মস্তিষ্কের ভেতর ’ডিভাইস’ বসানোর অনুমতি দিল চীন

বাণিজ্যিকভাবে মানবদেহে ব্রেইন ইমপ্ল্যান্টের অনুমতি দিয়েছে চীন, বিশ্বে যা প্রথম। বহু বছর ধরে এ বিষয়ে পরীক্ষা চলমান, তবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারে আগে হয়নি। স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত মানুষের ব্যবহারের জন্য ব্রেইন–কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) স্থাপনের অনুমতির মাধ্যমে এক নতুন ইতিহাস গড়ল চীন।
সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান এবং সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজ থেকে জানা যায়, ডিভাইসটি তৈরি করেছে সাংহাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নিউর্যাকল মেডিকেল টেকনোলজি। তবে মানুষের মস্তিষ্কে সংস্থাপন করার জন্য ডিভাইস তৈরির চেষ্টা কিন্তু নতুন নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান এমন প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করেছে এবং এখনও করছে, তার মধ্যে ইলন মাস্কের নিউরালিংক আলোচিত নাম। ধারণা করা হচ্ছে, আগামীতে নিউর্যাকল আর নিউরালিংক একে অন্যের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে এই বাজারে। ব্রেইন ইমপ্লান্ট বহু দশক ধরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তবে প্রথমবারের মতো এ ধরনের ডিভাইস বাণিজ্যিকভাবে রোগীদের ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে।
নিউর্যাকলের এই ডিভাইসটি এক ধরনের যন্ত্র যা যা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করে। এটি সুক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভেতরে বা উপরিভাগে বসানো হয়। সেখানে এটি নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করে। পরে সফটওয়্যার সেই সংকেতকে ‘ডিকোড’ করে কম্পিউটারের কার্সর বা কৃত্রিম অঙ্গ (প্রোস্থেটিক লিম্ব) নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
আকারে ডিভাইসটি ছোট একটি কয়েনের মতো। এটি এক ধরনের ওয়্যারলেস ইমপ্লান্ট, যা মস্তিষ্কের বাইরের ঝিল্লির উপরিভাগে বসানো হয়। এটি বিশেষভাবে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত মানুষের জন্য তৈরি হলেও আপাতত শুধু তাদের জন্য অনুমোদিত, যাদের বাহুর উপরের অংশে কিছুটা কার্যক্ষমতা এখনও রয়েছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছাড়াও অন্যান্য শারীরিক প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত মানুষের জন্যও এর উন্নয়ন করা হচ্ছে।
২০০০ সালের প্রথম ভাগে ব্রেইনগেট নামের একটি গবেষণা কনসোর্টিয়াম এ ধরনের প্রযুক্তির ডিভাইস তৈরি করেছিল। সেই ডিভাইসটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত গবেষণা অংশগ্রহণকারীদের— যারা চোখের নড়াচড়া ছাড়া তেমন কিছুই করতে সক্ষম ছিলেন না, তাদেরকে কম্পিউটার মাউস নিয়ন্ত্রণ ও ভার্চুয়াল কিবোর্ডে টাইপের সুযোগ দিতো। এরপর থেকে বিভিন্ন গবেষণা দল একই ধরনের সক্ষমতার আরও ডিভাইস তৈরি করেছে। এ ধরনের বেশ কিছু ডিভাইস বা প্রযুক্তি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ব্যবহৃত হলেও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমতি পায়নি।
ট্রায়ালে ফলাফল যে খারাপ ছিল এমন নয়, তবে কিছু জটিলতা ছিল বলে ডিভাইসগুলো ‘পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি’র পরিচয় বদলাতে পারেনি। এই ডিভাইস স্থাপনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে সার্জারি করতে হয়, যা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে সংক্রমণ বা অন্যান্য জটিলতার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইমপ্লান্ট সরে যেতে পারে বা এর চারপাশে স্কার টিস্যু তৈরি হতে পারে, যা সিগন্যালের মান কমিয়ে দেয়। অনুমতির পর চীনের এই ডিভাইসটি নকেমন কাজ করবে, তার ওপরে নিঃসন্দেহে এই প্রযুক্তির পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে।
সূত্র : সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান, ইউরোনিউজ