বৃষ্টি-কালবৈশাখী-ঘূর্ণিঝড় ঘিরে মে মাসে যেমন থাকবে আবহাওয়া

ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বিভাগে গত এক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাত অব্যাহত রয়েছে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমে স্বস্তি মিললেও বজ্রপাতে ইতোমধ্যে অন্তত ৫৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বজ্রপাতের জন্য আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও কমছে না মৃত্যু। যদিও আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে মানুষ যে এখন বেশ উদগ্রীব সেটি গুগল সার্চেই প্রমাণ হয়। কারণ, গুগল ট্রেন্ডিংয়ের শীর্ষেই রয়েছে আবহাওয়া ও বৃষ্টি সম্পর্কে মানুষের নানা প্রশ্ন।
এ অবস্থায় নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের আট বিভাগের ওপর দিয়ে দমকা হাওয়া, বজ্রপাত ও ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে।
তবে আগামী ১০ দিনের মধ্যে আপাতত বঙ্গোপসাগরে কোনো লঘুচাপ তৈরি এবং ঘূর্ণিঝড় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। তবে সাগরে তীব্র গতির বাতাস থাকার কারণে সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
কিন্তু মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মুহাম্মাদ আবুল কালাম মল্লিক।
এপ্রিল এবার অনেকটাই সহনশীল
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, এপ্রিল মাসে সাধারণত গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক দুই ডিগ্রি। কখনও কখনও এই তাপমাত্রা বেড়ে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করে এই মাসে।
তবে এবার শুধুমাত্র একবারই ২২ এপ্রিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল বলে জানান আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক।
তিনি বলেন, এরপরে এখন যে তাপমাত্রা বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে তা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। আপাতত তাপপ্রবাহ নাই। গরমের অনুভূতির তীব্রতাও কম। উচ্চ তাপমাত্রার ক্রুয়েলেস্ট এপ্রিল মাস এবার অনেকটাই সহনশীল। এবার এপ্রিল মাসের গড় তাপমাত্রা অনেকটাই সহনশীল এবং স্বস্তিদায়ক এপ্রিল মাস পেয়েছি আমরা।
সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে এই তিন মাসকে প্রি-মনসুন বা প্রাক-বর্ষা বলা হয় বলে জানান এই আবহাওয়াবিদ।
এই প্রাক-বর্ষা মৌসুমে যে ৩৮ শতাংশ বজ্রঝড় হয় সেটি কালবৈশাখী ঝড় নামে পরিচিত। কিন্তু সব বজ্রঝড়ই কালবৈশাখী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে যে বজ্রঝড় হয় সেটি কালবৈশাখী ঝড় নয়, আমরা সেটাকে বজ্রঝড়ই বলি।
কতগুলো কালবৈশাখী ঝড় এই মৌসুমে হয়ে থাকে এমন প্রশ্নে এই আবহাওয়াবিদ জানান, মার্চ মাসে গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি, এপ্রিল মাসে গড়ে নয়টি ও মে মাসে ১৩টি কালবৈশাখী ঝড় হয়।
তিনি বলেন, এবার বজ্রমেঘ তৈরির ঘনঘটা বৃদ্ধি পেয়েছে, এখন পর্যন্ত ১০টির বেশি বজ্রঝড় অলরেডি তৈরি হয়েছে। মানে স্বাভাবিক বজ্রঝড় যে ৯ দিন হওয়ার কথা তার চেয়ে এবার বেশি হয়েছে।
৭৬ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালেই টানা ৩৫ দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার তা নেই, বজ্রঝড় বেশি হওয়ার কারণেই এবারের এপ্রিল অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক ছিল।
আবার ২০২৪ সালের এপ্রিলে কালবৈশাখী ঝড় কম হওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন আবহাওয়াবিদরা।
তবে এবার এই ঝড় কেন বেশি হয়েছে এমন প্রশ্নে আবুল কালাম মল্লিক জানান, বিভিন্ন কারণে বজ্রঝড়ের ব্যত্যয় ঘটেছে। লোকাল ও গ্লোবাল অ্যাটমসফেরিক কন্ডিশনের মধ্যে যে মিথষ্ক্রিয়া তার মধ্যে ব্যত্যয় ঘটায় এবার বজ্রমেঘ তৈরির ঘনঘটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সিলেটে এবার এই কালবৈশাখী ঝড় বেশি হয়েছে।
তিনি বলেন, বুধবার থেকে রাজশাহী এবং খুলনা বিভাগে বজ্রমেঘ তৈরি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বজ্রঝড় তৈরি হতে পারে। এসব ঝড় ব্যাপক তান্ডব চালাতে পারে।
একইসঙ্গে, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে ওইসব এলাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধ্বস হতে পারে বলে সতর্ক করেছে অধিদপ্তর।
পৃথক আরেকটি আবহাওয়ার সতর্কবার্তায়, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও এই সংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রাসহ এই চারটি সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস
একই সঙ্গে পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টার জন্য ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে, যা কিছু এলাকায় ৮৮ মিলিমিটারেরও বেশি হতে পারে।
ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে দেশের চারটি সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রাকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সতর্কভাবে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মে মাসে কী কোনো ঘূর্ণিঝড় হবে?
আবহাওয়াবিদরা বলছেন খুব অল্প সময়, অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বজ্রঝড় তৈরি হয় বলে কয়েক দিন আগে এ সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। অবশ্য কোনো অঞ্চলে ব্যাপক গরম পড়লে তখন কেউ কেউ অনুমান করেন, এ ধরনের ঝড় হতে পারে। তবে এটি নিতান্তই আবহাওয়ার অবস্থা দেখে অনুমান করা।
আবুল কালাম মল্লিক বলেন, কালবৈশাখী কোথায় কতক্ষণ হবে সেটি আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়ার মতো বৈজ্ঞানিক কোনো উপায় এখনও নেই। এপ্রিল মাসে যে কালবৈশাখী ঝড় হওয়ার কথা ইতোমধ্যেই এবার সেই সীমা পার হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পরে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। জুন মাসেও স্বাভাবিক অপেক্ষা তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। এর ফলে আগামী দুই মাসে মাঝে মাঝেই গরমের অনুভূতির তীব্রতা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি ও বাতাসের গতিবেগ যদি কম থাকে তখন গরমের অনুভূতির তীব্রতা একটু বৃদ্ধি পায়। মে মাস এমনিতেই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ মাস উল্লেখ করে তিনি জানান, এক থেকে দুটি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে। এরমধ্যে একটি নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ অথবা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
তবে আপাতত ১০ দিনের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় বা লঘুচাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা