logo

কিবোর্ডে ABCD পাশাপাশি না থাকার কারণ কী, ১৫০ বছরের রহস্য জানুন

কিবোর্ডে ABCD পাশাপাশি না থাকার কারণ কী, ১৫০ বছরের রহস্য জানুন
ছবি: ওয়ার্ড

কম্পিউটার, ল্যাপটপ কিংবা মোবাইল ফোন, যেখানেই টাইপ করতে যাই, কিবোর্ডের প্রথম সারিতে চোখে পড়ে QWERTY। অথচ ইংরেজি বর্ণমালা তো শুরু হয় ABCD দিয়ে। তাহলে কিবোর্ডে অক্ষরগুলো বর্ণানুক্রমে সাজানো হলো না কেন?

প্রথমবার কিবোর্ড দেখলে বিষয়টি বেশ অদ্ভুতই মনে হয়। A-এর পাশে B বা C নেই, বরং উপরের সারির শুরুতেই রয়েছে Q, W, E, R, T, Y। এই অদ্ভুত বিন্যাসের পেছনে রয়েছে প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো টাইপরাইটারের ইতিহাস।

আর মজার বিষয় হলো, আজকের কম্পিউটার কিবোর্ডে যে বিন্যাস ব্যবহার করছি, তার মূল নকশা তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন কম্পিউটার তো দূরের কথা, ইলেকট্রনিক কিবোর্ডের কথাই ভাবা হয়নি।

শুরুতে কিবোর্ডে অক্ষরগুলো ABCD অনুযায়ীই ছিল।

QWERTY সব সময় ছিল না। ১৮৬০-এর দশকে মার্কিন উদ্ভাবক ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলস এবং তার সহযোগীরা টাইপরাইটার তৈরির কাজ শুরু করেন। তাদের প্রাথমিক মডেলগুলোর কিবোর্ডে অক্ষরগুলো অনেকটাই বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো ছিল।

শোলসের তৈরি প্রথম দিকের টাইপরাইটার ছিল বেশ প্রাথমিক ধরনের। প্রতিটি কী (key) চাপলে তার সঙ্গে যুক্ত একটি ধাতব টাইপবার নড়ে গিয়ে কাগজে নির্দিষ্ট অক্ষর ছাপত।

সমস্যা শুরু হতো দ্রুত টাইপ করার সময়।


টাইপরাইটারে কী আটকে যেত?

পুরনো টাইপরাইটারে প্রতিটি অক্ষরের জন্য আলাদা ধাতব টাইপবার ছিল। কোনো ব্যক্তি খুব দ্রুত একের পর এক কাছাকাছি অক্ষরের কী চাপলে টাইপবারগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আটকে যেতে পারত।

এতে টাইপ করা বন্ধ হয়ে যেত এবং ব্যবহারকারীকে হাতে করে আটকে যাওয়া অংশ ঠিক করতে হতো।

প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সমস্যা কমাতেই শোলস ও তার সহযোগীরা অক্ষরের অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকেন। কাছাকাছি ব্যবহৃত কিছু অক্ষরকে দূরে সরিয়ে দিয়ে টাইপবারের সংঘর্ষ কমানোর চেষ্টা করা হয়।

ধীরে ধীরে বিভিন্ন নকশা পরীক্ষা করে তৈরি হয় আজকের পরিচিত QWERTY বিন্যাস।

তাহলে কি শুধু টাইপরাইটার জ্যাম ঠেকাতেই QWERTY?

এখানেই ইতিহাসের মজার অংশ।

QWERTY তৈরির সবচেয়ে পরিচিত ব্যাখ্যা হলো, দ্রুত টাইপ করার কারণে টাইপরাইটারের টাইপবার আটকে যাওয়ার সমস্যা কমানোর জন্য অক্ষরগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের জাতীয় আমেরিকান ইতিহাস জাদুঘরও (National Museum of American History) QWERTY বিন্যাসকে টাইপবারের সংঘর্ষ কমানোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তবে সব ইতিহাসবিদ এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।

ছবি: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন
ছবি: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

কিছু গবেষকের মতে, কিবোর্ডের বিন্যাস তৈরিতে টেলিগ্রাফ অপারেটরদের কাজের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তখন টেলিগ্রাফ অপারেটরদের মর্স কোডে আসা বার্তা দ্রুত লিখিত অক্ষরে রূপান্তর করতে হতো। বর্ণানুক্রমিক কিবোর্ডে এই কাজ সব সময় সহজ ছিল না।

তাই টেলিগ্রাফ অপারেটরদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনও QWERTY তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছিল বলে কিছু গবেষক মনে করেন। স্মিথসোনিয়ানের ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণেও এই মতভেদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ QWERTY কেন ঠিক এইভাবে সাজানো হয়েছিল, তার একক ও সর্বসম্মত উত্তর এখনো নেই।

QWERTY নামটি এল কোথা থেকে?

QWERTY নামটি আসলে খুব সহজ। কিবোর্ডের উপরের সারির বাম দিকের প্রথম ছয়টি অক্ষর হলো Q, W, E, R, T এবং Y। এই ছয়টি অক্ষর একসঙ্গে নিয়ে তৈরি হয়েছে QWERTY নামটি।

এটি কোনো বিশেষ শব্দ নয়। কিবোর্ডের অক্ষর বিন্যাস থেকেই নামটি এসেছে।

১৮৭০-এর দশকে এল পরিচিত QWERTY

বিভিন্ন পরীক্ষার পর ১৮৭০-এর দশকে QWERTY বিন্যাস ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়।

শোলস ও তার সহযোগীদের তৈরি টাইপরাইটার বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার দায়িত্ব নেয় E. Remington & Sons। ১৮৭৪ সালে Sholes & Glidden Type Writer বাজারে আসে। এই যন্ত্রই QWERTY বিন্যাসকে বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরে Remington-এর টাইপরাইটার জনপ্রিয় হতে শুরু করলে QWERTY-ও ক্রমে পরিচিত মানে পরিণত হয়।

উইসকনসিন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, Sholes & Glidden টাইপরাইটারের প্রথম দিকের মডেলেই পরিচিত QWERTY বিন্যাস ছিল।

কম্পিউটার আসার পরও কেন বদলাল না?

এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কম্পিউটারের কিবোর্ডে তো ধাতব টাইপবার নেই। ফলে পুরনো টাইপরাইটারের মতো কোনো যান্ত্রিক অংশ আটকে যাওয়ার ভয়ও নেই। তাহলে QWERTY কেন রয়ে গেল?

এর উত্তর হলো অভ্যাস এবং ব্যাপক ব্যবহার।

কম্পিউটার আসার আগেই লক্ষ লক্ষ মানুষ টাইপরাইটারে QWERTY ব্যবহার করে টাইপ করতে শিখেছিলেন। অফিস, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এই বিন্যাস প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল।

ফলে নতুন কম্পিউটার কিবোর্ডে সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিন্যাস চালু করলে মানুষকে আবার নতুন করে টাইপ শেখাতে হতো।

একে অর্থনীতির ভাষায় পথনির্ভরতা বা path dependence বলা যায়। কোনো একটি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হতে হতে এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে বিকল্প ব্যবস্থা হয়তো কিছু ক্ষেত্রে ভালো হলেও পুরনো ব্যবস্থাকে সরানো কঠিন হয়ে পড়ে।

QWERTY কি সবচেয়ে দ্রুত টাইপ করার কীবোর্ড?

অবশ্যই এমন নয়।

QWERTY-এর বিকল্প হিসেবে পরবর্তীকালে বিভিন্ন কিবোর্ড বিন্যাস তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে Dvorak Simplified Keyboard বেশ পরিচিত। এতে বেশি ব্যবহৃত অক্ষরগুলো এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে যাতে আঙুলের কম নড়াচড়া করে দ্রুত টাইপ করা যায়।

কিন্তু ভালো বিকল্প তৈরি হলেই মানুষ সেটি ব্যবহার শুরু করবে, এমনটা হয়নি। কারণ তখন পর্যন্ত QWERTY মানুষের অভ্যাস, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।

ফলে QWERTY-কে সরিয়ে দেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

মোবাইলেও কেন QWERTY?

স্মার্টফোনের পর্দায় তো কোনো টাইপবার নেই। সেখানে QWERTY ব্যবহারের পেছনেও একই কারণ কাজ করে।

মানুষ দীর্ঘদিন ধরে QWERTY-তে টাইপ করতে অভ্যস্ত। তাই স্মার্টফোনে একেবারে নতুন অক্ষর বিন্যাস দিলে ব্যবহারকারীদের নতুন করে অভ্যাস করতে হতো।

এ কারণে ভার্চুয়াল কিবোর্ডেও QWERTY বিন্যাস রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ ১৯ শতকের টাইপরাইটারের জন্য তৈরি হওয়া একটি নকশা ২১ শতকের স্মার্টফোনেও টিকে আছে মূলত মানুষের অভ্যাস ও দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক ইতিহাসের কারণে।

QWERTY কি একমাত্র কিবোর্ড বিন্যাস?

না। QWERTY সবচেয়ে পরিচিত হলেও এটিই একমাত্র কিবোর্ড বিন্যাস নয়।

Dvorak-এর পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা ও দেশের জন্য আলাদা কিবোর্ড বিন্যাস রয়েছে। ফরাসি ভাষায় AZERTY এবং জার্মান ভাষাভাষী অঞ্চলে QWERTZ বিন্যাস ব্যবহৃত হয়।

এগুলো থেকে বোঝা যায়, কিবোর্ডের অক্ষর সাজানোর কোনো একটিমাত্র সর্বজনীন নিয়ম নেই।

শোলস নিজেও কি QWERTY-কে সেরা মনে করতেন?

এখানেও রয়েছে মজার তথ্য। Christopher Latham Sholes নিজেও পরবর্তী সময়ে কিবোর্ডের আরও কিছু বিন্যাস নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি নিজে QWERTY-কে চূড়ান্ত ও নিখুঁত নকশা হিসেবে দেখেছিলেন, এমন নয়।

কিন্তু একবার একটি বিন্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করলে সেটিকে বদলানো কঠিন হয়ে যায়।

আজকের কিবোর্ডের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।

১৫০ বছর পরও কেন QWERTY টিকে আছে?

QWERTY-এর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং এর দীর্ঘদিনের ব্যবহার।

একজন মানুষ QWERTY শেখেন। এরপর স্কুল, কলেজ, অফিস, কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং মোবাইল ফোনে একই বিন্যাস ব্যবহার করেন। নতুন প্রজন্মও আগের প্রজন্মের কাছ থেকে একই ব্যবস্থা শেখে।

এভাবে একটি নকশা শুধু একটি প্রযুক্তির অংশ থাকে না, বরং মানুষের অভ্যাসের অংশ হয়ে যায়।

আজ আমরা যে কিবোর্ডে স্বাভাবিকভাবে টাইপ করি, সেটির মূল নকশা তৈরি হয়েছিল প্রায় দেড় শতাব্দী আগে।

কিবোর্ডে ABCD-এর বদলে QWERTY থাকার পেছনে রয়েছে টাইপরাইটারের যুগের প্রযুক্তিগত সমস্যা, নকশা নিয়ে বহু পরীক্ষা এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক ইতিহাস।

টাইপরাইটারের টাইপবার আটকে যাওয়ার সমস্যা কমানো QWERTY তৈরির অন্যতম প্রচলিত ব্যাখ্যা। তবে টেলিগ্রাফ অপারেটরদের প্রয়োজনও এই বিন্যাস তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল বলে গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন। তাই এর ইতিহাসকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে নকশা তৈরি হয়েছিল ১৯ শতকের যান্ত্রিক টাইপরাইটারের জন্য, সেটিই আজ কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনে আমাদের প্রতিদিনের টাইপিংয়ের ভিত্তি।

অর্থাৎ কিবোর্ডের QWERTY শুধু কিছু এলোমেলো অক্ষরের সমষ্টি নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রযুক্তির ইতিহাস, মানুষের অভ্যাস এবং প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এক নকশার গল্প।

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন