লন্ডনে সাংবাদিকদের যেভাবে টার্গেট করছে ইরান

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকারের বিরুদ্ধে গত জানুয়ারিতে বিক্ষোভ থেকেই দেশটির অভ্যন্তরীণ খবর খুব কমই বাইরে এসেছে। তখন থেকে ১০০ দিনের বেশি সময় ধরে দেশটিতে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের মুহূর্তেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। সাংবাদিকদেরও অবাধে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না, এমনকি নির্দিষ্ট কিছু গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে হস্তক্ষেপ করছে ইরানের সরকার।
রোববার (১৯ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
চলতি বছরের শুরুতে হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় ইরানি কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সহিংসতার খবর সীমান্ত পেরিয়ে খুব কমই বাইরে এসেছে। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংক ব্যবহার করে দেশটিতে কর্মরত সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট তথ্য সরবরাহ করেছিল। যদিও পরে স্টারলিংক ব্যবহারেও কড়াকড়ি আরোপ করে ইরান সরকার।
তখন থেকে সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর বিশেষ নজরদাবি বৃদ্ধি করা হয়। অনেক সরকারি অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকদের হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়। এর রেশ ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। লন্ডনেও ছড়িয়েছে।
ইরানের সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত সংবাদ চ্যানেল ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-এর লন্ডনের কার্যালয়ে গত বুধবার অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়। পাশের একটি ভবনে পার্কিংয়ে ‘জ্বালানিযুক্ত কনটেইনার’ ছুড়ে ফেলা হয়। এসব তথ্য জানিয়েছে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ।
লন্ডনে কর্মরত ইরানি সাংবাদিকরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হুমকি ও শারীরিক হামলার পর তারা নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। এসবের জন্য তারা তেহরান সরকারকে দায়ী করছেন। দেশটির কর্তৃপক্ষ বিবিসি পার্সিয়ান ও ইরান ইন্টারন্যাশনালের মতো ফারসি ভাষার সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে বদ্ধপরিকর।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের সাংবাদিকরা বেশ কয়েকটি হত্যাচেষ্টা ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালে টিভি উপস্থাপক পুরিয়া জেরাতি দক্ষিণ লন্ডনের উইম্বলডনে তার বাড়ির বাইরে একদল লোকের হাতে ছুরিকাঘাতের শিকার হন। পরে নিরাপত্তার জন্য বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হন।
লন্ডনে বিবিসি পার্সিয়ানে কর্মরত এক ইরানি সাংবাদিক জানান, ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, চলতি বছরের শুরুতে ইরানে গণবিক্ষোভের পর তার ও তার সহকর্মীদের ওপর হুমকি-ধমকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী তার পরিবারকে জানিয়েছে যে, তার বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ বা সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগ আনা হবে। এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সাংবাদিক আরও বলেন, পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর আমি টানা তিন দিন কেঁদেছিলাম। কারণ, তাদের নিয়ে আমি খুব চিন্তিত ছিলাম। আর লন্ডনে আপনি যতই সতর্ক থাকুন না কেন, নিরাপদ বোধ করবেন না। কারণ আপনি যুক্তরাজ্যে থাকছেন, কাজ করছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই দেখবেন যে, এই সহিংসতা এখানেও পৌঁছে গেছে। এটা সত্যিই ভীতিকর।
লন্ডনের ওই হামলার পর ইরান ইন্টারন্যাশনালের আরেক সাংবাদিক বলেন, আমাদের কাছে সহিংসতা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের মন স্বাভাবিকভাবে এই কদর্য বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করছে।
সংবাদ চ্যানেলটির আরেক সাংবাদিক বলেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী একবার লন্ডনে তার বাড়ির বারান্দার একটি ছবি ইরানে থাকা তার পরিবারকে দেখিয়ে সতর্ক করে বলেছিল যে, ‘আমরা তার খুব কাছাকাছি আছি’। এরপর তারা ওই সাংবাদিককে হুমকি দেয় এবং বার্তায় এই বলে যে, ‘আমরা তোমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে তোমার পরিবারের কাছে আলাদাভাবে পাঠিয়ে দেব’।
তিনি বলেন, বিষয়টিকে আমি গুরুত্ব সহকারে নিই। কারণ, তারা কাউকে নিয়োগ দিয়ে লন্ডনে আমার ক্ষতি করতে পারে।
লন্ডনে হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের সমর্থনকরা একজন ইরানি অধিকারকর্মী বলেছেন, বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তাকে জানিয়েছেন যে, তাদের ‘কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে, নইলে তাদের জীবন বিপন্ন হবে’। হুমকি মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। বাইরে বেরোলে সাংবাদিকদের জন্য সবসময় সতর্ক থাকাটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না। বরং দুশ্চিন্ত আরও বাড়ে। তারা যেভাবে মাত্রাতিরিক্ত হুমকি পাচ্ছেন, সে তুলনায় সমর্থন ও সুরক্ষা পাচ্ছেন না।
যুক্তরাজ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন মোকাবিলা বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ড. লুসিয়া আরডোভিনি বলেন, এই হামলাগুলো প্রায়শই প্রবাসীরাই চালায়। তারা ‘রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক এজেন্ট হিসেবে কাজ করে ও সরকারি বয়ানের প্রতি তাদের গভীর বিশ্বাস’। ফলে ভিন্নমতাবলম্বীদের জাতীয় বিশ্বাসঘাতক বা স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করে আক্রমণ করতে উৎসাহিত হয়।

