logo
Advertisement

এআই দিয়ে শত শত ভুয়া খবর, আ.লীগপন্থী নেটওয়ার্ক বন্ধ করল এনথ্রোপিক

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এআই দিয়ে শত শত ভুয়া খবর, আ.লীগপন্থী নেটওয়ার্ক বন্ধ করল এনথ্রোপিক
ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ক্লড ব্যবহার করে বাংলা ভাষায় ভুয়া খবর তৈরি ও প্রচারের একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক শনাক্তের পর তা বন্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান এনথ্রোপিকের ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ বিষয়ক গোপন তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

‘জিটিজি-৫৪০০৬’ নামে চিহ্নিত এই নেটওয়ার্কটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাত এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট তথ্য ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হতো।

এনথ্রোপিকের গোপন তদন্তে জানা গেছে, গাইবান্ধার এক ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। এই প্ল্যাটফর্মের স্থান ও খোঁজ এড়াতেই অ্যাকাউন্টগুলো পালাক্রমে ব্যবহার করা হতো।

কনটেন্ট তৈরির জন্য ক্লডে প্রম্পট দেওয়ার সময়ও এসব সংবাদকে ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে প্রম্পটে বলা1 হয়েছিল, এমনভাবে খবর তৈরি করতে হবে যাতে ‘কেউ না জানে খবরটি ভুয়া’। এসব খবরকে একই সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক এবং গ্রামের মানুষের জন্য সহজবোধ্য করার নির্দেশনাও ছিল।

তৈরি হতো হাজারো ভুয়া কনটেন্ট

তদন্তে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি ‘ফেক_নিউজ_৩’ নামে একটি নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করেছিলেন। এটি সরাসরি ক্লডের এপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট কনটেন্ট তৈরি করত।

প্রতিবার সফটওয়্যারটি ১৫টি ভুয়া শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানোয়াট সংবাদ ও ১৫টি ছবি তৈরির নির্দেশনা তৈরি করত। এভাবে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০ ভুয়া সংবাদ ও ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে।

এনথ্রোপিক জানিয়েছে, ক্লডে সরাসরি ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব নির্দেশনা অন্য এআই মডেলে ব্যবহার করে ছবি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।

তৈরি করা কনটেন্টের লক্ষ্য ছিল মূলত গ্রামের মানুষ। এসব কনটেন্ট ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকের সরাসরি সম্প্রচারে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এসব কনটেন্টে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

বিভিন্ন বানোয়াট প্রচারে আওয়ামী বিরোধীদের তালেবানধাঁচের শরিয়াহভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, নিরাপত্তা বাহিনীতে অনুপ্রবেশ, হত্যার ষড়যন্ত্র ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার মতো অভিযোগ করা হয়।

কিছু কনটেন্টে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে মনগড়া দুর্নীতি এবং গোপন রাজনৈতিক আঁতাতের অভিযোগও তোলা হয়েছিল।

ভিডিও প্রকাশেও ছিল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা

শুধু কনটেন্ট তৈরিই নয়, সেগুলো প্রকাশের জন্যও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা (অটো জেনারেশন) তৈরি করা হয়েছিল। ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেক ভিডিও প্রকাশের জন্য আলাদা একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হয়।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ভিডিওগুলো নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী আগে থেকেই আপলোডের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করে রাখা যেত। তৃতীয় পক্ষের (থার্ড পার্টি) মাধ্যমে এক মাস আগেই ভিডিও প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হতো।

কনটেন্ট তৈরির পর সেগুলো নির্দিষ্ট ক্লাউড স্টোরেজে রাখা হতো। পরে সেগুলো অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তর করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইউটিউবে প্রকাশের জন্য রাখা হতো। ফলে পুরো কার্যক্রমে মানুষের সরাসরি নজরদারির সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

নেটওয়ার্কটির প্রচার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও দলটি এই কার্যক্রম পরিচালনা বা অর্থায়ন করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে এনথ্রোপিক।

কিছু কনটেন্টের বক্তব্য ভারতের পক্ষে ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এসব প্রচারের পেছনে কোনো রাষ্ট্রের নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণও তদন্তে পাওয়া যায়নি।

এনথ্রোপিকের তদন্তে আরও দেখা গেছে, নেটওয়ার্কটির তৈরি ভিডিও ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের বাংলাদেশকেন্দ্রিক একাধিক চ্যানেল ও অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে এর পুরো কনটেন্ট কোন কোন অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া এসব কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর বাইরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। একাধিক প্ল্যাটফর্মে একাধিক বাংলাদেশকেন্দ্রিক অ্যাকাউন্টে ভিডিও পাওয়ায় এনথ্রোপিকের ‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী কার্যক্রমটিকে তৃতীয় শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে এনথ্রোপিক।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে একই ধরনের কার্যক্রম আবার শুরু করার চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণে নেটওয়ার্কটির আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রমের বিভিন্ন তথ্য ও শনাক্তকারী উপাত্ত (ডেটা) ভাগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনথ্রোপিক।