ব্যাটারির ক্যাপাসিটি বেশি হলেও চার্জ দ্রুত শেষ হয় কেন

সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ফোনে ১০০ শতাংশ চার্জ দিয়েই বের হলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই ব্যাটারির চার্জ নেমে এসেছে ৩০ বা ২০ শতাংশে। অথচ যে ফোনটি ব্যবহার করছেন, তার ব্যাটারির ৫০০০ কিংবা ৬০০০ এমএএইচ। তখন অনেকেরই মনে হয়, এত বড় ব্যাটারি থাকার পরও চার্জ এত দ্রুত শেষ হয় কেন!
এখানেই ব্যাটারি ক্যাপাসিটি আর ব্যাটারি লাইফের পার্থক্য। ফোনের ব্যাটারি কতটা শক্তি ধরে রাখতে পারে এবং সেই শক্তি ব্যবহার করে ফোন কতক্ষণ চলতে পারে- এ দুটি বিষয় এক নয়। এর সঙ্গে আবার ব্যাটারি হেলথ বা ব্যাটারির বর্তমান সক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত।
ব্যাটারি ক্যাপাসিটি কী
ব্যাটারি ক্যাপাসিটি মূলত একটি ব্যাটারি নতুন অবস্থায় সর্বোচ্চ কতটা চার্জ ধরে রাখতে পারে সেই ধারণ ক্ষমতা। স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত মিলিঅ্যাম্পিয়ার আওয়ার বা এমএএইচ দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
যেমন- কোনো ফোনে ৫০০০ এমএএইচ ব্যাটারি লেখা থাকলে সেটি ওই ব্যাটারির ধারণক্ষমতাকে বোঝায়। তবে শুধু এই সংখ্যা দেখেই ফোনটি কতক্ষণ চলবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
কারণ ফোন ব্যবহারের ধরন, স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা, প্রসেসর, নেটওয়ার্ক, তাপমাত্রা এবং বিভিন্ন অ্যাপের ব্যাটারি ব্যবহারের পরিমাণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সহজভাবে বললে, ব্যাটারি ক্যাপাসিটি হলো পানির ট্যাংকে কতটা পানি ধরবে তার মতো।
ব্যাটারি লাইফ কী
ব্যাটারি লাইফ বলতে একবার চার্জ দেওয়ার পর ডিভাইসটি কতক্ষণ ব্যবহার করা যায় তার হিসাব। অর্থাৎ ফোনটি ১০০ শতাংশ থেকে চার্জ শেষ হওয়া পর্যন্ত কতক্ষণ চলল, সেটিই তার ব্যাটারি লাইফের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ধরা যাক, দুটি ফোনেই ৫০০০ এমএএইচ ব্যাটারি রয়েছে। একটি ফোনে আপনি শুধু ফোন কল, বার্তা পাঠানো ও হালকা ব্রাউজিং করছেন। অন্যটিতে সারাদিন ভিডিও দেখছেন, গেম খেলছেন এবং বেশি উজ্জ্বলতায় স্ক্রিন ব্যবহার করছেন। দুটি ফোনের ব্যাটারি ক্যাপাসিটি একই হলেও দ্বিতীয় ফোনটির চার্জ দ্রুত শেষ হতে পারে।
কারণ ব্যবহার অনুযায়ী ব্যাটারি শক্তি খরচ বেশি হচ্ছে।
ব্যাটারি হেলথ কী
ব্যাটারি ক্যাপাসিটি আর ব্যাটারি লাইফের পাশাপাশি আরেকটি জরুরি বিষয় হলো ব্যাটারির হেলথ। মূলত নতুন অবস্থার তুলনায় বর্তমানে ব্যাটারি কতটা চার্জ ধরে রাখতে পারছে তাই হলো ব্যাটারির হেলথ।
সময় ও ব্যবহারের সঙ্গে পুনরায় চার্জ দেওয়ার প্রক্রিয়ার কারণে রিচার্জেবল ব্যাটারির সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। ফলে নতুন ফোনে যে ব্যাটারি দীর্ঘ সময় চলত, কয়েক বছর ব্যবহারের পর একইভাবে নাও চলতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে ধরুন, নতুন অবস্থায় একটি ফোনের ব্যাটারি ৫০০০ এমএএইচ। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর এর কার্যকর ধারণক্ষমতা কমে গেলে সেটি আর নতুন অবস্থার মতো চার্জ ধরে রাখতে পারবে না।
অর্থাৎ, ফোনে ৫০০০ এমএএইচ লেখা থাকলেও পুরোনো ব্যাটারির বাস্তব সক্ষমতা সেই পর্যায়ে নাও থাকতে পারে।
বেশি এমএএইচ মানেই কি বেশি ব্যাটারি ব্যাকআপ
না। সব সময় না।
বেশি এমএএইচ সাধারণত বেশি শক্তি ধারণের সম্ভাবনাকেই বোঝায়। কিন্তু ফোনের মোট শক্তি খরচও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। বড় ও বেশি উজ্জ্বল স্ক্রিন, শক্তিশালী প্রসেসর, মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বল সংকেত, বেশি গেম খেলা বা ভিডিও দেখা এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপ দ্রুত চার্জ কমিয়ে দিতে পারে।
তাই নতুন ফোন কেনার সময় শুধু এমএএইচ দেখলেই হয় না। ফোনটি বাস্তবে কী ধরনের ব্যাটারি ব্যাকআপ দেয়, সেটি দেখাও উচিত।
১০ হাজার এমএএইচ পাওয়ার ব্যাংক কি ৫০০০ এমএএইচ ফোনকে দুইবার চার্জ করবে
সাধারণ হিসাবে বিষয়টি এমনই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ১০ হাজার এমএএইচ পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে ৫০০০ এমএএইচ ফোনকে ঠিক দুইবার শূন্য থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করা যাবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কারণ পাওয়ার ব্যাংক থেকে ফোনে শক্তি স্থানান্তরের সময় কিছু শক্তি বিভিন্ন কারণে ক্ষয় হয়। চার্জিংয়ের ধরন, তাপমাত্রা, রূপান্তর প্রক্রিয়া এবং ফোনের চার্জিং ব্যবস্থা অনুযায়ী কার্যকর শক্তির পরিমাণও বদলাতে পারে।
তাই পাওয়ার ব্যাংকের গায়ে লেখা ক্ষমতা আর ফোনে বাস্তবে পৌঁছানো শক্তি এক জিনিস নয়।
ফোনের চার্জ দ্রুত শেষ হওয়ার ৫ কারণ
বেশি সময় পর্দা চালু রাখা: পর্দা ফোনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ব্যবহারকারী অংশ। দীর্ঘ সময় ভিডিও দেখা, গেম খেলা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে দ্রুত চার্জ কমতে পারে।
পর্দার উজ্জ্বলতা কমিয়ে রাখা এবং প্রয়োজন না থাকলে দ্রুত পর্দা বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা চালু করলে একবারের চার্জে বেশি সময় পাওয়া যেতে পারে।
ব্যাকগ্রাউন্ডে বেশি অ্যাপ চলা: কিছু অ্যাপ পর্দায় দেখা না গেলেও ব্যাকগ্রাউন্ডে বিভিন্ন কাজ করতে পারে। ফলে অতিরিক্ত শক্তি খরচ হতে পারে।
ফোনের ব্যাটারি ব্যবহারের তালিকা দেখে কোন অ্যাপ বেশি শক্তি খরচ করছে, তা শনাক্ত করা যেতে পারে। প্রয়োজন না থাকলে অতিরিক্ত ব্যাটারি ব্যবহার করা অ্যাপ সীমিত করার সুযোগ অনেক ফোনেই থাকে।
ফোন অতিরিক্ত গরম হওয়া: তাপমাত্রা ব্যাটারির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত গরম অবস্থায় ব্যাটারি দ্রুত চার্জ হারাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারির সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই রোদে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করা বা অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ফোন রাখা এড়িয়ে চলা ভালো।
দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক: যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, সেখানে ফোনকে সংযোগ ধরে রাখতে বেশি কাজ করতে হতে পারে। এর ফলে ব্যাটারি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়তে পারে।
প্রয়োজন না থাকলে দুর্বল নেটওয়ার্ক এলাকায় ওয়াই-ফাই ব্যবহার করা বা ব্যাটারি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
পুরোনো বা দুর্বল ব্যাটারি: ফোন যত পুরোনো হয়, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা তত কমতে পারে। ফলে আগে যেখানে একবার চার্জে সারাদিন চলত, পরে সেখানে কয়েক ঘণ্টা পরই চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যাটারি ভালো রাখতে কী করবেন?
- ফোনের ব্যাটারি দীর্ঘদিন ভালো রাখতে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা যেতে পারে।
- ফোন অতিরিক্ত গরম হতে দেবেন না। উচ্চ তাপমাত্রা ব্যাটারির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
- পর্দার উজ্জ্বলতা প্রয়োজন অনুযায়ী রাখুন। অপ্রয়োজনে সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতায় পর্দা চালিয়ে রাখার দরকার নেই।
- ব্যাটারি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা ব্যবহার করুন। ফোনে থাকা ব্যাটারি সেভার বা অনুরূপ ব্যবস্থা প্রয়োজনের সময় চালু করতে পারেন।
- অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের ব্যাটারি ব্যবহার সীমিত করুন। কোন অ্যাপ বেশি চার্জ খরচ করছে, তা ফোনের ব্যাটারি সেটিংস থেকে দেখে নিতে পারেন।
- উপযুক্ত চার্জার ব্যবহার করুন। ফোন নির্মাতার পরামর্শ অনুযায়ী চার্জার ও আনুষঙ্গিক উপকরণ ব্যবহার করা ভালো।
সব সময় ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে চার্জ রাখা কি বাধ্যতামূলক
২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে চার্জ রাখার পরামর্শ অনেক জায়গায়ই দেখা যায়। তবে এটিকে সব ফোনের জন্য কঠোর নিয়ম হিসেবে ধরা ঠিক নয়। আধুনিক ফোনগুলোতে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সুবিধা থাকে। কিছু ফোনে নির্দিষ্ট শতাংশে চার্জ সীমিত রাখার সুবিধাও দেওয়া হয়।
গুগোলও ব্যাটারি ভালো রাখার জন্য চার্জিং ব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। তাই প্রতিদিন ফোনকে ঠিক ২০ শতাংশে নামিয়ে আবার ৮০ শতাংশে চার্জ করতেই হবে, এমন নয়। আপনার ব্যবহারের প্রয়োজন অনুযায়ী চার্জ করাই বাস্তবসম্মত।
ব্যাটারি হেলথ কমে গেলে করণীয়
ফোনের ব্যাটারি আগের তুলনায় দ্রুত শেষ হলে প্রথমে ব্যাটারি ব্যবহারের তালিকা দেখে কোন অ্যাপ বা ফিচার বেশি শক্তি খরচ করছে তা দেখুন।
সমস্যা হলে ব্যাটারি হেলথের তথ্য দেখুন, যদি ফোনে এই সুবিধা থাকে। উদাহরণ হিসেবে, আইফোনে ব্যাটারির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা দেখা যায়। কিছু নতুন পিক্সেল ফোনেও ব্যাটারি ধারণক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য দেখার সুবিধা আছে।
ব্যাটারির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বা ফোনে ব্যাটারি পরিবর্তনের পরামর্শ দেখালে অনুমোদিত সেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা ভালো।
ব্যাটারি ক্যাপাসিটি, ব্যাটারি লাইফ আর ব্যাটারি হেলথ এক বিষয় নয়। ক্যাপাসিটি বোঝায় ব্যাটারি কতটা শক্তি ধারণ করতে পারে, ব্যাটারি লাইফ বোঝায় একবার চার্জে ডিভাইসটি কতক্ষণ ব্যবহার করা যায় এবং ব্যাটারি হেলথ বোঝায় সময়ের সঙ্গে ব্যাটারির বর্তমান সক্ষমতা কতটা কমেছে।
তাই ফোনে ৫০০০ বা ৬০০০ এমএএইচ ব্যাটারি থাকলেই সারাদিন চার্জ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আপনার ব্যবহারের ধরন, পর্দার উজ্জ্বলতা, অ্যাপ, নেটওয়ার্ক, তাপমাত্রা এবং ব্যাটারির বয়স সবকিছু মিলেই ঠিক করে ফোনটি কতক্ষণ চলবে।
সূত্র: গুগল অ্যান্ড্রয়েড হেল্প, আ্যপল
