logo

এআই যেভাবে আমাদের মনের কথা পড়তে শিখছে

এআই যেভাবে আমাদের মনের কথা পড়তে শিখছে

মানব মস্তিষ্কে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য স্নায়ুকোষে বিদ্যুতের ক্ষুদ্র সংকেত আদান-প্রদান হয়। এতদিন এই জটিল সংকেতের অর্থ বোঝা ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) সেই অসম্ভবকে ধীরে ধীরে সম্ভব করে তুলছে।

৫২ বছর বয়সি এক নারী, যিনি ১৯ বছর আগে স্ট্রোকের কারণে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন, স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারতেন না। সম্প্রতি একটি গবেষণায় তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড বসানো হয়। তিনি মনে মনে কথা ভাবছিলেন, আর কম্পিউটার সেই স্নায়ু সংকেত বিশ্লেষণ করে পর্দায় বাক্য হিসেবে তুলে ধরছিল। যে কথা তিনি মুখে বলতে পারতেন না, তা চোখের সামনে লেখা হয়ে উঠছিল।

এই গবেষণাটি হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (Stanford University)-এ। একই গবেষণায় অংশ নেন আরও কয়েকজন রোগী, যারা অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস বা এএলএস রোগে ভুগছেন। এই রোগে মূলত ধীরে ধীরে পেশি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে যায়। এ গবেষণার লক্ষ্য ছিল মনের চিন্তাকে সরাসরি রিয়েল টাইমে লেখায় রূপান্তর করা।

ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস কী

মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে এমন যন্ত্রকে বলা হয় ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই। এই ধারণা নতুন নয়। ১৯৬৯ সালে মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ইবারহার্ড ফেটজ (Eberhard Fetz) দেখান, বানরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মস্তিষ্কের একক নিউরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে একটি সূচক সরানো সম্ভব। একই সময়ে স্পেনের বিজ্ঞানী হোসে  দেলগাদো  (Jose Delgado) দূর থেকে একটি ষাঁড়ের মস্তিষ্কে উদ্দীপনা দিয়ে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষাও করেন।

দীর্ঘদিন ধরে বিসিআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম হাত নাড়ানো বা কম্পিউটারের কার্সর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মস্তিষ্কের ভাষা বা জটিল চিন্তা সরাসরি পড়া ছিল অনেক কঠিন।

মনের ভাষা থেকে লেখা

২০২১ সালে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখান, পক্ষাঘাতে আক্রান্ত এক ব্যক্তি কল্পনায় আকাশে হাত দিয়ে অক্ষর আঁকার কথা ভাবলে তা লেখায় রূপান্তর করা যায়। তিনি প্রতি মিনিটে ১৮টি শব্দ লিখতে সক্ষম হন।

মানুষ স্বাভাবিকভাবে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৫০টি শব্দ বলতে পারে। তাই পরবর্তী লক্ষ্য ছিল মস্তিষ্কের ভাষা-সংকেত সরাসরি বিশ্লেষণ করা। ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মৈত্রেয়ী ওয়াইরাগকর ও তার দল একজন এএলএস রোগীর মনে মনে বলার চেষ্টা করা শব্দকে সরাসরি লেখায় রূপ দেন। প্রায় ৩২টি শব্দ প্রতি মিনিটে এবং ৯৭.৫ শতাংশ নির্ভুলতায় এটি সম্ভব হয়।

এই প্রযুক্তিতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড বসানো হয়। এগুলো নিউরনের সংকেত সংগ্রহ করে। এরপর মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম সেই সংকেতের ভেতরে থাকা ধরণ বা প্যাটার্ন চিনে নেয়। যেমন স্মার্ট সহকারী শব্দ শুনে অর্থ বোঝে, তেমনি এখানে এআই স্নায়ু সংকেত বুঝে ভাষা তৈরি করে।

ভেতরের কথা ধরা কতটা সম্ভব

সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেছেন শুধু বলার চেষ্টা নয়, বরং একেবারে মনের ভেতরের নীরব কথা বা ইনার স্পিচ ধরতে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৪ শতাংশ নির্ভুলতায় মনের বাক্য ধরা সম্ভব হয়েছে। তবে একেবারে খোলা প্রশ্নে নির্ভুলতা কমে যায়। অর্থাৎ প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি নির্ভুল নয়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মনে মনে কথা বলা এবং বাস্তবে বলার চেষ্টা করার সময় মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্সে প্রায় একই ধরনের স্নায়ু কার্যকলাপ হয়, যদিও মনের কথার সংকেত তুলনামূলক দুর্বল।

শুধু শব্দ নয়, আবেগও

২০২৫ সালে গবেষকেরা দেখান, শুধু শব্দ নয়, কণ্ঠের ওঠানামা, জোর, গতি ও ছন্দও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এতে রোগীরা প্রশ্নের সুরে কথা বলা বা সুর করে গান গাওয়ার মতো অভিব্যক্তিও প্রকাশ করতে পারেন। যদিও এখনো শতভাগ নিখুঁত নয়, তবুও এটি বড় অগ্রগতি।

মস্তিষ্কে দেখা ছবি পুনর্গঠন

মনের কথা ছাড়াও বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন মানুষ যা দেখছে তা পুনর্গঠন করতে। জাপানের নাগোয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক ইউ তাকাগি ২০২৩ সালে একটি গবেষণায় এআই ব্যবহার করে ব্রেইন স্ক্যান থেকে ছবি পুনর্গঠন করেন। এখানে ব্যবহার করা হয় উন্নত এআই ইমেজ জেনারেটর Stable Diffusion।

ফাংশনাল এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে এআই অনুমান করে মানুষ কী ছবি দেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে ছবির মোটামুটি মিল পাওয়া গেছে।

সঙ্গীতও কি পড়া সম্ভব

২০২৫ সালে তাকাগির আরেক গবেষণায় দেখা যায়, মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণ করে শোনা সঙ্গীতের ধরন অনুমান করা সম্ভব। যদিও এটি ছবির তুলনায় বেশি কঠিন, তবুও সঙ্গীতের মৌলিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, মস্তিষ্কে ছবি ও সংগীত প্রক্রিয়াকরণের ধরন ভিন্ন।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে। আরও বেশি নিউরন থেকে তথ্য সংগ্রহ করা গেলে নির্ভুলতা বাড়বে। এতে স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সহজে যোগাযোগ করতে পারবেন।

তবে এর সঙ্গে রয়েছে নৈতিক প্রশ্নও। মানুষের মনের গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে তথ্য নেওয়া হলে তা কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মানুষের নীরব চিন্তাকেও ভাষায় রূপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটি বাকশক্তিহীন মানুষের জন্য নতুন আশার দরজা খুলছে। একই সঙ্গে এটি আমাদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি করছে।

তবে প্রযুক্তি যতই শক্তিশালী হোক, মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনায় রাখতে হবে। সঠিক নীতিমালা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এআইভিত্তিক ব্রেইন-কম্পিউটার প্রযুক্তি ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

সূত্র : বিবিসি