logo
Advertisement

বাড়িতে ১০ মিনিটে আইফোন, তবু রাতভর দোকানের সামনে কেন অপেক্ষা

এনডিটিভি
এনডিটিভি
বাড়িতে ১০ মিনিটে আইফোন, তবু রাতভর দোকানের সামনে কেন অপেক্ষা
লাইনে দাঁড়ানোটা গ্রাহকের জন্য কোনো অসুবিধা নয়, বরং এটি অনেকক্ষেত্রে প্রচারণার অংশ। ছবি: এনডিটিভি

আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স কিনতে রাতভর অ্যাপল স্টোরের সামনে অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। অথচ একই ফোন অনলাইনে অর্ডার করে ঘরে বসেই পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের কিছু এলাকায় দ্রুত সরবরাহকারী সেবার মাধ্যমে আইফোন ১৮ মাত্র ১০ মিনিটেও পৌঁছে দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। এরপরও দিল্লি, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন অ্যাপল স্টোরের সামনে ভোরের আগেই দেখা গেছে দীর্ঘ সারি।

বেঙ্গালুরুতে ভোর ৫টার দিকে রাহুল নামের এক ক্রেতা সাংবাদিকদের বলেন, আইফোনের নতুন মডেল হাতে পাওয়া তার কাছে একটি উৎসবের মতো। হরিয়ানা, দিল্লি ও মুম্বাই থেকে আসা অন্য ক্রেতারাও একই ধরনের কথা বলেছেন। তাদের অনেকে প্রতি বছর নতুন আইফোনের বাজারে এলে এভাবে অংশ নেন।

মুম্বাইয়ে এক ক্রেতা আগের রাত ১০টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল সকালে প্রথম দিকেই আইফোন হাতে পাওয়া। তিনি জানান, প্রতি বছর ফোন বদলান এবং এবার আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স থেকে ১৮ প্রো ম্যাক্সে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন হলো, অনলাইনে সহজেই ফোন পাওয়া গেলে এতটা সময় অপেক্ষা করার কারণ কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে শুধু নতুন ফোন হাতে পাওয়ার আগ্রহ কাজ করে না। নতুন পণ্য প্রথম দিনেই কেনা, দোকানের সামনে অপেক্ষা করা, সেই অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা—সব মিলিয়ে এটি অনেকের কাছে আলাদা এক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।

ভারতের বাইরেও আইফোনের নতুন মডেল বিক্রি শুরুর দিনে অ্যাপল স্টোরের সামনে এমন ভিড় দেখা যায়। চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরেও নতুন আইফোনের জন্য ক্রেতাদের আগেভাগে দোকানের সামনে জড়ো হওয়ার ঘটনা দেখা গেছে।

চীনের সাংহাইয়ে পরিস্থিতি আরও বেশি ছিল। অনলাইনে অগ্রিম-বিক্রয় শুরু হওয়ার এক মিনিটের মধ্যেই আইফোনের জনপ্রিয় মডেলগুলোর মজুত শেষ হয়ে যায়। অ্যাপলসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিপুল চাপ তৈরি হয়। ফলে দোকানের সামনে অপেক্ষা করা অনেক ক্রেতা সেদিন সরাসরি ফোন কিনতে পারেননি।

এর মধ্যে অনেকেই নতুন মডেলের আইফোন কিনে ফের বিক্রি করে দেন। অনেকে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেক ফোনের অর্ডার দেওয়ার চেষ্টা করেছে। পরে জনপ্রিয়তা ভেদে এসব আইফোন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে।

নতুন মডেলের আইফোন নিয়ে এ ধরনের বাড়তি উন্মাদনা নতুন নয়। তবে নতুন মডেলের শুরুতে কোন মডেল বা রঙ কতটা পাওয়া যাবে, সেটিও ক্রেতাদের আগ্রহে প্রভাব ফেলে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর সাধারণত সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

অর্থনীতিবিদদের একটি ধারণা হলো, দোকানের সামনে দীর্ঘ সারিও একটি পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে পারে। চোখের সামনে বড় ভিড় তৈরি হলে অন্য মানুষের মধ্যেও পণ্যটি কেনার আগ্রহ তৈরি হয়। ফলে অপেক্ষার ঘটনাটিই এক ধরনের প্রচারে পরিণত হতে পারে।

ক্রাইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিল্লি-এনসিআর ক্যাম্পাসের সহযোগী অধ্যাপক ড. অভিনব পি ত্রিপাঠী এনডিটিভিকে বলেন, অর্থ ও সময় ব্যয় করে কোনো পণ্য কেনার দৃশ্য অনেক সময় সামাজিক অবস্থান প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইনে দাঁড়ানোর ছবি বা ভিডিও প্রকাশের প্রবণতাও এই আচরণকে আরও ভাইরাল করেছে।

এ ক্ষেত্রে আইফোন কেনার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয়টিও যুক্ত হচ্ছে। শুধু নতুন ফোনের মালিক হওয়া এখন অনেকের কাছে যথেষ্ট নয়; প্রথম দিন ফোন হাতে পাওয়া, দোকানের সামনে অপেক্ষা করা এবং সেই মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরাও অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে প্রতি বছর ফোন বদলানোর প্রবণতা বিশ্বজুড়ে আগের তুলনায় কমেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্মার্টফোন ব্যবহারের গড় সময় এখন প্রায় চার বছরের দিকে এগোচ্ছে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের দিকে যেখানে বিশ্বব্যাপী ফোন বদলের গড় সময় ছিল প্রায় ২ দশমিক ৪ বছর, ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি তা বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বছরে পৌঁছেছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান কিস্তি, ইজারা ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ব্যবস্থার দিকেও জোর দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ক্রেতাদের নিয়মিত নতুন ফোন নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

ভারতে আইফোন ১৮ প্রোর দাম শুরু হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯০০ রুপি থেকে। আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সের ২ টেরাবাইটের সর্বোচ্চ সংস্করণের দাম ৩ লাখ ১৪ হাজার ৯০০ রুপি পর্যন্ত। ফলে মাসে ১ লাখ রুপি আয় করা কারও ক্ষেত্রে সবচেয়ে দামি সংস্করণটির মূল্য তিন মাসের বেশি মোট বেতনের সমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিস্তিতে ফোন কেনার ক্ষেত্রে মাসিক পরিশোধের পরিমাণ কম মনে হলেও পণ্যের মোট মূল্য কমে না। বরং বড় অঙ্কের খরচটি দীর্ঘ সময় ধরে পরিশোধ করতে হয়।

ফলে অ্যাপল স্টোরের সামনে রাতভর অপেক্ষা করা মানুষগুলোকে সব আইফোন ব্যবহারকারীর প্রতিনিধি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারা মূলত নতুন মডেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহী ক্রেতা, পুনর্বিক্রেতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতা এবং প্রতি বছর ফোন বদলানোয় অভ্যস্ত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ।

অনলাইনে কয়েক মিনিটে ফোন অর্ডার করা সম্ভব হলেও তাদের কাছে নতুন আইফোনের বাজারে আসার দিনটি তাই শুধু কেনাকাটার দিন নয়। অপেক্ষা, প্রথম হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্য ক্রেতাদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সেই অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ—সব মিলিয়ে এটিই অনেকের কাছে নতুন আইফোন কেনার অভিজ্ঞতার অংশ।