logo

কিবোর্ডের স্পেসবার এত বড় কেন জানেন?

কিবোর্ডের স্পেসবার এত বড় কেন জানেন?
ছবি: টিভি ৯

কম্পিউটার বা ল্যাপটপে প্রতিদিন কাজ করতে গিয়ে কিবোর্ডের দিকে কতবার যে তাকাই, তার হিসাব নেই। অক্ষর, সংখ্যা, বিভিন্ন চিহ্ন, এন্টার, শিফট বা ব্যাকস্পেস, সব কিরই আলাদা আকার ও কাজ রয়েছে। কিন্তু কিবোর্ডের সবচেয়ে চওড়া বোতামটির দিকে কি কখনো খেয়াল করেছেন?

এটি হলো স্পেসবার। কিবোর্ডের নিচের সারিতে থাকা এই লম্বা বোতামটি অন্য প্রায় সব কির তুলনায় অনেক বড়। প্রশ্ন হলো, স্পেসবারকে এত বড় করে বানানোর প্রয়োজনই বা কী?

এর পেছনে শুধু আধুনিক কিবোর্ডের নকশা নয়, রয়েছে মানুষের টাইপ করার অভ্যাস এবং পুরনো টাইপরাইটারের ইতিহাসও।

স্পেসবার এত বেশি ব্যবহার হয় কেন?

টাইপ করার সময় প্রায় প্রতিটি শব্দের পরেই একটি করে ফাঁকা জায়গা দিতে হয়। ফলে সাধারণ লেখায় স্পেসবার অত্যন্ত ঘন ঘন চাপতে হয়।

একটি বাক্যে যত শব্দ, সাধারণত শব্দগুলোর মাঝখানে তার কাছাকাছি সংখ্যক ফাঁকা জায়গাও প্রয়োজন হয়। তাই কিবোর্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কিগুলোর একটি হলো স্পেসবার।

এ কারণে এটিকে এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, যাতে হাতের অবস্থান খুব বেশি পরিবর্তন না করেই সহজে চাপ দেওয়া যায়।

দুই হাতের বুড়ো আঙুলের জন্য তৈরি

কিবোর্ডে অক্ষর টাইপ করার সময় দুই হাতের আঙুল সাধারণত মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। এই অবস্থায় দুই হাতের বুড়ো আঙুল স্বাভাবিকভাবেই স্পেসবারের কাছাকাছি থাকে।

ফলে বাম বা ডান, যেকোনো হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সহজেই স্পেস দেওয়া যায়। স্পেসবার ছোট হলে নির্দিষ্ট একটি ছোট জায়গা লক্ষ্য করে চাপ দিতে হতো। এতে দ্রুত টাইপ করার সময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারত।

স্পেসবার চওড়া হওয়ায় বুড়ো আঙুল তার বড় অংশের যেকোনো জায়গায় পড়লেও সাধারণত কাজ হয়ে যায়।

স্পেসবার ছোট হলে কী সমস্যা হতো?

ধরুন, স্পেসবারও যদি অক্ষরের কির মতো ছোট হতো। তাহলে প্রতিবার স্পেস দেওয়ার জন্য বুড়ো আঙুলকে নির্দিষ্ট ছোট জায়গায় লক্ষ্য করে চাপ দিতে হতো।

দ্রুত টাইপ করার সময় এতে হাতের স্বাভাবিক গতি কিছুটা ব্যাহত হতে পারত। ভুল করে পাশের কিতে চাপ পড়ার সম্ভাবনাও বাড়ত।

বড় স্পেসবার তাই শুধু দেখতে বড় নয়। এটি টাইপ করার সময় হাতের স্বাভাবিক নড়াচড়া বজায় রাখতে সাহায্য করে।

চোখ কিবোর্ডে না রেখেও চাপ দেওয়া যায়

দ্রুত টাইপ করার সময় অনেকেই কিবোর্ডের দিকে না তাকিয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে লেখেন। একে স্পর্শভিত্তিক টাইপিং বলা যায়।

এ ক্ষেত্রে স্পেসবারের বড় আকার বেশ সুবিধাজনক। হাতের অবস্থান না বদলিয়েও বুড়ো আঙুল দিয়ে সহজে স্পেস দেওয়া যায়।

ফলে টাইপিংয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং প্রতিটি শব্দের পর স্পেস দেওয়ার জন্য কিবোর্ডের দিকে তাকাতে হয় না।

এই নকশার শুরু কম্পিউটার থেকে নয়

স্পেসবারের বড় আকারের ধারণা আধুনিক কম্পিউটার কিবোর্ডে হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর শিকড় রয়েছে পুরনো টাইপরাইটারে।

প্রথম দিকের টাইপরাইটারে শব্দের মধ্যে ফাঁকা জায়গা তৈরির জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যবস্থা আরও সহজ ও ব্যবহারবান্ধব আকার পেতে থাকে। পরবর্তীতে আধুনিক টাইপরাইটার ও কম্পিউটার কিবোর্ডের নকশায়ও চওড়া স্পেসবার জায়গা করে নেয়।

প্রাথমিক কিছু টাইপরাইটারে স্পেস দেওয়ার ব্যবস্থা আজকের স্পেসবারের মতো দেখতে ছিল না। পরে কিবোর্ডের নকশা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিচের দিকে চওড়া, মাঝখানে থাকা স্পেসবারের প্রচলন তৈরি হয়।

শুধু সুবিধার জন্য নয়, নকশারও বিষয়

কিবোর্ডের নিচের সারিতে অক্ষরের পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক কি থাকে। এসব কির অবস্থান ঠিক করার পর মাঝের বড় জায়গাটি স্পেসবারের জন্য ব্যবহার করা হয়।

অর্থাৎ এর আকার শুধু বেশি ব্যবহারের কারণে নির্ধারিত হয়নি। কিবোর্ডের সামগ্রিক নকশা, দুই হাতের অবস্থান এবং বুড়ো আঙুলের সহজ নাগাল, সবকিছু মিলিয়েই এর বর্তমান আকার তৈরি হয়েছে।

সব কিবোর্ডে কি স্পেসবার একই রকম?

না। কিবোর্ডের ধরন ও নকশা অনুযায়ী স্পেসবারের আকার কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। ছোট আকারের কিবোর্ড, বিশেষ ধরনের যান্ত্রিক কিবোর্ড বা বিভিন্ন বিকল্প নকশায় স্পেসবারের মাপ আলাদা হতে পারে।

তবে প্রচলিত পূর্ণ আকারের কিবোর্ডে নিচের সারির মাঝখানে একটি তুলনামূলক বড় স্পেসবার রাখার নকশাই সবচেয়ে পরিচিত।

শুধু কম্পিউটারে নয়, স্পেসবারের আরও কাজ আছে

স্পেসবারের প্রধান কাজ শব্দের মধ্যে ফাঁকা জায়গা তৈরি করা। তবে আধুনিক কম্পিউটার ব্যবহারে এর আরও কিছু কাজ রয়েছে।

অনেক ভিডিও বা গণমাধ্যম চালানোর সফটওয়্যারে স্পেসবার চাপলে ভিডিও চালু বা বন্ধ করা যায়। কিছু ওয়েব ব্রাউজারে এটি পেজ নিচে নামাতেও ব্যবহার করা যায়। আবার কম্পিউটার গেমে চরিত্রকে লাফ দেওয়ার জন্যও অনেক সময় স্পেসবার নির্ধারিত থাকে।

অর্থাৎ কিবোর্ডে একটি সাধারণ ফাঁকা জায়গা তৈরির বোতাম হিসেবে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এর ব্যবহার অনেক বেড়েছে।

তাহলে স্পেসবার এত বড় হওয়ার আসল কারণ কী?

সহজ করে বললে, এর পেছনে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করেছে।

প্রথমত, লেখার সময় স্পেসবার অত্যন্ত ঘন ঘন ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত, এটি বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপা হয় এবং দুই হাতের বুড়ো আঙুলই যেন সহজে এটি ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য মাঝখানে চওড়া জায়গা রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, দ্রুত টাইপ করার সময় বড় বোতাম লক্ষ্য করা সহজ এবং ভুলের সম্ভাবনা কম।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাইপরাইটারের দীর্ঘ ইতিহাস। পুরনো টাইপরাইটারের স্পেস দেওয়ার ব্যবস্থা থেকেই আধুনিক কিবোর্ডের এই নকশার ধারণা বিকশিত হয়েছে।

কিবোর্ডের স্পেসবার দেখতে খুব সাধারণ একটি বোতাম হলেও এর আকারের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ নকশাগত ইতিহাস। এটি বেশি ব্যবহৃত হয়, দুই হাতের বুড়ো আঙুলের সহজ নাগালে থাকে এবং দ্রুত ও নির্ভুলভাবে টাইপ করতে সুবিধা দেয়।

আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আজকের কম্পিউটার কিবোর্ডের এই চওড়া স্পেসবারের ধারণার শিকড় রয়েছে বহু পুরনো টাইপরাইটারে। অর্থাৎ প্রতিদিন যে বোতামটি আমরা অসংখ্যবার চাপি, তার নকশার পেছনে রয়েছে প্রযুক্তির দীর্ঘ বিবর্তনের গল্প।

সূত্র: টিভি ৯