logo

যখন তখন অন্যের ওয়াইফাই ব্যবহার করে ঝুঁকিতে পড়ছেন না তো

যখন তখন অন্যের ওয়াইফাই ব্যবহার করে ঝুঁকিতে পড়ছেন না তো
ছবি: অসি ব্রডব্যান্ড

কোথাও ছুটি কাটাতে গেলে বা বিকেলে আড্ডা দিতে কোনো ক্যাফেতে বসলে সবার আগে আমরা সেখানকার ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ডটা জেনে নিয়ে ঝটপট ফোনটা কানেক্ট করে নিই। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা, রিলস দেখা, অনলাইন ব্যাঙ্কিং বা পেমেন্টের কাজ করা; সবই চলে এই পাবলিক ওয়াইফাইয়ের ভরসায়।

কিন্তু এই যে আমরা বিনামূল্যে রাস্তাঘাটে, শপিং মলে বা হোটেলে পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করছি তা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য কতটা নিরাপদ? হ্যাকারদের খপ্পরে পড়ে ব্যক্তিগত তথ্য লিক হওয়ার কোনো ভয় আছে কি?

পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করতে গিয়ে অজান্তেই আপনি সাইবার অপরাধীদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন না তো? চলুন এইসব বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক:

আগেকার দিনে যখন পাবলিক ওয়াই-ফাই বা হটস্পট কানেক্ট করা হতো, তখন নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল অনেক বেশি। হ্যাকাররা চাইলেই খুব সহজে ইউজারের ব্রাউজিং ডাটা বা পাসওয়ার্ড ট্র্যাক করে ফেলতে পারত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ইন্টারনেট দুনিয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করা হয়েছে।

এখন বেশিরভাগ ওয়েবসাইটই তাদের ভিজিটরদের ডাটা সুরক্ষিত রাখতে এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এই পদ্ধতিটি আপনার পাঠানো বা রিসিভ করা তথ্যগুলোকে এমন এক কোডে পরিণত করে যা হ্যাকাররা চাইলেও সহজে পড়তে বা বুঝতে পারে না। এই পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠেছে।

ওয়াইফাই নিরাপদ কি না বুঝবেন কীভাবে?

আগের তুলনায় নিরাপত্তা বেশি হলেও কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা উচিৎ। পাবলিক প্লেস, হোটেল বা ক্যাফের ওপেন ওয়াইফাই নেটওয়ার্কগুলো হ্যাকারদের প্রধান টার্গেট। অনেক সময় হোটেলের ওয়াইফাইয়ের নামের মতো হুবহু মিল রেখে হ্যাকাররা একটি ভুয়া নেটওয়ার্ক বানিয়ে রাখে, যাকে সাইবার জগতে বলা হয় ‘Evil Twin’ অ্যাটাক। এতে হ্যাকাররা আপনার ফোনের তথ্য ট্র্যাক করার সুযোগ পেয়ে যায়।

তাই পাবলিক প্লেসে ওয়াইফাই কানেক্ট করার আগে বা পরে সেটির সুরক্ষা যাচাই করা জরুরি। এর জন্য বেশ কিছু অ্যাপস ব্যবহার করা হয়-

Fing – Network Tools: নেটওয়ার্কের ‘হেলথ’ স্ক্যান করার জন্য এটি বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়। আপনি যে ওয়াইফাইতে যুক্ত আছেন, সেখানে আর কারা কানেক্টেড আছে, কোনো লুকানো ক্যামেরা বা সন্দেহজনক ডিভাইস আছে কি না; সবকিছু স্ক্যান করে এই অ্যাপ আপনাকে সুরক্ষা নিয়ে আগাম সতর্ক করে দেয়। এটি অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস উভয় প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যায়।

WiFi Analyzer / Network Analyzer: সিগন্যাল কতটা শক্তিশালী তা দেখার পাশাপাশি এটি ওপেন ওয়াইফাইয়ের সিকিউরিটি প্রোটোকল (যেমন- WPA2, WPA3 নাকি একেবারেই আনসিকিউরড) খতিয়ে দেখে। ওয়াইফাইটি যদি কোনো পাসওয়ার্ড ছাড়া একদম খোলা থাকে, তবে এই অ্যাপটি আপনাকে সতর্ক করে দেয়।

Cloudflare 1.1.1.1 (WARP): হোটেল বা এয়ারপোর্টের ওয়াইফাইয়ে কানেক্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই এটি আপনার ফোনের পুরো ডেটা ট্রাফিক এনক্রিপ্ট করে দেয়। আপনার ডিভাইস ও ইন্টারনেটের মাঝে একটি অদৃশ্য সিকিউরিটি টানেল তৈরি করে। ফলে হ্যাকাররা চাইলেও আপনার ডেটা পড়তে পারে না।

আপনার ব্রাউজিং নিরাপদ কি না বুঝে নিন

আপনি যখন কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন, তখন আপনার ডিভাইস থেকে বিভিন্ন তথ্য সেই সাইটে স্থানান্তরিত হয় যার মধ্যে থাকতে পারে আপনার ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের লগইন তথ্য। এখন প্রশ্ন হলো, আপনার কানেকশনটি সিকিউরড বা এনক্রিপ্টেড কি না তা বুঝবেন কীভাবে?

ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারের দিকে একটু তাকালেই বিষয়টি বুঝতে পারবেন-

লক আইকন: ওয়েবসাইটের ঠিক বাম পাশে একটি ছোট লক চিহ্ন দেখতে পাবেন।

HTTPS: ওয়েবসাইটের লিংকটি খেয়াল করলে দেখবেন সেটি http:// দিয়ে না, বরং https:// দিয়ে শুরু হয়েছে।

মোবাইল ব্রাউজারেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। যদিও মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপে সরাসরি এই লোগো বা এড্রেস বার দেখা যায় না। তবে বর্তমানে জনপ্রিয় প্রায় সব মোবাইল অ্যাপই এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে।

অনলাইনে নিজের নিরাপত্তা রক্ষায় কিছু জরুরি টিপস

পাবলিক ওয়াইফাই হোক বা আপনার বাসার ওয়াইফাই, নিরাপদ থাকতে কিছু সাধারণ অভ্যাস গড়ে তোলা খুব জরুরি।

শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন: যেকোনো অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড দেওয়ার সময় সহজ কোনো শব্দ বা জন্মসাল ব্যবহার না করে বড় হাতের ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা আর স্পেশাল ক্যারেক্টার মিলিয়ে একটি শক্তপোক্ত পাসওয়ার্ড তৈরি করুন। সম্ভব হলে সব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA) চালু রাখুন।

সফটওয়্যার ও অপারেটিং সিস্টেম আপডেট রাখুন: আপনার ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম, অ্যান্টিভাইরাস ও ব্রাউজার সবসময় আপডেট রাখুন। একইভাবে আপনার স্মাটফোনের অপারেটিং সিস্টেমের আপডেটগুলোর প্রতিও নজর দিন। সবচেয়ে ভালো হয় ডিভাইসে অটো আপডেট অপশনটি অন করে রাখলে। এতে নিজে থেকেই সব লেটেস্ট সিকিউরিটি প্যাচ ইন্সটল হয়ে যায়।

অটো-কানেক্ট বন্ধ রাখুন: আপনার ফোনের সেটিংস থেকে ‘Auto-Join Wi-Fi’ অপশনটি বন্ধ রাখুন। তা না হলে রাস্তাঘাট বা অচেনা জায়গায় কোনো পরিচিত নামের ওপেন নেটওয়ার্ক পেলেই আপনার ফোন নিজে থেকেই তাতে যুক্ত হয়ে যাবে।

প্রতারকদের চেনার উপায়: হ্যাকার বা স্ক্যামাররা নানা ফন্দি আঁটে। তারা অনেক সময় পরিচিত কোনো বড় কোম্পানির প্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তা সেজে সাধারণ মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করে। এমনকি তারা এনক্রিপ্টেড ভুয়া ওয়েবসাইটও তৈরি করে যাতে সাধারণ মানুষ ভাবে সাইটটি একদম নিরাপদ।

কিন্তু মনে রাখবেন, স্ক্যামারদের তৈরি করা সাইটে আপনার ডাটা এনক্রিপ্ট হয়ে সার্ভারে পৌঁছালেও সেই সাইটের নিয়ন্ত্রণকারীদের হাত থেকে আপনার তথ্য নিরাপদ থাকবে না। তাই অপরিচিত বা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করার আগে সবসময় সতর্ক থাকুন।

পাবলিক ওয়াইফাই আমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে ঠিকই, তবে একটু অসাবধানতা বড় ধরনের সাইবার বিপদের কারণ হতে পারে। তাই কফি শপ বা হোটেলের ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সময় একটু সচেতন হোন। সুরক্ষিত ব্রাউজিং নিশ্চিত করে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখুন।

সূত্র: FTC Consumer Advice, TV9 Bangla