ফোনের স্ক্রিন লকে কোনটি বেশি নিরাপদ, পিন নাকি পাসওয়ার্ড

স্মার্টফোন এখন শুধু কথা বলা বা ছবি তোলার যন্ত্র নয়। ব্যাংকিং, অফিসের ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত ছবি, নথি থেকে শুরু করে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে ফোনে। তাই ফোন হারিয়ে গেলে বা অন্য কারও হাতে চলে গেলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এ কারণে ফোনের স্ক্রিন লক কতটা শক্তিশালী, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের ধারণা, যত বড় ও জটিল পাসওয়ার্ড, ফোন তত বেশি নিরাপদ। কিন্তু স্ক্রিন লকের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু ভিন্ন। একটি শক্তিশালী পিন অনেক সময় দীর্ঘ পাসওয়ার্ডের চেয়ে বেশি সুবিধাজনক এবং বাস্তবসম্মত হতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে সব ধরনের পিনই পাসওয়ার্ডের চেয়ে নিরাপদ। পিন কতটা অনুমান করা কঠিন এবং ফোনের নিরাপত্তাব্যবস্থা কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইন অ্যাকাউন্ট আর ফোনের স্ক্রিন লক এক নয়
প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অনলাইন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড এবং ফোনের স্ক্রিন লক একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়।
ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে বড় ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা ভালো। সেখানে অক্ষর, সংখ্যা ও বিশেষ চিহ্ন মিলিয়ে দীর্ঘ পাসওয়ার্ড তৈরি করা নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
কিন্তু ফোন দিনে বহুবার আনলক করতে হয়। তাই খুব দীর্ঘ ও জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা অনেকের জন্য বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে। এতে কেউ পাসওয়ার্ড লিখে রাখতে পারেন, অন্যকে বলে দিতে পারেন কিংবা সহজ কোনো পাসওয়ার্ড ব্যবহার শুরু করতে পারেন। তখন দীর্ঘ পাসওয়ার্ড রাখার উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যায়।
শক্তিশালী পিন কেন ভালো বিকল্প হতে পারে?
ফোনের স্ক্রিন লকের জন্য একটি শক্তিশালী পিন ব্যবহার করা সহজ। একই সঙ্গে আধুনিক স্মার্টফোনে ভুল পিন বারবার দেওয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থাও থাকে। একাধিকবার ভুল চেষ্টা হলে পরবর্তী চেষ্টা করার আগে অপেক্ষা করতে হতে পারে বা ফোন সাময়িকভাবে লক হয়ে যেতে পারে। ফলে কেউ বসে বসে একের পর এক সংখ্যা দিয়ে পিন অনুমান করার সুযোগ কম পায়।
অ্যান্ড্রয়েডের নিজস্ব নির্দেশনায়ও অন্তত চার সংখ্যার পিন ব্যবহার করা যায় বলা হয়েছে। তবে অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য ছয় বা তার বেশি সংখ্যার পিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। সাধারণভাবে পিন যত দীর্ঘ হবে, অনুমান করা তত কঠিন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে ১২৩৪ বা ০০০০ ব্যবহার করলে বিপদ
পিন ব্যবহার করলেই ফোন নিরাপদ হয়ে যাবে, এমন নয়। পিনটি সহজে অনুমান করা যায় কি না, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১২৩৪, ০০০০, ১১১১ বা ১২৩৪৫৬-এর মতো পরিচিত সংখ্যা ব্যবহার করা উচিত নয়। নিজের জন্মতারিখ, পরিবারের সদস্যের জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বরের অংশ, গাড়ির নম্বর বা অন্য কোনো সহজে অনুমানযোগ্য সংখ্যাও পিন হিসেবে ব্যবহার না করাই ভালো।
একইভাবে ফোনের পিন কাউকে বলে রাখা বা কাগজে এমন জায়গায় লিখে রাখা ঠিক নয়, যেখান থেকে অন্য কেউ সহজেই সেটি দেখতে পারে।
তাহলে কি পাসওয়ার্ড একেবারেই ব্যবহার করবেন না?
তা নয়। অ্যান্ড্রয়েডের নির্দেশনা অনুযায়ী, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড স্ক্রিন লকের সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। অর্থাৎ শক্তিশালী ও দীর্ঘ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে পারলে সেটিও খুব ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সমস্যা হলো ব্যবহারিক দিকটি। এমন একটি পাসওয়ার্ড রাখা, যা খুব শক্তিশালী কিন্তু প্রতিবার ফোন খোলার সময় ব্যবহার করতে গিয়ে বিরক্তি তৈরি করে, সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে।
তাই ফোনের স্ক্রিন লকের ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থা বেছে নেওয়া ভালো, যা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যবহার করাও সহজ।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা মুখ শনাক্তকরণ কি যথেষ্ট?
অনেক ফোনেই এখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা মুখ শনাক্ত করে ফোন খোলার সুবিধা রয়েছে। এগুলো প্রতিদিনের ব্যবহারে বেশ সুবিধাজনক। তবে মূল স্ক্রিন লক হিসেবে একটি শক্তিশালী পিন, প্যাটার্ন বা পাসওয়ার্ড থাকা জরুরি। অ্যান্ড্রয়েডেও পিন, প্যাটার্ন বা পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে স্ক্রিন লক সেট করার ব্যবস্থা রয়েছে।
তাই শুধু আঙুলের ছাপ বা মুখ শনাক্তকরণের ওপর নির্ভর না করে একটি শক্তিশালী মূল লক রাখা ভালো।
ব্যাংকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রে কী করবেন?
ফোনের স্ক্রিন লক আর অনলাইন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড এক হওয়া উচিত নয়। ফোনের জন্য একটি শক্তিশালী পিন ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যাংকিংসহ গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন অ্যাকাউন্টে আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত।
একই পাসওয়ার্ড সব অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ। একটি অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ফাঁস হলে অন্য অ্যাকাউন্টগুলোও ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।
সম্ভব হলে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু রাখা ভালো। এতে শুধু পাসওয়ার্ড জানলেই অন্য কেউ সহজে অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারবে না।
ফোন নিরাপদ রাখতে আরও যা করবেন
শুধু শক্তিশালী পিন দিলেই নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় না। ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু অভ্যাস তৈরি করা দরকার।
অপরিচিত কাউকে ফোন আনলক করে দেওয়া উচিত নয়। ফোনে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ইনস্টল না করাই ভালো। অ্যাপ ইনস্টলের আগে সেটি কী কী অনুমতি চাইছে, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।
ফোনের সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ করাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সফটওয়্যার সংস্করণে নিরাপত্তার দুর্বলতা ঠিক করার পাশাপাশি বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করা হয়।
আর ফোন হারিয়ে গেলে যাতে ব্যক্তিগত তথ্য সহজে অন্যের হাতে না যায়, সে জন্য ফোনে স্ক্রিন লক অবশ্যই চালু রাখা উচিত। স্ক্রিন লক না থাকলে ফোনটি কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
ফোনের স্ক্রিন লকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ পাসওয়ার্ডই সবসময় সেরা, এমন ধারণা ঠিক নয়। একটি শক্তিশালী, অনুমান করা কঠিন এবং পর্যাপ্ত দীর্ঘ পিনও ভালো সুরক্ষা দিতে পারে। অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রেও ছয় বা তার বেশি সংখ্যার পিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে ১২৩৪ বা জন্মতারিখের মতো সহজ পিন ব্যবহার করলে সেই সুবিধা আর থাকবে না। আর অনলাইন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে অবশ্যই আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত।
সহজভাবে বললে, ফোনের জন্য শক্তিশালী পিন, অনলাইন অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের নিরাপত্তা এই তিনটি অভ্যাস ডিজিটাল নিরাপত্তা অনেকটাই বাড়াতে পারে।
সূত্র: গুগোল অ্যান্ড্রয়েড হেল্প



