ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে চাঁদ, বিজ্ঞানীরা জানালেন কী ঘটবে পৃথিবীতে

পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের মহাজাগতিক প্রতিবেশী চাঁদ আমাদের গ্রহের জন্য এক অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শুধু রাতের আকাশকে আলোকিত করে না, বরং পৃথিবীর জলবায়ু, ঋতু এবং সমুদ্রের জোয়ার নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
চাঁদ পৃথিবীর অক্ষের ঢাল স্থিতিশীল রাখে, যা আমাদের ঋতুগত পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া সমুদ্রের জোয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করতেও এটি সাহায্য করে।
কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি আশ্চর্যজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। গবেষণা বলছে চাঁদ ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে। এর ভেতরের অংশ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হওয়ার ফলে চাঁদের পৃষ্ঠ সংকুচিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে চলছিল, কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে সংকোচনের হার আগের চেয়ে বেশি হতে পারে। যদি চাঁদ কখনো হারিয়ে যায়, পৃথিবীর জীবনের ওপর প্রভাব হতে পারে অত্যন্ত গভীর।
চাঁদ ছোট হচ্ছে কিভাবে
জাতীয় বায়ু ও মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের (National Air and Space Museum) গবেষকরা বলছেন, চাঁদের অভ্যন্তরীণ তাপ ধীরে ধীরে কমার কারণে এর ভিতরের অংশ সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকোচন চাঁদের পৃষ্ঠের খোলককে ভাঁজ তৈরি করতে এবং চাপে ফেলার কারণে চাঁদ ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে।
থমাস আর ওয়াটার্স (Thomas R Watters) গবেষণা কেন্দ্রের সিনিয়র বিজ্ঞানী ২০১০ সালে প্রথম প্রমাণ দেখিয়েছিলেন যে, চাঁদ ভৌগোলিক সময়ের সাথে সাথে ছোট হচ্ছে। নতুন গবেষণা অনুযায়ী, এই সংকোচনের হার পূর্বের অনুমানের চেয়ে বেশি হতে পারে।
চাঁদ না থাকলে যা হতে পারে
বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ তাড়াতাড়ি অদৃশ্য হবে না। তবে যদি হারিয়ে যায়, পৃথিবীর জন্য তার প্রভাব হবে গভীর। চাঁদ পৃথিবীর অক্ষের ঢাল স্থিতিশীল রাখে, সমুদ্রের জোয়ার নিয়ন্ত্রণ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুকে প্রভাবিত করে।
চাঁদ না থাকলে, পৃথিবীতে হতে পারে :
- চরম জলবায়ু পরিবর্তন
- ঋতুতে অস্থিরতা
- জোয়ারের প্রভাব কমে যাওয়া
- জীবনের জন্য মৌলিক পরিবর্তন
৯০০ বছর আগে একটি ঘটনা ছিল যা চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো দেখিয়েছিল। ১১১০ সালের ‘পিটারবোরো ক্রনিকল’ অনুযায়ী, একটি রাত চাঁদ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, যা বৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট এবং খাদ্য অভাবের সৃষ্টি করেছিল। পরে গবেষকরা এটিকে একটি আগ্নেয়গিরির কারণে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে সালফার সমৃদ্ধ কণার আড়ালে চাঁদ চলে গিয়েছিল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
চাঁদে সংকোচনের প্রমাণ
চাঁদ ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পৃষ্ঠে ছোট্ট পাহাড়ের মতো টেকটোনিক বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়, যাকে বলা হয় লোবেট স্কার্প (lobate scarps)। এছাড়া ছোট মেরে রিজ (small mare ridges) চাঁদের বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে, যা নির্দেশ করে যে চাঁদ এখনও সূক্ষ্ম ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই বৈশিষ্ট্যগুলো ভূতাত্ত্বিকভাবে নতুন। এরা চাঁদের ভিতরের কাঠামো এবং চাঁদভূমিকম্পের (moonquake) উৎস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষক কোল নাইপাভার (Cole Nypaver) বলেন, ‘অ্যাপোলো যুগ থেকে আমরা চাঁদের উচ্চভূমিতে লোবেট স্কার্পগুলো সম্পর্কে জানি।’ নতুন গবেষণা দেখায় যে, এই কাঠামোগুলো চাঁদের সমভূমিতেও বিস্তৃত, যা চাঁদের অভ্যন্তরীণ ইতিহাসের নতুন দিক উন্মোচন করছে।
চাঁদ ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে এবং এর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন চলতেই থাকবে। যদিও এটি এখনো অদৃশ্য নয়, কিন্তু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, চাঁদের অভাব পৃথিবীর জলবায়ু, ঋতু এবং সমুদ্রের জোয়ারে বিপর্যয় আনতে পারে। চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর জীবন যাত্রার জন্য তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সূত্র : সায়েন্স ডেইলি