Advertisement

প্রযুক্তি কি সত্যিই কমাচ্ছে কাজের চাপ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রযুক্তি কি সত্যিই কমাচ্ছে কাজের চাপ
ছবি : সংগৃহীত

প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে প্রায় সবাই চান এমন কিছু অতিরিক্ত সময়, যা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, নতুন ধারণা বা সৃজনশীল চিন্তার পেছনে ব্যয় করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, সেই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। গবেষণা বলছে, সঠিক প্রযুক্তি ও কিছু কার্যকর অভ্যাস একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে প্রতি সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় বাঁচানো সম্ভব।

বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসির গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান এআই প্রযুক্তি কর্মীদের সময়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দখল করে রাখা অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে মানুষের চাকরি হারিয়ে যাবে। বরং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হলে মানুষ বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দিতে পারবে।

এআইয়ের বাস্তব প্রভাবও এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এমআইটির যৌথ এক গবেষণায় দেখা যায়, একটি বড় গ্রাহকসেবা প্রতিষ্ঠানে এআই সহকারী ব্যবহারের ফলে কর্মক্ষমতা গড়ে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন নতুন বা কম অভিজ্ঞ কর্মীরা, কারণ তারা কাজের মধ্যেই দ্রুত শেখার সুযোগ পেয়েছেন।

এদিকে মাইক্রোসফটের ওয়ার্ক ট্রেন্ড ইনডেক্স রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের কপাইলট ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ মিনিট সময় সাশ্রয় করছেন। মিটিংয়ের সারাংশ তৈরি, ইমেইলের খসড়া লেখা বা তথ্য সংক্ষেপ করার মতো কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় এই সময় বাঁচছে। সরকারি খাতের কিছু পরীক্ষামূলক ব্যবহারে প্রতিদিন প্রায় ২৬ মিনিট পর্যন্ত সময় সাশ্রয়ের তথ্যও পাওয়া গেছে। বছরের হিসেবে এটি প্রায় দুই সপ্তাহের সমান সময়।

তবে সময় বাঁচানোর বিষয়টি শুধু এআই ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কাজের পথে থাকা অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানোও এক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘনঘন কাজের মধ্যে বাধা সৃষ্টি হলে বা বারবার মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেলে কর্মীরা বেশি চাপ অনুভব করেন এবং তাদের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন কমানো এবং একই ধরনের কাজ একসঙ্গে করার অভ্যাস এ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।

তাহলে দৈনন্দিন জীবনে এই গবেষণার ফল কীভাবে কাজে লাগানো যায়?

প্রথম ধাপ হলো সহজ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় করা। যেমন দীর্ঘ নোট থেকে করণীয় তালিকা তৈরি, বড় ইমেইল থ্রেডের সারসংক্ষেপ করা কিংবা প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করা। এসব কাজে এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এরপর মানুষ সেই খসড়া যাচাই ও পরিমার্জন করবে। এতে সময়ও বাঁচবে, আবার কাজের মানও বজায় থাকবে।

দ্বিতীয়ত, তথ্য ব্যবস্থাপনাকে সহজ করতে হবে। অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকে, ফলে বারবার জায়গা বদল করতে হয়। ক্যালেন্ডার, ডকুমেন্ট এবং কাজের ট্র্যাকারগুলো সমন্বিত থাকলে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পাওয়া যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।

তৃতীয়ত, গভীর মনোযোগের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা জরুরি। সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনটি সময় ব্লক নির্ধারণ করা যেতে পারে, যখন অপ্রয়োজনীয় বার্তা ও নোটিফিকেশন বন্ধ থাকবে। এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। গবেষণা বলছে, কম বাধা মানে কম মানসিক চাপ এবং আরও ভালো ফলাফল।

সবশেষে, যে সময় সাশ্রয় হবে তা কোথায় ব্যয় করা হবে, সেটিও আগে থেকেই ঠিক করে রাখা দরকার। কেউ সেই সময় নতুন পণ্য বা সেবার উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারেন, কেউ গ্রাহকদের চাহিদা বোঝার কাজে লাগাতে পারেন। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে নিয়মিত মধ্যাহ্নভোজ বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনার আয়োজন করে থাকে। এতে দলগত কাজ আরও শক্তিশালী হয়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও এআই ব্যবহারের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই সব জায়গায় সঙ্গে সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক সুফল দেখা নাও যেতে পারে। সাধারণত প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি কাজের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি লাভ পাওয়া যায়।

সব মিলিয়ে গবেষণা বলছে, সময় বাঁচানোর কার্যকর উপায় হলো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করা, বিচ্ছিন্ন তথ্যব্যবস্থাকে একত্রিত করা, মনোযোগ ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি করা এবং সাশ্রয় হওয়া সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো। প্রযুক্তি যদি সময় তৈরি করে দেয়, তবে সেই সময়কে মূল্যবান করে তোলার দায়িত্ব মানুষেরই।

সূত্র: বিবিআরওএস (BBROS)