logo
Advertisement

মুখ কীভাবে চিনে নেয় স্মার্টফোন, পেছনে রয়েছে যে প্রযুক্তি

মুখ কীভাবে চিনে নেয় স্মার্টফোন, পেছনে রয়েছে যে প্রযুক্তি
ছবি: টিভি ৯

স্মার্টফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আনলক হয়ে যায় ফোন। পুরো প্রক্রিয়াটি এত দ্রুত ঘটে যে অনেক সময় বোঝাই যায় না, আসলে এর পেছনে কতটা প্রযুক্তি কাজ করছে। ফোন কি শুধু ক্যামেরা দিয়ে আপনার ছবি তুলে সেটি আগের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও জটিল কোনো ব্যবস্থা?

আসলে ফোনের ফেস আনলক প্রযুক্তি শুধু একটি ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না। ফোনের ধরন ও ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে ক্যামেরা, ইনফ্রারেড সেন্সর, গভীরতার তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এরপর আপনার মুখের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থেকে তৈরি করা তথ্যের সঙ্গে নতুন করে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে পরিচয় যাচাই করা হয়।


প্রথমে ফোন আপনার মুখের তথ্য নেয়

ফোনে প্রথমবার ফেস আনলক সেটআপ করার সময় আপনাকে বিভিন্ন কোণ থেকে মুখ দেখাতে হয়। এই সময় ফোন আপনার মুখের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একটি ডিজিটাল মডেল তৈরি করে।

উদাহরণ হিসেবে চোখের অবস্থান, নাকের গঠন, মুখের আকৃতি এবং মুখের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক দূরত্বের মতো বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানো হতে পারে। গুগলের পিক্সেল ফেস আনলকেও (Pixel Face Unlock) সেটআপের সময় বিভিন্ন কোণ থেকে মুখের ছবি নিয়ে একটি আলাদা ফেস মডেল তৈরি করা হয়।

ফোন আনলকের সময় কী ঘটে?

আপনি ফোনের দিকে তাকালে প্রথমে সামনের ক্যামেরা বা সংশ্লিষ্ট সেন্সর আপনার মুখ শনাক্ত করে। এরপর ডিভাইসটি মুখের বর্তমান তথ্য সংগ্রহ করে।

উন্নত ফেস রিকগনিশন ব্যবস্থায় শুধু দ্বিমাত্রিক ছবি নয়, মুখের গভীরতা বা 3D আকৃতির তথ্যও ব্যবহার করা হতে পারে। অ্যাপলের ফেস আইডি (Face ID) প্রযুক্তিতে ট্রু-ডেপথ (TrueDepth) ক্যামেরা হাজার হাজার অদৃশ্য ইনফ্রারেড ডট ব্যবহার করে মুখের একটি ডেপথ ম্যাপ (depth map) তৈরি করে। একই সঙ্গে ইনফ্রারেড ছবিও নেওয়া হয়।

এরপর এই তথ্য থেকে একটি গাণিতিক প্রতিনিধিত্ব তৈরি করা হয়। সেটি আগে থেকে সংরক্ষিত মুখের মডেলের সঙ্গে তুলনা করে ফোন সিদ্ধান্ত নেয়, সামনে থাকা ব্যক্তি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী কি না।


তাহলে ছবি দেখিয়ে ফোন খোলা যায় না কেন?

শুধু সাধারণ 2D ছবি দেখে কাজ করা ফেস আনলক ব্যবস্থায় নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। অন্যদিকে উন্নত সিস্টেমে মুখের গভীরতার তথ্য ব্যবহার করা হয়। ফলে সামনে থাকা ব্যক্তি বাস্তব মানুষ কি না এবং মুখের গঠন সংরক্ষিত মডেলের সঙ্গে মিলছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়।

অ্যাপলের ফেস আইডিতে depth information ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ প্রিন্ট করা ছবি বা 2D ডিজিটাল ছবিতে থাকে না। প্রযুক্তিটি বিভিন্ন ধরনের spoofing বা নকল উপায়ে ফোন খোলার চেষ্টা ঠেকানোর জন্যও তৈরি করা হয়েছে।

তবে সব স্মার্টফোনের ফেস আনলক একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে না। অ্যান্ড্রয়েডের অফিসিয়াল নথিতেও বিভিন্ন ধরনের বায়োমেট্রিক প্রমাণীকরণের (biometric authentication) নিরাপত্তা স্তরের পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্ধকারেও কীভাবে কিছু ফোন মুখ চিনতে পারে?

সাধারণ সামনের ক্যামেরার জন্য অন্ধকারে মুখ দেখা কঠিন। কিন্তু যেসব ফোনে ইনফ্রারেড বা বিশেষ depth-sensing প্রযুক্তি রয়েছে, সেগুলো দৃশ্যমান আলো ছাড়াও মুখের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

অ্যাপলের ট্রু-ডেপথ সিস্টেম ইনফ্রারেড আলো ও depth information ব্যবহার করে। এ কারণে ফেস আইডি অন্ধকার পরিবেশেও কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে সব অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ফেস আনলক একইভাবে কাজ করে না। কিছু ডিভাইসের ফেস আনলক কম আলো বা মুখ ঢাকা থাকলে কাজ নাও করতে পারে। গুগল নিজেও পিক্সেল ফেস আনলকের (Pixel Face Unlock) ক্ষেত্রে আলো কম থাকলে বা মুখে কিছু ঢাকা থাকলে কাজ ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছে।

চেহারা বদলে গেলেও ফোন চিনতে পারে কীভাবে?

মানুষের চেহারা প্রতিদিন একই থাকে না। দাড়ি রাখা, চশমা পরা, মেকআপ করা কিংবা চুলের স্টাইল বদলে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে ফোন ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করতে পারে।

এর কারণ হলো আধুনিক ফেস রিকগনিশন ব্যবস্থা শুধু একটি ছবির সঙ্গে আরেকটি ছবি মেলানোর ওপর নির্ভর করে না। মুখের নির্দিষ্ট গঠন ও বৈশিষ্ট্যের একটি গাণিতিক মডেল ব্যবহার করা হয়।

অ্যাপল জানিয়েছে, Face ID সময়ের সঙ্গে ব্যবহারকারীর চেহারার কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। বড় ধরনের পরিবর্তন হলে প্রয়োজনে পাসকোড দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর সিস্টেম তার মুখের তথ্য আপডেট করতে পারে।

মুখের তথ্য কি ফোনের বাইরে চলে যায়?

এটি নির্ভর করে ডিভাইস ও নির্মাতার ব্যবস্থার ওপর। উন্নত সিস্টেমে বায়োমেট্রিক তথ্য ডিভাইসের ভেতরেই নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়া করার ব্যবস্থা থাকতে পারে।

অ্যাপলের ক্ষেত্রে Face ID-র গাণিতিক প্রতিনিধিত্ব এনক্রিপ্ট করে Secure Enclave-এর মধ্যে সুরক্ষিত রাখা হয় এবং ফেস আইডি ডাটা (Face ID data) ডিভাইসের বাইরে যায় না বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

Android-এর নিরাপত্তা নীতিতেও বায়োমেট্রিক তথ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভব হলে raw biometric data ও derived features ডিভাইসের বাইরে না পাঠানোর নীতি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে কোন ফোন কীভাবে এই তথ্য সংরক্ষণ করে, তা মডেল ও নির্মাতার ওপর নির্ভর করে।

ফেস আনলক কি সবসময় সবচেয়ে নিরাপদ?

এখানেও ফোনভেদে পার্থক্য রয়েছে। অ্যান্ড্রয়েডের অফিসিয়াল নথি অনুযায়ী, সব বায়োমেট্রিক authentication-এর নিরাপত্তা স্তর এক নয়। কিছু face authentication শক্তিশালী নিরাপত্তা দিতে পারে, আবার কিছু ব্যবস্থা মূলত সুবিধার জন্য তৈরি।

গুগলও জানিয়েছে, কিছু পিক্সেল (Pixel) ডিভাইসে ফেস আনলক শক্তিশালী PIN, pattern বা password-এর তুলনায় কম নিরাপদ হতে পারে। একই রকম দেখতে ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে অ্যাপলের ফেস আইডিতে depth sensing, attention detection এবং anti-spoofing প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, একটি নিবন্ধিত appearance-এর ক্ষেত্রে এলোমেলো কোনো ব্যক্তির Face ID দিয়ে ফোন আনলক করার সম্ভাবনা ১০ লাখে একেরও কম।

আসলে কয়েক সেকেন্ডে এত কিছু কীভাবে হয়?

পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে ভাবা যায়।

প্রথম ধাপ: ফোন আপনার মুখ শনাক্ত করে।

দ্বিতীয় ধাপ: ক্যামেরা বা সেন্সর মুখের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে।

তৃতীয় ধাপ: মুখের গঠন ও বৈশিষ্ট্য থেকে একটি ডিজিটাল বা গাণিতিক representation তৈরি হয়।

চতুর্থ ধাপ: নতুন তথ্য আগে থেকে সংরক্ষিত মুখের মডেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

পঞ্চম ধাপ: নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ হলে ফোন আনলক হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়া এত দ্রুত সম্পন্ন হয় যে ব্যবহারকারীর কাছে মনে হয়, শুধু মুখ দেখালেই ফোন নিজে থেকেই খুলে গেছে।

একই নাম হলেও প্রযুক্তি এক নয়

স্মার্টফোনে মুখভিত্তিক আনলক বা ফেস আইডি লেখা থাকলেই সব ফোনে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, এমন নয়। কোনো ফোন সাধারণ ক্যামেরাভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে, আবার কোনো ফোনে ইনফ্রারেড সেন্সর ও depth mapping-এর মতো উন্নত প্রযুক্তি থাকতে পারে।

তাই নতুন ফোন কেনার সময় শুধু ফেস আনলক আছে কি না, সেটি দেখার বদলে সেটি কী ধরনের বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং কোন কোন অ্যাপ বা পেমেন্টে এটি ব্যবহার করা যায়, তা দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

মুখ দেখেই ফোন আনলক হওয়ার পেছনে তাই আসলে রয়েছে ক্যামেরা, সেন্সর, গাণিতিক মডেল, মেশিন লার্নিং এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কয়েক মুহূর্তের এই প্রক্রিয়াই প্রতিবার নিশ্চিত করে যে ফোনটি যার হাতে, সে-ই নিবন্ধিত ব্যবহারকারী কি না।

সূত্র: টিভি ৯