এবার মার্কিন ডালের ওপর শুল্ক চাপালো ভারত

দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মার্কিন-ভারত বাণিজ্য চুক্তি যখন কার্যত অচলাবস্থায়, তখন ডাল শস্য নতুন করে দুই দেশের বাণিজ্য টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সম্প্রতি দুই মার্কিন সিনেটর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি লিখে ভারতের আরোপিত ৩০ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই শুল্ক ‘অন্যায্য’। খবর ইন্ডিয়া টুডের।
ভারতের এই সিদ্ধান্তটি অনেকটাই নীরবে কার্যকর করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর এড়িয়ে গেছে। তবে বাণিজ্য বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, এটি গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ৫০ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্কের প্রত্যুত্তর হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ফলে এই ইস্যু মার্কিন-ভারত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
নর্থ ডাকোটার সিনেটর কেভিন ক্র্যামার ও মন্টানার সিনেটর স্টিভ ডেইনস তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ভারত ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হলুদ মটরের (ডাল) ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, যা ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়। সিদ্ধান্তটি সরকারিভাবে খুব একটা প্রচার করা হয়নি, যা ভারত-মার্কিন সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
এতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই প্রদেশ মটর ও অন্যান্য ডাল শস্য উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে। আর ডাল শস্যের ক্ষেত্রে ভারত সবচেয়ে বড় গ্রাহক। বিশ্বের মোট আমদানিকৃত ডালের ২৭ শতাংশ যায় ভারতের বাজারেই। ভারত মূলত মশুর ডাল, ছোলা ও শুকনো মটরের মতো ডাল শস্য আমদানি করে থাকে। তাই এই বাজারকে বাড়তি গুরুত্ব দেন মার্কিন ব্যবসায়ীরা।
সিনেটররা মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে যে কোনো বাণিজ্য চুক্তির আগে মার্কিন ডাল ও মসুর ডালের জন্য আরও ভালো বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে। এ বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। দাবি করেন, শুল্ক কমলে দু’দেশই লাভবান হবে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক নবরূপ সিং এক্সে লেখেন, ‘এর মানে হলো মার্কিন শুল্কের প্রতিশোধ হিসেবে ভারত আমদানিকৃত ডালের ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হয়েছিল।’ আরেকজন ব্যবহারকারীর ভাষায়, ‘আমরা নীরবে প্রতিশোধ নিয়েছি।’
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও এই ইস্যুতে তারা হস্তক্ষেপ করেছিলেন। ২০২০ সালের বাণিজ্য আলোচনার সময় ট্রাম্প নিজে মোদির হাতে এই চিঠি তুলে দেন বলে সিনেটররা দাবি করেছেন। তাদের ভাষায়, ‘এতে আমাদের উৎপাদকদের আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হয়েছিল।’
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারত কিছু নির্দিষ্ট ডালের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের একটি অংশের মন্তব্য, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতার রাজনৈতিক সুযোগ ট্রাম্প হয়তো আগেই হারিয়েছেন, কিংবা বলা যায়, ঠিক সময়ে চোখ খোলেননি।
ভারতের সঙ্গে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনা চলছে। রাশিয়ার কাছ থেকে খনিজ তেল কেনার কারণে ভারতের উপর শাস্তিমূলক ৫০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাজারে তাই ভারতীয় পণ্য রপ্তানি আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। দুই দেশের বাণিজ্যই তাতে ধাক্কা খাচ্ছে। ডাল শস্যের ওপর নয়াদিল্লির শুল্ক নিয়ে কি ফের বাণিজ্যক্ষেত্রে কোনো সংঘাতের বাতাবরণ তৈরি হবে? মার্কিন আইনপ্রণেতাদের চিঠির প্রেক্ষিতে ট্রাম্প কী করেন, সেটাই দেখার।