ভূমিকম্প হওয়ার আগেই যেভাবে সতর্কবার্তা দেয় এই দেশ

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা বারবার সংবাদ শিরোনামে আসছে। ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশে ভূমিকম্পের পর আঘাত হেনেছে একের পর এক আফটারশক। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটেছে।
তবে ভূমিকম্পের ঝুঁকির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত দেশগুলোর একটি জাপান। দেশটিতে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় ভূমিকম্প হয়।
জাপান আবহাওয়া সংস্থার (জেএমএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই জাপান ও আশপাশের অঞ্চলে ১৫ হাজার ৬৬৫টি ভূমিকম্প নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৬৭৪টির মাত্রা ছিল ৩-এর কম।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান হওয়ায় জাপানে ভূমিকম্প নতুন কোনো বিপদ নয়। তবে ভূমিকম্প মোকাবিলায় দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো অত্যাধুনিক সতর্কতা প্রযুক্তি।
জাপানে চালু রয়েছে আর্থকোয়েক আর্লি ওয়ার্নিং বা ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। নামের কারণে অনেকের মনে হতে পারে, এই প্রযুক্তি ভূমিকম্প হওয়ার আগেই তা অনুমান করতে পারে। আসলে বিষয়টি তা নয়।
ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভূকম্পন তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে পি-ওয়েভ সবচেয়ে আগে পৌঁছায়। এটি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। এরপর আসে এস-ওয়েভ, যা বেশি শক্তিশালী এবং সাধারণত ভূমিকম্পের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী।
জাপানের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপন করা বিশেষ সেন্সর খুব দ্রুত পি-ওয়েভ শনাক্ত করে। এরপর কম্পিউটার ব্যবস্থা সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের কেন্দ্র, সম্ভাব্য মাত্রা এবং কোন এলাকায় কতটা শক্তিশালী কম্পন পৌঁছাতে পারে—এসব হিসাব করে।
এর ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, রেডিও, রেলস্টেশন ও লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
এই ব্যবস্থা ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয় না। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর ক্ষতিকর এস-ওয়েভ পৌঁছানোর আগেই সতর্কবার্তা দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় সময় খুব কম পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা পাওয়ার আগেই সেখানে শক্তিশালী কম্পন শুরু হয়ে যেতে পারে। তবে ভূমিকেন্দ্র থেকে দূরের এলাকায় কয়েক সেকেন্ড বা তারও বেশি সময় আগে সতর্কবার্তা পাওয়া সম্ভব।
এই অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারে, গ্যাস বা বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করা যেতে পারে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি নিরাপদ অবস্থায় নেওয়া সম্ভব।
জাপানের দ্রুতগতির শিনকানসেন বুলেট ট্রেন ব্যবস্থাকেও ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রাথমিক ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিং ব্যবস্থাও সক্রিয় হতে পারে। এতে শক্তিশালী কম্পনের সময় ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হয়।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় জাপানের সাফল্য শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। দেশটির স্কুল, অফিস, হাসপাতাল ও কারখানায় নিয়মিত ভূমিকম্পের মহড়া হয়।
ভারী আসবাবপত্র নিরাপদে আটকানো, জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা এবং ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কী করতে হবে—এসব বিষয়েও মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, জাপানের ভূমিকম্প মোকাবিলার ব্যবস্থা শুধু কয়েক সেকেন্ডের সতর্কবার্তার ওপর নির্ভরশীল নয়। উন্নত প্রযুক্তি, ভূমিকম্পসহনশীল অবকাঠামো, নিয়মিত মহড়া এবং মানুষের সচেতনতা—সব মিলিয়েই দেশটি ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি ভূমিকম্প হওয়ার আগে ভূমিকম্প ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করে না; বরং ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর ক্ষতিকর কম্পন পৌঁছানোর আগে মানুষকে কয়েক সেকেন্ড সময় দেয়। আর সেই কয়েক সেকেন্ডই অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



