বিশ্ব থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিকল্পনায় ইরান

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে বন্ধ করা হয় ইন্টারনেট। সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট করে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় নিরাপত্তা বাহিনী। নিহত হন প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিক্ষোভকারী। ফাঁসির আদেশের মুখোমুখিও হতে হয়েছে আন্দোলনকারীদের।
যদিও ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংকের ফ্রি অ্যাক্সেসের মাধ্যমে আন্দোলনের তথ্য-চিত্র বিশ্বব্যাপী ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতেও বাগড়া দিয়েছে ইরান সরকার। জ্যাম করে দেওয়া হয় স্টারলিংকের স্যাটেলাইট। এরপর থেকেই ইরানের প্রযুক্তি সক্ষমতা নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই পশ্চিমা বিশ্বের। দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবর, ইরান ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে হাঁটছে বলে দেশটির ডিজিটাল অধিকার কর্মীদের আশঙ্কা। নতুন এই ব্যবস্থায় কেবল শাসকগোষ্ঠীর যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ ব্যক্তিরাই আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি পাবেন। বাকি জনগণকে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে সরকারের নিয়ন্ত্রিত জাতীয় ইন্টারনেটের ভেতরেই।
ইরানে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফিল্টারওয়াচ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির একাধিক সূত্রের বরাতে তারা জানতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে একটি ‘সরকারি সুবিধা’তে রূপান্তর করার জন্য গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে তেহরান।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সরকারি মুখপাত্ররা ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এটি স্থায়ী পরিবর্তন। এমনকি সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের পর আর অবাধ ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার ফিরে আসবে না।’
ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রশিদি বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত বা সরকারি যাচাই পাস করা ইরানিরা আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের একটি কঠোরভাবে ফিল্টার করা সংস্করণ ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যদিকে, সাধারণ নাগরিকদের জন্য থাকবে কেবল জাতীয় ইন্টারনেট (অভ্যন্তরীণ এবং সমান্তরাল নেটওয়ার্ক), যা কার্যত বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন।
ইরানে ১২ দিনব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরুর পর ৮ জানুয়ারি থেকে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। সহিংস দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে। যদিও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বিক্ষোভের গতি বর্তমানে কমে এসেছে।
এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ফলে দেশ থেকে খুব সীমিত তথ্যই বাইরে আসছে। এটি ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর ইন্টারনেট বন্ধগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ২০১১ সালে মিসরের তাহরির স্কয়ার বিক্ষোভের সময়কার ব্ল্যাকআউটকেও সময়ের হিসেব ছাড়িয়ে গেছে। এক সরকারি মুখপাত্র জানিয়েছেন, অন্তত ২০ মার্চ পারস্য নববর্ষ নওরোজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ নিয়ে কাজ করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রাক্তন কর্মকর্তা বলেন, ইরান স্থায়ীভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করতে পারে; এই ধারণা ‘একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য ও ভয়ঙ্কর’, যদিও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুলও হবে। তার ভাষ্য, ‘তারা যে এটা করবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু যদি করে, তাহলে এর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব হবে বিশাল। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর পথে এগোতে পারে।’
আমির রশিদির মতে, ‘মনে হচ্ছে কর্তৃপক্ষ বর্তমান ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতায় সন্তুষ্ট। তারা বিশ্বাস করে, এই ধরনের বন্ধ পরিস্থিতি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে তাদের সাহায্য করেছে।’
বর্তমান এই অবস্থা ইরানের ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রচেষ্টার চূড়ান্ত রূপ। এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হোয়াইটলিস্টিং’, যেখানে কেবল অনুমোদিত কিছু ব্যবহারকারীকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়, আর বাকিদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়। প্রজেক্ট আইনিতা ও আউটলাইন ফাউন্ডেশনের গবেষকদের মতে, এই হোয়াইটলিস্টিং ব্যবস্থা সম্ভবত চীন থেকে আমদানি করা প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডলবক্স’ ডিভাইস ব্যবহার করে ইন্টারনেট ট্র্যাফিক পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এসব ডিভাইস নেটওয়ার্ক কেবলের সঙ্গে যুক্ত থেকে ব্যবহারকারীর কার্যকলাপ নজরদারি, নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট ও প্রোটোকল ব্লক এবং ভিপিএন টুল নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। তাদের ভাষায়, ‘প্রায় প্রতিটি নেটওয়ার্কেই এই সেন্সরশিপ সরঞ্জাম বসানো আছে। সরকার চাইলে উভয় দিক থেকেই সংযোগ বন্ধ করে দিতে পারে।’
এই ব্যবস্থার আরেকটি স্তম্ভ হলো ইরানের জাতীয় ইন্টারনেট। এটি কেবল দেশের ভেতরেই ব্যবহারযোগ্য এবং এতে ইরানি মেসেজিং অ্যাপ, সার্চ ইঞ্জিন, নেভিগেশন অ্যাপ এবং নেটফ্লিক্সের আদলে তৈরি একটি ভিডিও স্ট্রিমিং সেবাসহ সরকার অনুমোদিত কিছু ওয়েবসাইট ও অ্যাপ চালু থাকে। এই নেটওয়ার্ক সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে থাকে এবং বৈশ্বিক ইন্টারনেটের সঙ্গে এর কার্যত কোনো সংযোগ নেই।
২০০৯ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর ব্যাপক বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট সাময়িকভাবে বন্ধ করার অভিজ্ঞতা থেকেই জাতীয় ইন্টারনেটের ধারণা জোরালোভাবে সামনে আসে। তখন কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, হঠাৎ পুরো ইন্টারনেট বন্ধের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক মূল্য কতটা চড়া।
২০১২ সালের মধ্যে সরকার ‘সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস’ গঠন করে এবং বিভক্ত, অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। পরবর্তী বছরগুলোতে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধের কৌশল আরও সূক্ষ্ম করে অর্থাৎ বিক্ষোভের সময় ফেসবুক, টুইটার ও গুগলের মতো প্ল্যাটফর্ম বন্ধ রাখা হলেও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো চালু রাখা হয়।
পরবর্তী এক দশকে ইরানি কর্তৃপক্ষ অনলাইন ব্যবসা, ব্যাংক ও ইন্টারনেট সেবাদাতাদের ডেটা সেন্টার ও অবকাঠামো দেশের ভেতরে স্থানান্তরে বাধ্য করতে ‘গাজর ও লাঠি’ নীতি ব্যবহার করে। যারা সহযোগিতা করে, তারা কর ছাড় পায়। যারা অস্বীকার করে, তাদের কার্যক্রম সীমিত করা হয়।
২০১৫ সালে একদল গবেষক বিটকয়েন ব্যবহার করে ইরানে সার্ভার স্পেস ভাড়া নেন এবং দেশটির আইপি অ্যাড্রেস স্পেস স্ক্যান করেন। তারা আবিষ্কার করেন, ইরান একটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট তৈরি করছে, যা প্রযুক্তিগতভাবে অফিস বা করপোরেট নেটওয়ার্কের মতো বাইরের দিকে রুট করা কার্যত অসম্ভব।
এক গবেষকের ভাষায়, ‘এটা এমন, যেন অফিসের ভেতরের ফাইল সার্ভার। অফিস ছাড়লে যেমন সেটিতে ঢোকা যায় না, তেমনি এই নেটওয়ার্কও বাইরে থেকে প্রবেশযোগ্য নয়।’
বিক্ষোভ চলাকালীন জাতীয় ইন্টারনেট কার্যকর থাকায় এখন সেটিই বেশিরভাগ ইরানির অনলাইনে থাকার একমাত্র উপায়। এটি আরও বিস্তৃত হতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যে মাত্রার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেখিয়েছে, তা অনেক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় এই নতুন, স্থায়ী অনলাইন বাস্তবতা কি সত্যিই টেকসই হবে? তার কথায়, ‘ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের এই উদ্বেগ যথার্থ। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত ইরানি কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।’