গুগল সার্চে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সরাবেন যেভাবে

আপনার নাম লিখে গুগলে খুঁজতেই যদি নিজের মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা কিংবা বাসার ঠিকানা সামনে চলে আসে, বিষয়টি অস্বস্তিকর হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ অনলাইনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য প্রতারণা, পরিচয় চুরি বা হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, একবার কোনো তথ্য ইন্টারনেটে চলে গেলে সেটি আর সরানোর উপায় নেই। আসলে গুগল সার্চে প্রদর্শিত কিছু ব্যক্তিগত তথ্য সরানোর জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার, গুগল সার্চ থেকে কোনো তথ্য সরানো আর ইন্টারনেট থেকে তথ্য পুরোপুরি মুছে ফেলা এক বিষয় নয়।
কোন কোন ব্যক্তিগত তথ্য সরানোর আবেদন করা যায়?
গুগল নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য সার্চ ফলাফল থেকে সরানোর আবেদন গ্রহণ করে। এর মধ্যে রয়েছে:
- বাসার ঠিকানা
- মোবাইল নম্বর
- ই-মেইল ঠিকানা
- ব্যাংক হিসাবের তথ্য
- ক্রেডিট কার্ডের তথ্য
- সরকারি পরিচয়পত্রের গোপন নম্বর
- পাসপোর্ট বা অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য
- ব্যক্তিগত স্বাক্ষরের ছবি
- চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যক্তিগত নথি
- ব্যবহারকারীর নাম ও পাসওয়ার্ডের মতো গোপন প্রবেশতথ্য
এ ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে হুমকি বা হয়রানির বিষয় থাকলে সেটিও গুগলের কাছে অপসারণের জন্য জানানো যেতে পারে।
তবে সব তথ্য গুগল সরিয়ে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য, যেমন সংবাদ প্রতিবেদন বা সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তথ্য, গুগল কিছু ক্ষেত্রে সার্চে রেখে দিতে পারে।
প্রথমে নিজের নাম দিয়ে গুগলে খুঁজুন
নিজের কোন তথ্য অনলাইনে দেখা যাচ্ছে, সেটি জানতে প্রথমে গুগলে নিজের নাম লিখে খুঁজুন।
শুধু নাম দিয়ে খোঁজার পাশাপাশি নিজের নামের সঙ্গে মোবাইল নম্বর, শহরের নাম বা ঠিকানার অংশ যোগ করেও খুঁজতে পারেন।
যে ওয়েবসাইটের পাতায় আপনার ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে, সেটির ঠিকানা আলাদা করে রেখে দিন। কারণ গুগলের কাছে অপসারণের আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট পাতার ঠিকানা দিতে হতে পারে।
গুগলের Results about you সুবিধা ব্যবহার করুন
গুগলের Results about you সুবিধাটি নিজের ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজন হলে সার্চ ফলাফল থেকে তা সরানোর আবেদন করার জন্য ব্যবহার করা যায়। সুবিধাটি আপনার নামের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বর, ঠিকানা বা ই-মেইল ঠিকানা খুঁজে দেখতেও সাহায্য করে।
এটি ব্যবহার করতে গুগল অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে Results about you পাতায় যেতে হবে। এরপর আপনার নাম এবং যে ব্যক্তিগত তথ্যগুলো খুঁজে দেখতে চান, সেগুলো দিতে হবে।
গুগল আপনার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সার্চ ফলাফল পর্যবেক্ষণ করবে। নতুন কোনো ফলাফলে আপনার তথ্য পাওয়া গেলে বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা যায়।
তথ্য পাওয়া গেলে কী করবেন?
ধরুন, গুগল সার্চে আপনার মোবাইল নম্বরসহ একটি ওয়েবসাইট পাওয়া গেল।
সেক্ষেত্রে Results about you পাতায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট ফলাফলটি নির্বাচন করুন। এরপর ব্যক্তিগত তথ্য দেখানো ফলাফলটি সরানোর জন্য আবেদন করার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
গুগল আপনার আবেদন পর্যালোচনা করবে। অনুমোদিত হলে ওই ওয়েব ঠিকানাটি সার্চ ফলাফল থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পুরো ওয়েব ঠিকানাটি সরানোর বদলে আপনার নাম দিয়ে করা অনুসন্ধানে সেটি আর দেখানো হবে না।
সরাসরি গুগল সার্চ থেকেও আবেদন করা যায়
আপনি গুগলে নিজের নাম লিখে সার্চ করার পর কোনো ফলাফলে ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে পেলে সরাসরি সেই ফলাফল থেকেও অপসারণের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।
গুগলের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ফলাফলের পাশে থাকা অতিরিক্ত বিকল্পে গিয়ে Remove result নির্বাচন করতে হয়। এরপর কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত তথ্য দেখানো হচ্ছে এমন বিকল্প নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন জমা দেওয়া যায়।
আবেদন করার সময় তথ্য ঠিকভাবে দিন
অপসারণের আবেদন করার সময় ওয়েবসাইটে যেভাবে তথ্যটি লেখা আছে, সেভাবেই তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন, কোনো পুরোনো ঠিকানা যদি ওয়েবসাইটে আপনার নামে প্রকাশিত থাকে, তাহলে আবেদনে সেই ঠিকানাটিই উল্লেখ করতে হবে। একই ওয়েব ঠিকানায় আপনার একাধিক ব্যক্তিগত তথ্য থাকলে সাধারণত প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা আবেদন করার প্রয়োজন হয় না।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট তথ্যের ছবি বা পর্দার ছবি দিয়েও বিষয়টি বোঝানো যায়।
আবেদন করার পর কী হয়?
আবেদন জমা দেওয়ার পর গুগল সেটি পর্যালোচনা করে। আপনার গুগল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আবেদনের অবস্থা দেখা যায়।
আবেদনের অবস্থা সাধারণত জানানো হয়। যেমন, আবেদনটি পর্যালোচনাধীন, অনুমোদিত, প্রত্যাখ্যাত বা পরে বাতিল হয়েছে কি না, তা দেখা যায়।
অনুমোদন পাওয়ার পরও সার্চ ফলাফল থেকে তথ্য পুরোপুরি অদৃশ্য হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ওয়েবসাইট থেকে তথ্য মুছবে কে?
এখানেই অনেকের ভুল বোঝাবুঝি হয়।
গুগল আপনার তথ্য সার্চ ফলাফল থেকে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু যে ওয়েবসাইটে তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে, সেই ওয়েবসাইট থেকে তথ্যটি গুগল সাধারণত মুছে দিতে পারে না। মূল ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ থাকে তার মালিক বা পরিচালনাকারীর হাতে।
তাই সম্ভব হলে প্রথমে ওয়েবসাইটটির মালিক বা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্যটি সরানোর অনুরোধ করা ভালো।
ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সরিয়ে ফেলার পরও যদি গুগলে পুরোনো তথ্য দেখা যায়, তখন গুগলের পুরোনো তথ্য হালনাগাদ করার সুবিধা ব্যবহার করে সার্চ ফলাফল নতুন করে দেখানোর অনুরোধ করা যায়।
তথ্য মুছে গেলেই কি ঝুঁকি শেষ?
সব সময় নয়।
ধরুন, কোনো ওয়েবসাইট থেকে আপনার মোবাইল নম্বর সরানো হলো। কিন্তু সেই তথ্য যদি অন্য কোনো ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পুরোনো নথি বা অন্য কোনো পাতায় থেকে যায়, তাহলে সেটি আবারও অনলাইনে পাওয়া যেতে পারে।
তাই শুধু গুগলে নিজের নাম একবার খুঁজে দেখলেই দায়িত্ব শেষ নয়। মাঝে মাঝে নিজের নাম ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করে দেখা ভালো।
ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে দেওয়ার আগে সতর্ক থাকুন
ব্যক্তিগত তথ্য পরে মুছে ফেলার চেষ্টা করার চেয়ে শুরুতেই তা অনলাইনে প্রকাশ না করাই নিরাপদ।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে মোবাইল নম্বর, বাসার ঠিকানা, পরিচয়পত্রের ছবি, ব্যাংকসংক্রান্ত তথ্য বা গুরুত্বপূর্ণ নথি দেওয়া উচিত নয়।
কোনো ওয়েবসাইট বা অপরিচিত ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সেটি কেন প্রয়োজন, কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং কারা দেখতে পারবে, তা ভেবে দেখা দরকার।
গুগল থেকে তথ্য সরানোর আবেদন কোথায় করবেন?
গুগলের ব্যক্তিগত তথ্য অপসারণের জন্য সরাসরি সাহায্যের পাতায় আবেদন করা যায়।
গুগলে ব্যক্তিগত তথ্য সরানোর আবেদন
নিজের তথ্য খুঁজে দেখা এবং অপসারণের অনুরোধ করার জন্য ব্যবহার করা যায়:
Results about you ব্যবহার করুন
ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে পড়া এখন খুব সাধারণ বিষয়। নিজের নাম, মোবাইল নম্বর বা ঠিকানা দিয়ে খুঁজলে যদি অচেনা কোনো ওয়েবসাইটে এসব তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। প্রথমে সম্ভব হলে মূল ওয়েবসাইটের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। পাশাপাশি গুগলের নীতিমালার আওতায় পড়লে সার্চ ফলাফল থেকে তথ্যটি সরানোর আবেদন করতে পারেন।
তবে মনে রাখবেন, গুগল থেকে কোনো ফলাফল সরানো মানেই তথ্যটি ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি মুছে যাওয়া নয়। তাই ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই সতর্ক থাকা সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা।
সূত্র: প্রযুক্তি



