ট্রেন ভ্রমণে ভোগান্তি কমাতে দেশীয় তরুণের উদ্ভাবন ‘বিডি ট্রেন ট্র্যাকিং’ অ্যাপ

ট্রেন ভ্রমণে নানাভাবে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। কখনও ট্রেন ছাড়ে দেরিতে, কখনও আবার লাইনচ্যুত হয়ে চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয় যাত্রীদের। এই ভোগান্তির কথা ভেবেই দেশীয় তরুণের উদ্ভাবন ট্রেনের লাইভ ট্র্যাকার অ্যাপ।
‘বিডি ট্রেন ট্র্যাকিং’ বাংলাদেশের ট্রেনের লাইভ অবস্থান জানার একটি কমিউনিটি-চালিত মোবাইল অ্যাপ। এই অ্যাপে ট্রেনে থাকা যাত্রীরা নিজেদের অবস্থান শেয়ার করেন, আর তা থেকে অন্য সবাই জানতে পারেন ট্রেনটি এই মুহূর্তে কোথায়, কত গতিতে চলছে, পরবর্তী স্টেশন কোনটি এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কত দেরিতে চলছে।
স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রী, প্রিয়জনকে আনতে যাওয়া মানুষ কিংবা ট্রেনে থাকা যাত্রী; সবার জন্যই অ্যাপটি অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এটি পাওয়া যাচ্ছে।
অ্যাপটি তৈরি করেছেন মো. আল আমিন; যিনি গতিশীল ভেঞ্চারস নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। অ্যাপটির পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণ; শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সবই তিনি নিজে করেছেন।
ধারণার জন্ম যেভাবে
আল আমিন বলেন, ‘ট্রেনে ভ্রমণ করতে আমি খুব ভালোবাসি। জানালার পাশে বসে দেশের মাঠ-ঘাট, নদী আর গ্রাম দেখতে দেখতে যাওয়ার আনন্দ অন্য কোনো যানবাহনে পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রায়ই একটি দৃশ্য আমাকে কষ্ট দিত তা হলো- ট্রেন অনেক দেরিতে চলত, আর স্টেশনে শত শত মানুষ অপেক্ষা করত। কেউ জানেন না ট্রেনটি এখন কোথায়, কখন আসবে।’
এমন অনিশ্চয়তায় মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। কেউ সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারেন না, কেউ পরীক্ষা বা চাকরির সাক্ষাৎকারে দেরি করে ফেলেন, কেউ হারান জরুরি কাজ বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো মুহূর্ত।
‘তখন ভাবলাম, ট্রেনে থাকা যাত্রীরাই যদি নিজেদের অবস্থান শেয়ার করেন, তাহলে অপেক্ষায় থাকা সবাই জানতে পারবেন ট্রেনটি কোথায় আছে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের সময় পরিকল্পনা করতে পারবেন। সেই ভাবনা থেকেই বিডি ট্রেন ট্র্যাকিং; যাত্রীদের দ্বারা, যাত্রীদের জন্য’, বলেন তিনি।
অ্যাপে যা যা আছে
ট্রেনের অবস্থান ও সময়: অ্যাপে মানচিত্রে ট্রেনের বর্তমান অবস্থান, গতি, পরবর্তী স্টেশন ও বিলম্ব দেখা যায়। এই মুহূর্তে দেশে কোন কোন ট্রেন চলছে, তা এক তালিকায় ও এক মানচিত্রে দেখা। স্যাটেলাইট মানচিত্রে ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে চলার অভিজ্ঞতা। পুরো যাত্রাপথ, প্রতিটি স্টেশনে সম্ভাব্য পৌঁছানোর সময় ও বিলম্ব। আগামী এক ঘণ্টায় কোন ট্রেন আপনার স্টেশনে আসছে, প্ল্যাটফর্মসহ। নাম, নম্বর বা দুই স্টেশনের মধ্যে খোঁজা যায়; এমনকি কথা বলেও।
যাত্রীদের কমিউনিটি
ট্রেন চ্যাট: একই ট্রেনের যাত্রীরা সরাসরি একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, ট্রেন কোথায় আটকে আছে, কত দেরি হবে, কোন বগিতে ভিড় কম, প্ল্যাটফর্ম বদল হয়েছে কি না। স্টেশনে অপেক্ষমাণ কেউ প্রশ্ন করলে ট্রেনে থাকা যাত্রীরাই উত্তর দেন। প্রতিদিন অ্যাপে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার চ্যাট বার্তা আদান-প্রদান হয়। নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে মডারেটর রয়েছেন, এবং যেকোনো আপত্তিকর বার্তা রিপোর্ট বা ব্যবহারকারীকে ব্লক করার সুবিধা আছে।
হারানো ও পাওয়া: ট্রেনে বা স্টেশনে হারানো কিংবা খুঁজে পাওয়া জিনিসের খবর দেওয়া যায়, যাতে জিনিসটি মালিকের কাছে ফিরে যায়।
রিওয়ার্ড: অবস্থান শেয়ার করে অন্যদের সাহায্য করলে পয়েন্ট পাওয়া যায়, আর লিডারবোর্ডে শীর্ষে থাকা ব্যবহারকারীরা প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার সুযোগ পান।
আরও আছে প্ল্যাটফর্মে কোন বগি কোথায় থামবে, কোন স্টেশনে কী সুবিধা আছে, যাত্রীদের দেওয়া তথ্যসহ। ট্রেনে, প্ল্যাটফর্মে ও রেললাইনের পাশে নিরাপদ থাকার পরামর্শ। নামাজ ও ইফতারের সময়।
আল আমিন বলেন, ‘যাত্রীদের কাছ থেকে আমরা অসাধারণ সাড়া পেয়েছি। ৫ লাখেরও বেশি ব্যবহারকারী এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার চ্যাট বার্তা তারই প্রমাণ।’
প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী স্বেচ্ছায় নিজেদের অবস্থান শেয়ার করে অচেনা মানুষদের সাহায্য করছেন যা অত্যন্ত আনন্দের বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অ্যাপটির প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘ট্রেন চ্যাটে দেখি, স্টেশনে অপেক্ষমাণ কেউ জানতে চাইছেন ট্রেন কোথায়, আর ট্রেনে থাকা কোনো যাত্রী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিচ্ছেন। মানুষের এই পারস্পরিক সহযোগিতাই অ্যাপটির আসল শক্তি।’
অ্যাপটির বিষয়ে জানতে চাইলে আল আমিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ট্রেনের দেরিতে যখন দেখি মানুষ স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছেন, অফিস বা জরুরি কাজ হারাচ্ছেন, তখন খুব খারাপ লাগে। ট্রেন দেরিতে চলবে কি না, তা আমাদের হাতে নেই; কিন্তু মানুষ যেন অন্তত জানতে পারেন তার ট্রেনটি এখন কোথায়, সেই কাজটুকু আমরা করতে পারি। একজন যাত্রীর একটি ছোট্ট শেয়ার শত শত মানুষের সময় বাঁচিয়ে দেয়। আমাদের লক্ষ্য, দেশের প্রতিটি ট্রেনযাত্রী যেন সময় বাঁচিয়ে, দুশ্চিন্তা ছাড়া যাতায়াত করতে পারেন।’
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আরও বেশি যাত্রীকে যুক্ত করে দেশের প্রতিটি রুটে আরও নির্ভুল লাইভ তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ট্রেন পৌঁছানোর সময়ের পূর্বাভাস আরও নির্ভরযোগ্য করা এবং যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সেবা যুক্ত করার লক্ষ্যও রয়েছে।

