অন্যের ভিডিও কপি করলেই হারাতে পারেন ফেসবুকের মনিটাইজেশন

ফেসবুকে একটি ভিডিও বা ছবি ভাইরাল হওয়ার পর একই কনটেন্ট একের পর এক পেজ ও প্রোফাইলে দেখা যায়। অনেক সময় মূল নির্মাতার নামও থাকে না। কেউ আবার অন্যের ভিডিও ডাউনলোড করে নিজের পেজে আপলোড করে সেটি থেকে ভিউ, অনুসারী ও বিজ্ঞাপনের আয় করার চেষ্টা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের কনটেন্ট পুনরায় প্রকাশ বা রিপোস্ট নতুন কিছু নয়।
তবে এমন কাজের বিরুদ্ধে এবার আরও কঠোর হচ্ছে ফেসবুকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটা। অন্যের ভিডিও, ছবি বা পোস্ট বারবার কপি করে প্রকাশ করা এবং তাতে উল্লেখযোগ্য নিজস্ব অবদান না থাকা অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে কনটেন্টের রিচ কমিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ফেসবুকের মনিটাইজেশন সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে।
কেন এই সিদ্ধান্ত মেটার
ফেসবুকে একই ভিডিও বা ছবি বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে বারবার প্রকাশিত হলে ব্যবহারকারীর ফিডে একই ধরনের কনটেন্টের পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে নতুন ও মৌলিক কনটেন্ট তৈরি করা নির্মাতাদের জন্য দর্শকের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
মেটার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে একই মিম বা ভিডিও বারবার সামনে আসে। কখনো কোনো অ্যাকাউন্ট নিজেকে মূল নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন করে, আবার কখনো বিভিন্ন স্প্যাম অ্যাকাউন্ট একই কনটেন্ট ছড়িয়ে দেয়। নতুন নীতির লক্ষ্য হলো এই ধরনের পুনরাবৃত্ত ও অমৌলিক কনটেন্টের বিস্তার কমানো এবং যারা নিজে কনটেন্ট তৈরি করেন তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
অন্যের ভিডিও কপি করলে কী হতে পারে
মেটার নতুন ব্যবস্থায় যারা নিয়মিত অন্যের ভিডিও, ছবি বা লেখা কপি করে প্রকাশ করবেন, তাদের কনটেন্টের বিতরণ বা রিচ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ পোস্টটি আগের মতো মানুষের ফিডে বা সুপারিশে পৌঁছাবে না।
শুধু রিচ কমানো নয়, বারবার এমন কাজ করা নির্মাতারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফেসবুকের মনিটাইজেশন প্রোগ্রাম থেকেও বাদ পড়তে পারেন। ফলে কনটেন্ট থেকে আয় করার সুযোগ হারাতে হবে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, যারা অন্যের ভাইরাল ভিডিও সংগ্রহ করে নিজেদের পেজে নিয়মিত আপলোড করেন এবং বিজ্ঞাপন বা অন্যান্য মনিটাইজেশন সুবিধার মাধ্যমে আয় করেন।
শুধু ভিডিও নয়, ছবি ও লেখাও নজরে
মেটার এই উদ্যোগ শুধু ভিডিও চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যের ছবি, ভিডিও বা টেক্সট পোস্ট নিয়ে তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো নিজস্ব অবদান না রেখে প্রকাশ করাও অমৌলিক কনটেন্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ অন্য কারও ফেসবুক পোস্ট কপি করে সামান্য পরিবর্তন করে নিজের পেজে প্রকাশ করলেই সেটিকে মৌলিক কনটেন্ট হিসেবে গণ্য করা হবে না।
মেটার ব্যবসায়িক নির্দেশনায়ও বলা হয়েছে, ভালো বিতরণ পেতে পেজ ও প্রোফাইলের এমন কনটেন্ট প্রকাশ করা উচিত যা তারা নিজেরাই তৈরি করেছে অথবা প্রথমবার প্রকাশ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
তাহলে অন্যের কনটেন্ট ব্যবহার করা যাবে না?
বিষয়টি এত সরল নয়। মেটা বলছে, অন্যের কনটেন্ট ব্যবহার করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্তিযোগ্য হবে না। কোনো নির্মাতা যদি সেই কনটেন্টে উল্লেখযোগ্য নিজস্ব মূল্য যোগ করেন, তাহলে সেটি আলাদা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যেমন কোনো ভিডিও নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ দেওয়া, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা যোগ করা, রিঅ্যাকশন ভিডিও তৈরি করা, অর্থবহ সম্পাদনা করা কিংবা নিজের ভয়েসওভার যুক্ত করা হলে সেটিতে নতুন সৃজনশীল অবদান থাকতে পারে।
তবে শুধু ভিডিওর শুরু বা শেষে কয়েক সেকেন্ডের অংশ যোগ করা, ছোটখাটো কাটছাঁট করা কিংবা অন্য একটি ওয়াটারমার্ক বসানোকে সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নিজস্ব অবদান হিসেবে ধরে নেওয়া হবে না।
ভাইরাল ভিডিও ডাউনলোড করে আপলোড করলেই ঝুঁকি
ফেসবুকে অনেক পেজের একটি প্রচলিত কৌশল হলো অন্য প্ল্যাটফর্ম বা অন্য নির্মাতার ভাইরাল ভিডিও ডাউনলোড করে ফেসবুকে নতুন করে আপলোড করা। মেটা এমন ধরনের কনটেন্ট শনাক্ত করার জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
ডুপ্লিকেট ভিডিও শনাক্ত হলে কপি করা ভিডিওর বিতরণ কমিয়ে মূল কনটেন্টের দিকে দর্শকের মনোযোগ ফেরানোর চেষ্টা করবে প্ল্যাটফর্মটি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মূল কনটেন্টের দিকে দর্শককে নিয়ে যাওয়ার জন্য লিংক দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও পরীক্ষার কথা জানিয়েছে মেটা।
অন্য অ্যাপের ওয়াটারমার্কও সমস্যা তৈরি করতে পারে
কোনো ভিডিও টিকটক, ইউটিউব বা অন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে নিয়ে শুধু ফেসবুকে আপলোড করলে সেটি মৌলিক কনটেন্ট হয়ে যায় না। বরং মেটা নির্মাতাদের দৃশ্যমান তৃতীয় পক্ষের ওয়াটারমার্ক এবং অন্য উৎস থেকে স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যবহৃত কনটেন্ট এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
তাই কোনো ভিডিওতে অন্য অ্যাপের ওয়াটারমার্ক থাকলে সেটি ফেসবুকে পোস্ট করার আগে নির্মাতার অধিকার এবং কনটেন্টের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ৫ লাখ অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
অমৌলিক ও স্প্যাম কনটেন্টের বিরুদ্ধে মেটার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে স্প্যাম বা ভুয়া এনগেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫ লাখ অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এসব ব্যবস্থার মধ্যে কমেন্টের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া, কনটেন্টের বিতরণ কমানো এবং মনিটাইজেশন বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ ছিল। একই সময়ে বড় কনটেন্ট নির্মাতাদের নকল করে তৈরি করা প্রায় ১ কোটি প্রোফাইলও সরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিল মেটা।
মূল নির্মাতাদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
একজন নির্মাতা একটি ভিডিও তৈরি করতে অনেক সময় ব্যয় করেন। ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা, গবেষণা, স্ক্রিপ্ট লেখা এবং প্রকাশের পর সেটি প্রচার করা সবকিছুর পেছনেই শ্রম থাকে। অথচ একই ভিডিও অন্য কেউ কপি করে দ্রুত বেশি ভিউ পেয়ে গেলে মূল নির্মাতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
মেটার নতুন নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো সেই পরিস্থিতি বদলানো। মূল কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কপি করা কনটেন্টের রিচ কমানোর মাধ্যমে নির্মাতাকে তার কাজের দর্শক ও স্বীকৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে প্ল্যাটফর্মটি।
কী করলে ফেসবুকে কনটেন্ট নিরাপদ থাকবে
ফেসবুকে নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশ করা নির্মাতাদের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের তৈরি কনটেন্ট প্রকাশ করুন: সম্ভব হলে ভিডিও, ছবি ও লেখা নিজেই তৈরি করুন।
অন্যের কনটেন্ট ব্যবহারে অধিকার নিশ্চিত করুন: কোনো ভিডিও বা ছবি ব্যবহার করার আগে সেটি ব্যবহারের অনুমতি বা প্রয়োজনীয় অধিকার রয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
শুধু কপি করে পোস্ট করবেন না: অন্যের কনটেন্ট ব্যবহার করলে তাতে যথেষ্ট নিজস্ব বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা সৃজনশীল মূল্য যোগ করুন।
অর্থবহ সম্পাদনা করুন: প্রয়োজন অনুযায়ী ভয়েসওভার, বিশ্লেষণ, মন্তব্য বা ব্যাখ্যা যোগ করা যেতে পারে।
অন্য প্ল্যাটফর্মের ওয়াটারমার্কযুক্ত ভিডিও এড়িয়ে চলুন: বিশেষ করে ভিডিওটি যদি স্পষ্টভাবে অন্য উৎস থেকে নেওয়া হয়ে থাকে।
ভুয়া এনগেজমেন্ট থেকে দূরে থাকুন: কৃত্রিমভাবে লাইক, কমেন্ট বা ভিউ বাড়ানোর চেষ্টা করলেও অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ইউটিউবের পর ফেসবুকেও কড়াকড়ি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অমৌলিক ও বারবার পুনর্ব্যবহৃত কনটেন্ট নিয়ে শুধু মেটাই উদ্বিগ্ন নয়। ইউটিউবও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে তৈরি করা এবং একই ধরনের পুনরাবৃত্ত ভিডিওর বিরুদ্ধে নীতিমালা আরও কঠোর করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতার কারণে একই ধরনের কনটেন্ট খুব দ্রুত তৈরি করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো এখন মৌলিক ও ব্যবহারকারীর জন্য মূল্য সংযোজন করে এমন কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দিকে যাচ্ছে।
ফেসবুকে কনটেন্ট থেকে আয় করতে চাইলে আরও সতর্ক হতে হবে
ফেসবুক থেকে আয় করার ক্ষেত্রে শুধু অনেক ভিউ বা অনুসারী থাকাই যথেষ্ট নয়। কনটেন্টের ধরন এবং সেটি কীভাবে তৈরি ও প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে যারা অন্যের ভিডিও বা ছবি সংগ্রহ করে নিয়মিত পোস্ট করেন, তাদের জন্য নতুন নিয়ম বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ একই ধরনের কনটেন্ট বারবার প্রকাশের কারণে শুধু একটি পোস্টের রিচ কমবে এমন নয়, নিয়ম ভাঙার ধারাবাহিকতা থাকলে পুরো অ্যাকাউন্টের মনিটাইজেশন সুবিধাও সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে।
তাই ফেসবুকে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে চাইলে ভাইরাল কনটেন্ট কপি করার বদলে নিজস্ব কনটেন্ট তৈরির দিকেই গুরুত্ব দেওয়া নিরাপদ। অন্যের কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে শুধু কপি করে পুনরায় প্রকাশ নয়, প্রয়োজনীয় অধিকার এবং যথেষ্ট নিজস্ব সৃজনশীল অবদান নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
মেটার এই পদক্ষেপের মূল বার্তাটি তাই পরিষ্কার। ফেসবুকে অন্যের তৈরি কনটেন্ট থেকে সহজে ভিউ ও আয় করার দিন আগের মতো সহজ নাও থাকতে পারে। যারা নিজেরা নতুন কিছু তৈরি করছেন, তাদের কনটেন্টকে সামনে আনতেই প্ল্যাটফর্মটি আরও জোর দিচ্ছে।
সূত্র : দ্য ভার্জ



