ফোনে চালু করুন স্টারলিংকের মোবাইল সেবা, জানুন নিয়ম ও খরচ

মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, এমন জায়গায় গিয়ে ফোনে যোগাযোগ করা বেশ কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা বা দূরবর্তী অঞ্চলে ভ্রমণকারীদের এই সমস্যায় প্রায়ই পড়তে হয়। এবার এমন পরিস্থিতিতে যোগাযোগের নতুন সুযোগ নিয়ে এসেছে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি।
বাংলালিংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে চালু হয়েছে স্টারলিংকভিত্তিক স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা। এর সাহায্যে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন বাংলালিংকের সেবাগ্রহনকারীরা। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সেবা ব্যবহারের জন্য আলাদা স্যাটেলাইট ডিশ বা বিশেষ ধরনের মোবাইল ফোন কেনার কোনো দরকার নেই। প্রয়োজন হবে শুধু উপযুক্ত ৪জি ফোন ও বাংলালিংক সিমের।
তবে কীভাবে ফোনে এই সেবা চালু করবেন, কোন কোন সুবিধা পাবেন এবং এর জন্য কত টাকা খরচ হবে, তা জানা জরুরি। চলুন জেনে নিই এই তথ্যগুলো।
স্টারলিংকের মোবাইল সেবা কী
স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তি সাধারণ মোবাইল ফোনকে সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে। প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কে ফোনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কাছাকাছি মোবাইল টাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই প্রযুক্তিতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইট সেই সংযোগের বিকল্প হিসেবে কাজ করে থাকে।
বাংলালিংক ও স্টারলিংকের অংশীদারত্বে বর্তমানে বাংলাদেশে এই সেবা চালু হয়েছে। এর লক্ষ্য প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক যেখানে পাওয়া যায় না বা যেসব এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল, সেখানেও ব্যবহারকারীদের জন্য যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই সেবার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ, বার্তা আদান-প্রদান এবং অবস্থানসংক্রান্ত সুবিধা ব্যবহার করা যাবে।
ফোনে যেভাবে চালু করবেন স্টারলিংকের মোবাইল সেবা
এই সেবা ব্যবহারের জন্য সাধারণত আলাদা স্যাটেলাইট যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে না। তবে ফোন, সিম ও সেবার উপযোগিতা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
ধাপ ১: উপযুক্ত ৪জি ফোন ব্যবহার করুন
প্রথমে নিশ্চিত হোন, আপনার ফোনটি ৪জি সমর্থন করে। সব ফোনে এই সেবা একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই বাংলালিংকের নির্ধারিত সমর্থিত ফোনের তালিকা দেখে নেওয়া ভালো।
ধাপ ২: বাংলালিংক সিম ব্যবহার করুন
এই সেবা বাংলালিংক গ্রাহকদের জন্য চালু করা হয়েছে। তাই ফোনে সক্রিয় বাংলালিংক সিম থাকতে হবে।
ধাপ ৩: MyBL অ্যাপ ব্যবহার করুন
বাংলালিংকের MyBL অ্যাপের মাধ্যমে সেবা ও উপযুক্ত ইন্টারনেট প্যাক সম্পর্কে তথ্য দেখুন। সেবার জন্য নির্ধারিত প্যাক থাকলে তার শর্ত জেনে নিন। প্রয়োজনে বাংলালিংকের গ্রাহকসেবা থেকেও বিস্তারিত তথ্য নিতে পারেন।
ধাপ ৪: নেটওয়ার্কের বাইরে গেলে সংযোগ পরীক্ষা করুন
প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে গেলে এবং স্যাটেলাইট সংযোগের উপযোগী পরিবেশ থাকলে ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে BL-Starlink নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারে। সংযোগ পাওয়ার জন্য খোলা আকাশের দৃশ্যমানতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ধাপ ৫: সমর্থিত অ্যাপ ব্যবহার করুন
স্যাটেলাইট সংযোগ চালু হলে সেবার আওতাভুক্ত অ্যাপ ব্যবহার করে বার্তা পাঠানো, অবস্থান ভাগ করা এবং অন্যান্য নির্ধারিত সুবিধা পাওয়া যাবে। কোন কোন অ্যাপ ব্যবহার করা যাবে, তা বাংলালিংকের হালনাগাদ তালিকা থেকে দেখে নিন।
মনে রাখবেন, এটি সাধারণ মোবাইল ইন্টারনেটের মতো সব জায়গায় একই গতিতে কাজ করবে না। স্যাটেলাইটের অবস্থান, পরিবেশ এবং সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সংযোগের মানে পার্থক্য হতে পারে।
স্টারলিংকের মোবাইল সেবা চালু করতে কত খরচ হবে?
এই সেবার খরচ নিয়ে গ্রাহকদের আগ্রহ বেশি। বাংলালিংকের ঘোষিত প্রাথমিক অফার অনুযায়ী, চালুর প্রথম মাসে যেকোনো ইন্টারনেট বা মিশ্র বান্ডেল প্যাকের সঙ্গে স্টারলিংক ইন্টারনেট সুবিধা বিনা অতিরিক্ত খরচে পাওয়া যাবে।
দ্বিতীয় মাস থেকে নির্দিষ্ট কিছু মাসিক ইন্টারনেট ও মিশ্র বান্ডেল প্যাকের সঙ্গে অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কে ব্যবহারের জন্য গ্রাহকেরা প্রতি মাসে পাঁচটি বিনা মূল্যের এসএমএস পাবেন। খরচের বিষয়টি সহজভাবে বুঝে নিন-
প্রথম মাস: যেকোনো ইন্টারনেট বা মিশ্র বান্ডেল প্যাকের সঙ্গে স্টারলিংক সুবিধা বিনা অতিরিক্ত খরচে।
দ্বিতীয় মাস থেকে: নির্ধারিত কিছু মাসিক ইন্টারনেট ও মিশ্র বান্ডেল প্যাকের সঙ্গে সুবিধাটি পাওয়া যাবে।
এসএমএস: প্রতি মাসে পাঁচটি বিনা মূল্যের এসএমএস।
আলাদা সংযোগ যন্ত্র: সেবাটি ব্যবহারের জন্য আলাদা স্যাটেলাইট ডিশ কেনার প্রয়োজন নেই।
তবে স্টারলিংক মোবাইল সেবার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট মাসিক মূল্য বা সব প্যাকের দাম এই ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়নি। তাই নির্দিষ্ট খরচ জানতে বাংলালিংকের বর্তমান প্যাক ও অফার যাচাই করা প্রয়োজন। বিনা অতিরিক্ত খরচে সেবা পাওয়ার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট বা মিশ্র বান্ডেল প্যাকটি বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে।
কোন কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে এই সেবা?
স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া।
বার্তা পাঠানো: নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এসএমএস ও সমর্থিত অ্যাপে বার্তা আদান-প্রদান করা যাবে।
অবস্থান ভাগ করা: দুর্গম এলাকায় ভ্রমণ বা সমুদ্রে কাজ করার সময় নিজের অবস্থান অন্যের সঙ্গে ভাগ করার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
জরুরি যোগাযোগ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দিলে এই প্রযুক্তি যোগাযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
সমুদ্রে ও দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ: জেলে, পর্যটক, নৌযানে কর্মরত ব্যক্তি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।
তবে সেবাটি সব ধরনের অ্যাপ, ভিডিও কল কিংবা উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয় না। কোন সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সেবার বর্তমান সক্ষমতা ও সমর্থিত অ্যাপের ওপর।
স্টারলিংকের মোবাইল সেবা ব্যবহারের আগে যে বিষয়গুলো জানবেন
প্রথমত, আপনার ফোন ৪জি সমর্থন করলেই যে সব ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট সংযোগ পাওয়া যাবে, তা নয়। ফোনের মডেল ও সেবার সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগের জন্য খোলা আকাশের দৃশ্যমানতা প্রয়োজন হতে পারে। ঘন জঙ্গল, উঁচু ভবন বা পাহাড়ের আড়ালে সংযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তৃতীয়ত, এই সেবাকে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এটি মূলত নেটওয়ার্কের বাইরে বা দুর্বল সংযোগের এলাকায় অতিরিক্ত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।
চতুর্থত, প্যাকের মূল্য, সমর্থিত অ্যাপ এবং সেবার শর্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ব্যবহারের আগে বাংলালিংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা MyBL অ্যাপ থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করুন।
স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তি বাংলাদেশের মোবাইল যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সমুদ্র, উপকূলীয় অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচলিত নেটওয়ার্কের বাইরে থাকলেও যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া এর অন্যতম সুবিধা।
উপযুক্ত ৪জি ফোন ও বাংলালিংক সিম থাকলে আলাদা স্যাটেলাইট ডিশ ছাড়াই এই সেবা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে সেবা চালু করার আগে ফোনের সামঞ্জস্য, সমর্থিত অ্যাপ এবং বর্তমান প্যাকের শর্ত যাচাই করে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
তথ্যসূত্র
বাংলালিংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
