ার বলেন, ‘স্টারলিংক অপব্যবহারের প্রতি শূন্য সহনশীলতা বজায় রেখে ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত টার্মিনালগুলো সক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করি। স্টারলিংক প্রতারণা এবং অপরাধমূলক শোষণকে নিষিদ্ধ করে।’
স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে থাইল্যান্ডের রয়্যাল পুলিশের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিরাভোপ ভুরিদেজ বলেন, ‘এই অভিযানের ফলাফল আন্তঃদেশীয় অনলাইন স্ক্যাম চক্রগুলোকে প্রতিরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করে। কোনো একক সংস্থা বা দেশের পক্ষে একা আন্তঃদেশীয় অনলাইন প্রতারণা সমাধান করা সম্ভব নয়। এই নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দিতে এবং জনগণকে রক্ষা করতে শক্তিশালী সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী তথ্য আদান-প্রদান অপরিহার্য।’
