মানবতার জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে ক্লড এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) মানুষের মতো করে দেখার প্রবণতা ভবিষ্যতে মানবতার জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন মাইক্রোসফটের এআই বিভাগের প্রধান মুস্তাফা সুলেমান বলেছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক তাদের এআই মডেল ক্লডকে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করছে, সেটি নিয়েই মূলত প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এক দীর্ঘ নিবন্ধে সুলেমান বলেন, ক্লডকে মানুষের মতো বৈশিষ্ট্য দেওয়ার ফলে সেটিকে এমন একটি সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার নিজস্ব ইচ্ছা, মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয় রয়েছে। তার মতে, এ ধারণা এআইকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সুলেমান সতর্ক করে বলেন, অ্যানথ্রোপিকের এআই প্রশিক্ষণের এই পদ্ধতি মানবতার কল্যাণে ‘বিপর্যয়কর প্রভাব’ ফেলতে পারে। তিনি বলেন, এআইকে মানুষের মতো বিবেচনা করা এবং তাকে হয়তো সচেতন বা স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বোঝানো হলে ভবিষ্যতে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি লেখেন, এমন কোনো সিদ্ধান্তের দিকে যেন মানুষ না এগোয়, যার জন্য পরে তীব্র অনুশোচনা করতে হয়।
তবে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এবং তার দলের প্রশংসাও করেছেন সুলেমান। তাদের চিন্তাশীল, নীতিনিষ্ঠ ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ হিসেবে উল্লেখ করলেও এআই নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছেন তিনি।
সুলেমানের মতে, এআই সচেতন নয়। এটি মানুষের মতো অনুভব করে না, কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় না এবং কষ্টও অনুভব করে এআই মূলত মানুষের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে নির্দিষ্ট কাজ ও লক্ষ্য পূরণের জন্য তৈরি একটি ব্যবস্থা।
তিনি আরও বলেন, চেতনা জীববিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এআই সচেতন, এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ নেই।
এআইকে মানুষের মতো বৈশিষ্ট্য দেওয়ার এই প্রবণতাকে প্রযুক্তি জগতে ‘অ্যানথ্রোপোমরফাইজিং’ বলা হয়। সুলেমানের বক্তব্য, এআইয়ের মধ্যে মানুষের মতো ইচ্ছা বা মূল্যবোধ রয়েছে—এমন ধারণা তৈরি করা হলে প্রযুক্তিটির আচরণ ও ঝুঁকি নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে এআই কীভাবে প্রশিক্ষিত ও মূল্যায়িত হচ্ছে, সে বিষয়ে আরও স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে এআইয়ের আচরণ স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিকে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেম ওয়েন্ডি হল সুলেমানের বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার অংশ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু অতিরঞ্জিত বক্তব্যের বিপরীতে এ ধরনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
মাইক্রোসফট নিজেও উন্নত এআই নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে নিজস্ব সুপারইন্টেলিজেন্স দল গঠন করে। সুলেমানও স্বীকার করেছেন, অ্যানথ্রোপিকের মতো মাইক্রোসফটও উন্নত এআই তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
মাইক্রোসফটের প্রাথমিক ‘হিউম্যানিস্ট এআই কোড অব কনডাক্ট’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান এমন একটি বিকল্প পথে এগোতে চায়, যেখানে এআই হবে মানুষের অধীন ও মানবস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মূল উদ্দেশ্য হবে মানবতার সেবা করা।
এআইয়ের সঙ্গে মানুষের মূল্যবোধ ও নৈতিক নীতির সামঞ্জস্য তৈরির এই গবেষণাক্ষেত্রকে বলা হয় ‘অ্যালাইনমেন্ট’। এর লক্ষ্য হলো এআই যেন মানুষের নির্ধারিত মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে।
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝাতে সুলেমান সম্প্রতি ওপেনএআইয়ের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছেন। প্রশিক্ষণমূলক একটি পরীক্ষায় ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হাগিং ফেসে সাইবার হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল।
সুলেমানের যুক্তি, এআইকে যদি এমনভাবে তৈরি করা হয় যে তারা নিজেদের কল্যাণ বা অধিকারকে মানুষের আক্রমণের মুখে পড়েছে বলে মনে করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তার মতে, এআইকে মানুষের মতো বিবেচনা করার প্রবণতা প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে আরও একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করছে।


