logo

ইরানে হামলায় প্রতি ৪ মার্কিনির মধ্যে ৩ জনের সমর্থন নেই

ইরানে হামলায় প্রতি ৪ মার্কিনির মধ্যে ৩ জনের সমর্থন নেই

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলের যৌথ হামলার কয়েক ঘণ্টা পর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকান নাগরিকরা এই হামলাকে সমর্থন করে না। হামলার দিন থেকে শুরু হয়ে রোববার (১ মার্চ) পর্যন্ত রয়টার্স ইপসোস জরিপটি পরিচালনা করে। 

জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের কাছ থেকে ইরানের হামলার প্রতি হতাশাজনক সমর্থন পাওয়া যায়নি। প্রতি চারজনের মাত্র একজন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনা বলা হয়েছে, জরিপটির প্রাথমিক ফলাফলে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী দিনগুলোতে কীভাবে এগোবে এবং আইনপ্রণেতারা এই হামলার প্রতি কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা নিয়ে মতামতভিত্তিক আলোচনা উঠে এসেছে। হামলা পরবর্তী ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর উল্লেখযোগ্য কী প্রভাব ফেলতে পারে; বিশেষ করে যখন তারা একটি কঠিন মধ্যবর্তী নির্বাচনি মৌসুমের দিকে তাকিয়ে আছেন। 

ট্রাম্প রোববার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সমস্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই ‘ন্যায়সংগত অভিযান’ চালিয়ে যাবেন। এ ছাড়া নিহত হওয়া তিন মার্কিন সেনার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, সম্ভবত প্রাণহানি আরও বাড়বে।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। এরপর ট্রাম্প আবারও ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন এবং দাবি করেছেন, দেশটির নেতারা সভ্যতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।  

ইপসোসের জরিপ বলছে, মার্কিন জনগণ এই মতের সঙ্গে একমত নয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা এই যুদ্ধের বিপক্ষে, আর ২৯ শতাংশ বলেছেন তারা নিশ্চিত নন। রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন জোরালো হলেও তা নিরঙ্কুশ নয়; ৫৫ শতাংশ সমর্থন করলেও ১৩ শতাংশ এর বিপক্ষে এবং ৩২ শতাংশ অনিশ্চিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রায় ৪২ শতাংশ রিপাবলিকান জানিয়েছেন, এই অভিযানের ফলে যদি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়, তবে তারা এই অভিযানকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কমিয়ে দেবেন। অন্যদিকে, প্রায় ৭৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এই হামলার বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

আমেরিকায় আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন

হামলার পর রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের দেওয়া বার্তা বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। এরই মধ্যে রোববার এই জরিপটি প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এটি ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমর্থকদের দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। ট্রাম্প ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধ করার এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে বিদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ করার অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে লড়েছিলেন। যদিও ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের মতামত নিজের মতো করে গড়ে তোলার এক অনন্য ক্ষমতা রয়েছে। 

কিছু রক্ষণশীল ভাষ্যকার সতর্ক করেছেন, তিনি আগুন নিয়ে খেলছেন। প্রয়াত রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্কের প্রাক্তন প্রযোজক ব্লেক নেফ শনিবার এক্স পোস্টে লিখেছেন, যদি এই যুদ্ধ দ্রুত, সহজ এবং নির্ণায়ক বিজয় আনে, তবে তাদের বেশিরভাগই এটি মেনে নেবে। কিন্তু যুদ্ধ যদি খারাপ ফলাফল নিয়ে আসে, তবে সেখানে প্রচুর ক্ষোভ তৈরি হবে।

তিনি আরও যোগ করেন, সাফল্য ভুল ব্যাখ্যাকে ঢেকে দিতে পারে। তাই আমাদের সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করা উচিত।

ক্যাটো ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ডগ ব্যান্ডো আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মার্কিন সেনাদের মৃত্যুযুদ্ধের মূল্য কত তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকানরা বড় ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো চলমান সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চায় না। মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি হঠাৎ করেই দেখিয়ে দিচ্ছে, এটি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনো ভিডিও গেম নয়।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত তিন মার্কিন সামরিক কর্মী ছাড়াও ইরানে অন্তত ২০১ জন, ইসরায়েলে ৯ জন, ইরাকে ২ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩ জন এবং কুয়েতে ১ জন নিহত হয়েছেন। এদিকে রয়টার্স ইপসোসের জরিপে ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা (যার মধ্যে ৩৪ শতাংশ রিপাবলিকান এবং ৪৪ শতাংশ স্বতন্ত্র) বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস বা তেলের দাম বাড়ে তবে তারা ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কমিয়ে দেবেন। এই সংঘাত ধমনিতুল্য বাণিজ্যিক পথগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং বেশ কিছু কোম্পানি ওই এলাকায় জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে।

ডেমোক্র্যাটরাও যুদ্ধের প্রতি জনমতের দিকে কড়া নজর রাখছেন, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নির্বাচনি প্রচারণার ওপর প্রভাব ফেলবে। দলটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে একটি মূল ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছে। তারা ট্রাম্পের সামরিক হঠকারিতাকে (যার মধ্যে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণও অন্তর্ভুক্ত) তার আগের বার্তার সঙ্গে অসংলগ্ন হিসেবে চিত্রায়িত করছেন। 

এদিকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটরা ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। অন্তত একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর হামলার প্রশংসা করেছেন, অন্যরা খামেনির মৃত্যুকে উদযাপন করলেও ট্রাম্পের যুক্তির বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। আবার বেশ কয়েকজন সরাসরি এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

রোববার বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট বলেছেন, মার্কিন সেনাদের মৃত্যু ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন’ পাসের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে, যা পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের আগে কংগ্রেসের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে। সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এক্সে লিখেছেন,  ‘ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি আমাদের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন। কিন্তু এটি তার নিজের পছন্দের যুদ্ধ।’ এই সপ্তাহের শুরুতেই প্রস্তাবটির ওপর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।